কও কী! আথকা পেট নামাইলো?
কুনসুম কী মুখে দিছে কে জানে। হারাদিন চোক্কে চোক্কে রাখন যায়! আমার কাম কাইজ থাকে না!
আবদুল আর কথা বলল না। দুইহাত বাড়িয়ে বউর কোল থেকে মেয়েটাকে নিল। আহো মা, আমার কুলে আহো।
বাপের কোলে গিয়ে কান্না থামাল মেয়ে।
হাতের ব্যাগ বউর হাতে দিয়ে আবদুল বলল, মায় কো? মারে দিহি দেহি না। বাইত্তে নাই।
বউ বলল, আছে। ঘরে আছে।
কী করে?
কেমতে কমু! মনে অয় তোমার বইনের লগে কথা কয়।
আবদুল একটু চমকাল। কী কথা? তছির পাগলামি বাড়ছেনি?
কইতে পারি না। তয় হাদিন আজ বাইত্তে আছিলো। ঘর থিকা বাইর অয় নাই।
ক্যা?
কী জানি!
আবদুল আর বউর দিকে তাকাল না, মা বোন যে ঘরে থাকে সেই ঘরের দুয়ারের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ঘরের ভিতর উঁকি মেরে ডাকল, মা ওমা, কো তুমি?
ঘরে কুপি জ্বলছে। কুপির সামনে আনমনা ভঙ্গিতে বসে আছে আবদুলের মা। পাশে কাথা মুড়া দিয়ে শুয়ে আছে তছি। আবদুলের ডাক শুনে একটুও নড়ল না। যেন গভীর ঘুমে ডুবে আছে। সকালের আগে এই ঘুম ভাঙবে না।
মায়ের দিকে তাকিয়ে আবদুল বলল, এমতে বইয়া রইছো ক্যা মা?
মা ম্লান কাণ্ঠে বলল, কী করুম?
আমি ডাক দিলাম হোনো নাই।
হুনছি।
তয় দিহি বাইর অইলা না!
এমতেঐ।
তছি হুইয়া রইছে ক্যা?
কী জানি।
হুনলাম আইজ হারাদিন ঘরথনে বাইর অয় নাই। ক্যা? শইল খারাপ? জ্বরজ্বারি আইলোনি?
না। এমতেঐ।
পাগলামি বাড়ছে?
না। একদোম চুপচাপ আছে। হারাদিন ধইরা হুইয়া রইছে। বিচনা থিকা ওডে নাই, কথা কয় নাই, খায় নাই।
না খাইয়া থাকন ভাল না। এই রকম চুপচাপ থাকনও এক রকমের পাগলামি। রাইত্রে উড়াইয়া ভাত খাওয়াইয়ো।
আইচ্ছা।
মেয়ে কোলে দুয়ারের সামনে বসল আবদুল। আমি আইজ গেছিলাম সমশপুর। একখান লেপ আর একখান তোশক বানাইলাম। বড় গিরস্তবাড়ি। রিডামাছ দিয়া ভাত খাওয়াইলো। মজুরি পাইছি একশো কুড়ি টেকা।
আবদুলের মা নরম গলায় বলল, ভাল।
এবার হঠাৎ করেই উত্তেজিত হল আবদুল। ওমা, তোমারে তো আসল কথাডাই কই নাই। কোলাপাড়ার ঐমিহি একখান কাম অইছে।
কী কাম বাজান?
