কিন্তু বদর এসব কী বলছে! এসব কথার অর্থ কী? চোরদের কাজ থাকে না বলে তার কেন কাজ থাকবে না!
হাতে ধরা য়োড়া চকের ঘাসে নামিয়ে রাখল লোকটা। কনটেকদার সাব, হেকমত সবার কথা ভুলে বদরের পাশে বসল, নরম গলায় বলল, আপনের কথা কিছু বোঝলাম না বাজান।
মুখ ফিরিয়ে আবার লোকটার দিকে তাকাল বদর। চোখে অচেনা দৃষ্টি। আনমনা গলায় বলল, আপনে জানি কেডা?
লোকটা আবার থতমত খেল। বদরের চোখের দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বলল, আপনে আমারে চিনেন না?
চিনা চিনা লাগে! তয় মনে করতে পারছি না।
ক্যা?
কইতে পারি না।
চদরি বাইত্তে আরও অনেক মাইট্টালের লগে আপনেও থাকেন আমিও থাকি। একলগে রাইন্দা খাই, একলগে হুই। সুখদুঃখের কত পাচাইল আপনে আমি পাড়ি, আর আপনে আমারে চিনতাছেন না বাজান! কী অইছে আপনের?
কী যে অইছে কইতে পারি না।
কয়দিন ধইরা দেহি রাইত্রে ঘুমান না। উইট্টা বইয়া থাকেন। বিড়ি টানেন আর একলা একলা কথা কন। এমুন হাকিহুকি কইরা কন, কী কন হুনা যায় না। বোজতে পারি না। আমি যহন এহেনে কামে আইলাম তহন দেহি শইল্লে আপনের বেদম ফুর্তি। তিন জুয়ানের কাম করেন একলা। কনটেকদার সাবে এহেনে পাড়ায় আপনেরে, ওহেনে পাড়ায়। কয়দিন ধইরা দেহি আপনে আর অমুন নাই। আথকা কেমুন বদলাইয়া গেছেন। কাম করেন তো করেন না, কোনও মিহি যান তো যান না। খাইতেও দেহি না আগের লাহান। আপনের কী অইছে বাজান? মনে দুক্কু পাইছেন?
এসব কথায় চোখ ছলছল করে উঠল বদরের। লোকটার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল সে।
লোকটা এবার বদরের কাঁধে হাত দিল। আমারে আপনে কন বাজান কী অইছে আপনের? আমারে যুদি আপনে না চিন্না থাকেন তয় কই আমি কে! আমার নাম আদিলউদ্দিন। বাড়ি কামারগাও।
মুখ নত করে চোখের পানি সামলাল বদর। হ অহন চিনছি। যান, আপনে কামে যান।
কামে তো যামুঐ। আপনের কথাডা হুইন্না যাই।
আমার কথা হুইন্না আর কী করবেন! চোরের কথা কেঐ হোনে!
কীয়ের চোর? কীর লেইগা নিজেরে বারাবারে চোর কইতাছেন?
আমি কই না! আমারে কয় মাইনষে!
কোন মাইনষে চোর কয় আপনেরে?
কনটেকদার সাবে।
আলী আমজাদের কথা শুনে চমকাল আদিলউদ্দিন। কাঁচাপাকা ভুরু কুঁচকে গেল। কনটেকদার সাবে! ক্যা, চোর কইছে ক্যা?
আমি বলে চা মিষ্টি আইন্না পয়সা চুরি করি! আমি বলে রুটি কেলা আইন্না পয়সা চুরি করি। কন, আমি বলে চোর!
কথা বলতে বলতে আবার চোখ ছলছল করে উঠল বদরের। গলা বুজে এল। জড়ান গলায় সে বলল, আমি ভাল বংশের পোলা। পেডের দায়ে মাইট্টাল অইছি। তয়। মাইট্টালগিরি আমার ভাল্লাগে না। কনটেকদার সাবে আমারে এইমিহি ওইমিহি পাড়ায়, চা সিরকেট আনায়, কেলা রুটি আনায়, মিষ্টি আনায়, হেই কাম করতে আমার ভাল্লাগে। পয়সা চুরির লোভে আমি হেই কাম করি না। আমি চোর না। আমার মনে কোনও পাপ নাই। আপনে কন, চোর যদি অমু তাইলে এই কষ্টের কাম করতে আইছি ক্যা! তাইলে তো হারাদিন ঘুমাইতাম, হারারাইত চুরি করতাম। একদিন চুরি কইরা একমাস বইয়া খাইতাম। চোরে কোনওদিন এত কষ্ট করে! কন, আমি বলে চোর!
