তাহলে কি ছনুবুড়ির ছেলের সংসারে অভাব লেগেছে!
অভাব লাগবার কথা না। বুড়ির একমাত্র ছেলে আজিজ গাওয়ালি (ফেরি করা) করে। ভারে বসিয়ে কাঁসা পিতলের থালাবাসন, জগ গেলাস, কলসি পানদান নিয়ে দেশগ্রাম চষে বেড়ায়। নতুন একখান কাঁসা পিতলের থালা বদনা, পানের ডাবর, পানদান গিরস্ত বাড়ির বউঝিদের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বিনিময়ে সেই বাড়ি থেকে নিয়ে আসবে পুরানা কাঁসা পিতলের ভাঙাচোরা, বহুকাল ধরে ব্যবহার করা জিনিসপত্র। একখান নতুন জিনিসের বিনিময়ে আনবে দুই তিনখান পুরানা জিনিস। তারপর সপ্তাহে সপ্তাহে দিঘলী বাজারে গিয়ে ওজন দরে সেই সব জিনিস বিক্রি করে অর্ধেক টাকার জিনিস কিনবে অর্ধেক টাকা ধুতিতে (টাকা পয়সার থলে) ভরবে। ওই অর্ধেক টাকাই লাভ। তার উপর খেতখোলাও আছে আজিজের। ভালই আছে। আড়াই কানির মতো হবে। পুরা আড়াই কানিই পড়েছে ইরির চাষে। বর্গা দিয়েও ধান যা পাওয়া যায় বছর চলে আরামছে। যদিও আজিজের সংসার বড়। বিয়ার পরের বছর থেকে সেই যে পোলাপান হতে শুরু করেছে বউয়ের, এখনও থামেনি। বড় পোলার বয়স হয়েছে এগারো বারো বছর। এখনও পেট উঁচু হয়ে আছে বানেছার। সাতমাস চলছে। মাস। দুইয়েক পর একদিন ব্যথা উঠবে। আলার মা ধরণী এসে খালাস করে দিয়ে যাবে। পোলা না মাইয়া কী হল সেটা নিয়েও আগ্রহ থাকবে না সংসারের কারও। না আজিজের, না বানেছার। এমন কী পোলাপানগুলিও তাকিয়ে দেখবে না, ভাই হল তাদের, না বোন। যে যাকে নিয়ে আছে তারা।
আর ছনুবুড়ির তো কথাই নাই। সে এই সংসারে থেকেও নাই। বিয়া করে বানেছাকে যেদিন সংসারে আনল আজিজ তার পরদিন থেকেই সংসারের বাড়তি মানুষ ছনুবুড়ি। বাড়িতে বড়ঘর একটাই, সেই ঘর চলে গেল বউর দখলে। উত্তরের ভিটায় আছে মাথার ওপর টিনের দোচালা আর চারদিকে বুকার্বাশের (বাশ চিড়ে তার ভেতরকার সাদা নরম অংশ দিয়ে তৈরি) বেড়া, ঢেকিঘর। একপাশে বেলদারদের (নিচু ধরনের সম্প্রদায়) রোগা ঘোড়ার মতো তেঁতুল রঙের পুরানা ঢেঁকিটা ললাটে (ঢেকির মুখ যে গর্তে পড়ে) মুখ দিয়ে পড়ে আছে, আরেক পাশে ভুর (উই) দেওয়া আছে লাকড়ি খড়ি, এসবের মাঝখানে, লেপাপোছা একটুখানি জায়গা থাকার জন্য পেল ছনুবুড়ি। নিজের কথা বালিস নিয়ে তারপর থেকে ওখানেই শোয়।
দিন চলে যাচ্ছে।
ছেলের বউ হিসাবে বানেছা অতি খারাপ। সংসারে এসে ঢোকার পর থেকেই দুই চোখখে দেখতে পারে না হরিরে (শাশুড়িকে)। কী ভাল কথা কী মন্দ কথা, ছনুবুড়ির কথা শুনলেই ছনছন করে ওঠে। চোপা (মুখ) এত খারাপ, হরিরে কোন ভাষায় গালিগালাজ করা যায় তাও জানে না। মুখে যা আসে তাই বলে। সতীন পর্যন্ত।
প্রথম প্রথম এই নিয়ে ব্যাপক কাইজ্জাকিত্তন (ঝগড়াঝাটি) হয়েছে। বানেছা যেমন ছনুবুড়িও তেমন, হরি বউয়ের কাইজ্জাকিত্তনে পাড়ার মানুষ জড় হত। শেষদিকে যখন হাতও তুলতে শুরু করল বানেছা তখন উপায় না দেখে থেমে গেছে ছনুবুড়ি। হরি হয়ে বউর হাতে মার খাওয়া! ছি!