বালের কচুড়িপেনার মইদ্যে একখান লাচ পাওয়া গেছে। জুয়ানমর্দ এক বেডার লাচ। গলায় গামছার গিট্ট দেওয়া। কারা জানি মাইরা খালে হালায় দিছে বেডারে। বেডার নাম রুস্তম। রিশকা বায়।
আবদুলের কথা শুনে ফ্যাল ফ্যাল করে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল মা। কথা বলতে ভুলে গেল।
আবদুল বলল, দুইন্নাইডা যে কী অইছে! মানুষ আর মানুষ নাই। মাইনষের জান গেছে কুত্তা বিলাইয়ের জান অইয়া। মাইনষের জানের কোনও দাম নাই। দুই চাইর পাঁচ টেকার লেইগা মাইনষের জান যায় গা। সামাইন ইট্টু অন্যায়ের লেইগা জান যায় গা।
আবদুল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কও তো এই যে বেডাডা মইরা গেল, বেডারে যে এমতে মাইরা হালাইলো, বেডার বউ পোলাপানডি তহন কেমুন করবো! কী খাইবো, কেমতে বাইচ্চা থাকবো? যারা বেডারে মারলো তারা এই হগল কথা একবারও চিন্তা করলো না। মানুষ মানুষরে মাইরা হালায় কেমতে এইডাঐত্তো আমি বুজি না! ওমা, কেমতে মানুষরে মানুষ মাইরা হালায়? যহন একজন মানুষ আরেকজন মানুষরে মারে, তহন যে মারে তার মনে ইট্টু রহম অয় না? ইট্টু দয়ামায়া অয় না?
আবদুলের মা কোনও কথা বলে না, পাথর হয়ে থাকে। চোখের দৃষ্টি স্থির, মুখখান যেন জীবিত মানুষের মুখ না। মুখখানা যেন মৃত মানুষের।
মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আরও কথা হয়তো বলত আবদুল, কোলে বসা মেয়ে ঙো ঙো করে বলল, মার কাছে যামু। বাবা, মার কাছে যামু।
উঠে দাঁড়াল আবদুল। আইচ্ছা লও।
তারপর উঠানের দিকে পা বাড়িয়ে মাকে বলল, তছিরে উডাও মা। উড়াইয়া ভাত পানি খাওয়াও।
মা তবু কথা বলল না।
.
১.৬০
গভীর রাতে ঘুমের ভিতর দবির গাছি টের পেল তার ঘাড়ের কাছে কে হাত বুলাচ্ছে। আশ্চর্য রকম মায়া মমতা মাখা নরম কোমল ছোট্ট হাতখানি। একবার ঘাড়ের এইদিকে যায় হাত, একবার ওই দিকে।
দবিরের ঘুম ভেঙে গেল।
ঘর ভর্তি অন্ধকার। দবির শুয়ে আছে মেঝেতে। পিঠের তলায় হোগলা, হোগলার তলায় পুরু করে বিছানো নাড়া। গায়ে আছে মোটা কাঁথা। ফলে রাত দুপুরের শীত যতই পড়ুক না কেন টের পাওয়া যায় না।
কিন্তু কে এমন করে হাত বুলাচ্ছে দবিরের ঘাড়ে!
এটা হামিদার হাত না। হামিদার হাত শক্ত, খরখরা। বহুদিন ধরে সংসারকর্ম করা হাত।
তাহলে!
তারপরই দবির শুনতে পেল মৃদু ফোঁসফোঁস একটা শব্দও হচ্ছে। ঘাড়ে যে হাত বুলাচ্ছে সেই মানুষটাই করতাছে শব্দটা। যেন বা গভীর কোনও কষ্ট বেদনায় কাঁদছে কেউ। কিন্তু কাঁদছে যে এটা কাউকে বোঝাতে চায় না। অতিকষ্টে চেপে রাখতে চাইছে কান্না, পারছে না। মৃদু একটা শব্দ হচ্ছেই।
দবির বুঝে গেল তার ঘাড়ে কার হাত! কে এমন করে কাঁদছে পাশে বসে!
ডানহাত ঘাড়ের দিকে তুলে আস্তে করে হাতখান ধরল সে। মায়াবি গলায় বলল, কী অইছে গো মা! কান্দো ক্যা!
বাবার যে ঘুম ভেঙে গেছে নূরজাহান তা বুঝতে পারেনি। বাবা তার হাত ধরার ফলে, কথা বলবার ফলে চেপে রাখা কান্না আর চাপতে পারল না সে। বুকের ভিতর আটকে থাকা সব কান্না বেরিয়ে এল। শব্দ করে কেঁদে উঠল নূরজাহান।
থতমত খেয়ে বিছানায় উঠে বসল, দবির। দুইহাতে জড়িয়ে ধরল মেয়েকে। দিশাহারা গলায় বলল, কী অইছে মা, কী অইছে! এমুন কইরা কানতাছো ক্যা?