কথা শেষ করবার আগেই হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল বদর। হাঁটুতে মুখ গুঁজে ফুলে ফুলে কাঁদতে লাগল। বদরের কথা শুনে, বদরের কান্না দেখে স্তব্ধ হয়ে গেল আদিলউদ্দিন। কাজের কথা ভুলে সেও বসে রইল বদরের পাশে।
.
১.৫৯
হাজামবাড়ির বড়ছেলে আবদুল বাড়ি ফিরল সন্ধ্যাবেলা। পরনে চেক লুঙ্গি আর ফুলহাতা আকাশি রঙের শার্ট। শার্টের ওপর খাকি রঙের মোটা একখান চাদর। চাদরটা গায়ে দেয়নি সে। মাফলারের মতো ভাঁজ করে গলার দুইপাশে ঝুলিয়ে রেখেছে। একহাতে ছোট্ট একখান চটের ব্যাগ। এই ব্যাগে লেপ তোশকের কাজ করবার সুই সুতা, কেঁচি, দুই এক টুকরা সালু কাপড়।
আবদুলের ঝাকড়া চুলে তুলার আঁশ লেগে আছে। পা ধুলায় ধূসর। পা দেখে বোঝা যায় বহুদূর পথ পাড়ি দিয়ে এসেছে সে। হাঁটার তালে ছিল বলে শরীর ফুটা করে বের হচ্ছিল গরম ভাপ। শীত টের পায়নি। ফলে চাদর গায়ে দেবার দরকার হয়নি।
আবদুলের স্বভাব হচ্ছে বাড়ি ঢুকেই পোলাপানের মতন মাকে ডাকা। কোথাও থেকে ফিরবার পর সে যেন আর বয়স্ক থাকে না পোলাপান হয়ে যায়। কোথায় গিয়েছিল, কী করল, কী দেখল সব মাকে না বলা পর্যন্ত শান্তি নাই।
বিয়ার পর পর এই দেখে খুব হাসাহাসি করত আবদুলের বউ। স্বামীর লগে ঠাট্টা মশকরা করত। আজকাল আর করে না। দিনে দিনে মানিয়ে গেছে। আজকাল বাড়ি ফিরে মাকে আবদুল না ডাকলে আবদুলের বউরই যেন উসপিস উসপিস লাগে। স্বামীকে মনে করিয়ে দেয়, কী, বাইত্তে আইয়া তোমার মারে দিহি আইজ ডাকলা না!
আজ তেমন কিছুর দরকার হল না। আবদুল যখন বাড়িতে এসে উঠল ঠিক তখনই ঘাটপার থেকে উঠে এল আবদুলের বউ। কাঁখে ছোট মেয়ে। মেয়েটা আজ অবেলায় পায়খানা করেছে। পেট খারাপ হয়েছে। ঘাটে নিয়ে মেয়েকে ধুয়ে পাকলে আনল। আবদুলের বউ। সন্ধ্যার হিম শীতল পানি শরীরে ছোঁয়াবার ফলে বিরক্ত হয়েছে মেয়ে। মায়ের কাঁখে বসে ঙো ঙো করে কাঁদছিল। বাড়িতে উঠে দুইবার মাত্র মাকে ডেকেছে আবদুল, মা ওমা, তারপরই বউর কোলে ছোট মেয়েকে কাঁদতে দেখে মায়ের কথা ভুলে গেছে। ব্যস্ত হয়ে বউর দিকে তাকিয়েছে। কী অইছে? মাইয়াডা কান্দে ক্যা?
বউ নরম গলায় বলল, হোচাইছি (শৌচ কর্ম) দেইক্কা। পেট নামাইছে।