আর পেটের ছেলে আজিজ, সে এমন মেউন্না (মেনিমুখো), বউর উপর দিয়ে কথা বলার সাহস নাই। বউ অন্যায় করলেও দোষ সে মাকেই দেয়। এসব দেখে সংসার থেকে মন উঠে গেছে বুড়ির। তারপর থেকে সংসারে সে থেকেও নাই। বাড়িতে থাকলে নাতি নাতকুরদের হাত দিয়ে ভাত তরকারি পাঠায় বানেছা, ছনুবুড়ি খায়। কখনও যদি না পাঠায়, রাও (রা) করে না। পাড়া চড়ে ছোটখাট চুরি চামাড়ি করে, কৃটনামী করে টুকটাক খাদ্য যা জোগাড় করে তাতে নিজের পেট বুড়ির খালি থাকে না। সময় অসময়ের ক্ষুধাটা মিটাতে পারে।
তবে দেশ গ্রামের লোক ছনুবুড়ির আড়ালে আবডালে তাকে নিয়ে খুব হাসি মশকরা করে। এতবড় কূটনী হয়েও বউর কূটনামীর কাছে মার খেয়ে গেছে বুড়ি। কাইজ্জাকিত্তনে ছনুবুড়ির ছ্যানের মতন ধার, সেই ধার মার খেয়ে গেছে বানেছার কাছে। পারতিকে বউর সঙ্গে সে কথা বলে না। বউকে চোখের ওপর দেখেও না দেখার ভাব করে।
আজকের ব্যাপার অন্যরকম। আজ সকাল থেকেই পেটভর্তি ক্ষুধা বুড়ির। সকালবেলা মুখে দেওয়া যায় এমন কোনও খাদ্য নিজের সংগ্রহে ছিল না। কাল দুপুরে জাহিদ খাঁর বাড়িতে ভাত খেয়েছে তারপর থেকে একটা বিকাল গেছে, পুরা একটা রাত তারপর এতটা বেলা, মানুষ বুড়া হলে কী হবে পেট কখনও বুড়া হয় না, ক্ষুধাটা বেদম লেগেছে ছনুবুড়ির। আর এসময় বাড়ির বউ পোলাপান নিয়ে বউয়া খাচ্ছে! যদিও ছেলের সংসারের অভাবের কথাটাও মনে হয়েছে ছনুবুড়ির, অন্যদিকে বউয়ার গন্ধে নিজের পেটের ক্ষুধাও লাফ দিয়ে উঠেছে।
ছনুবুড়ি এখন কী করে?
বউর সঙ্গে শেষ কবে কথা হয়েছে মনে নাই। আজ ভাবল নাতি নাতকুরদের মাধ্যমে বউর সঙ্গে ভালভালাই দুই একখান কথা বলে সংসারের অভাবের কথাটা জেনে নেবে আর নিজের জন্য একথাল বউয়াও জোগাড় করবে। কৃটনামী একটু করে দেখুক কাজে লাগলেও লাগতে পারে।
বড়ঘরের পিড়ায় বসল ছনুবুড়ি। ঘরের ভিতর গলা বাড়িয়ে মাজারো (মেজো) নাতিকে ডাকল। ও হামেদ, হামেদ, কী করো ভাই? বউয়া খাও?
সংসারে একমাত্র হামেদেরই একটু টান দাদীর জন্য আছে। সে বলল, হ।
কীয়ের বউয়া?
খুদের। খুদের বউয়া পাও ক্যা, ঘরে চাউল নাই।
হামেদ কথা বলবার আগেই বানেছা কাইজ্জার সুরে বলল, চোক্কে বলে দেহে না? তয় ঘরে বইয়া যে আমি পোলাপান লইয়া বউয়া খাই হেইডা দেহে কেমতে?
