কী আবার অইবো! হুনুম।
হোননের কাম নাই। মাইর যহন খাইছিই, আর কমু ক্যা?
গভীর অভিমানে যে বুক ভরে আছে মেয়ের হামিদা তা বুঝলো। বুঝে মন কেমন করে উঠল তার। মায়াবি গলায় বলল, ক আমারে। আমি তর বাপরে কমুনে। আমি কইলাম বুঝছি মাওলানা সাবে আগে তরে কিছু কইছে, নাইলে আতকা তুই তারে এই হগল কচ নাই।
নূরজাহান আবার থুতু ফেলল। আমারে কয় নাই, কইছে বাবারে।
কী কইছে?
দউবরা।
কথাটা বুঝতে পারল না হামিদা। বলল, কী, কী কইছে?
কইছে তুই দউবরার মাইয়া না! বাবার নাম কেঐ খারাপ কইরা কইলে আমার শইল জইল্লা যায়। তাও আমি কিছু কইতাম না। যহন আমারে অনেক আবল তাবল কথা কইছে তহন আমি তারে পচা মলবি কইছি। রাজাকার কইছি।
তর এই হগল কথার লেইগা মাওলানা সাবে তর বাপরে কী আপমান করছে তুই জানচ?
কী করছে।
হোনলে তর মায়া লাগবো।
আগের মতো অভিমানের গলায় নূরজাহান বলল, এমুন বাপের লেইগা আমার মায়া লাগে না।
একখান থাবড় মারছে দেইক্কা এত খারাপ হইয়া গেল বাপে?
আমারে কিছু না জিগাইয়া, কিছু না হুইন্না মারলো ক্যা? আগে বেবাক কথা আমারে জিগাইতো, বেবাক কথা হুইন্না যুদি দেখতে আমি দোষ করছি, একটা ক্যা দশটা থাবড় মারলেও আমি চেততাম না। কথা নাই বার্তা নাই বাইত্তে আইয়া থাবড় মারল আমারে!
ঠিলার শেষ পানি গর্তে ঢেলে উঠে দাঁড়াল হামিদা। খালি ঠিলা হাতে নূরজাহানের সামনে এসে দাঁড়াল। অমুন সমায় মাথা ঠিক থাকে না মাইনষের।
নূরজাহান কথা বলল না, থুতু ফেলল।
হামিদা বলল, মাওলানা সাবে তর বাপরে বহুত অপমান করতাছে।
কী অপমান?
রস বেচতে গেছিলো তার বাইত্তে, রসের দাম তো দেয় নাই, তর কথা কইয়া বকাবাজি করতাছে তারবাদে গর্দানে ধাক্কা দিয়া বাড়ির নামায় হালায় দিছে। তরে থাবড় দেওনের পর এই হগল কথা কইয়া তর বাপে বহুত কানছে।
মায়ের কথা শুনে দাঁত মাজতে ভুলে গেল নূরজাহান, চোখের পলক ফেলতে ভুলে গেল, শ্বাস ফেলতে ভুলে গেল। বাপকে গালাগাল করেছে মান্নান মাওলানা সেই গালাগাল পরিষ্কার শুনতে পেল সে। ঘেটি ধাক্কা দিয়ে কীভাবে বাড়ির নামায় ফেলে দিয়েছে সেই দৃশ্য চোখে দেখতে পেল। দেখে চোয়াল শক্ত হয়ে গেল নূরজাহানের, চোখ জ্বলতে লাগল। নূরজাহানের ইচ্ছা হল এখনই মান্নান মাওলানার বাড়িতে ছুটে যায়। গিয়ে হাতের থাবায় মুঠ করে ধরে তার দাঁড়ি। একহাতে দাঁড়ি ধরে অন্যহাতে ঠাস ঠাস করে একটার পর একটা থাবড় মারে তার গালে। তারপর প্রচণ্ড জোড়ে এক লাথি মারে তার কোকসা বরাবর। সেই লাথথি খেয়ে হুমড়ি খেয়ে সে যেন গিয়ে পড়ে বাড়ির নামায়। যেখানে পড়েছিল দবির গাছি।
কিন্তু নূরজাহান মেয়ে। মেয়েরা কী পারে এমন করে কোনও পুরুষকে মারতে!
বুকফাটা ক্রোধে, দাঁতে দাঁত চেপে নূরজাহান বলল, আমি যে ক্যান মাইয়া অইয়া জন্মাইছি! আমি যে কেন পোলা অই নাই!
.
১.৫৮
কাম করবেন না বাজান?
মুখ ঘুরিয়ে লোকটার দিকে তাকাল বদর। উদাস, নির্বিকার চোখে খানিক তাকিয়ে রইল তারপর আগের ভঙ্গিতে চোখ তুলে আকাশের দিকে তাকাল। কথা বলল না।
দক্ষিণ মেদিনীমণ্ডলের মাঝ বরাবর, সড়কের নামায় চক। সেই চকে উদাস হয়ে বসেছিল বদর। পায়ের কাছে উপুড় করে রাখা তার য়োড়া। য়োড়ার দিকে তার মন নাই। য়োড়ার দিকে সে একবারও তাকায়নি। সে তাকিয়ে ছিল আকাশের দিকে। চোখে মুখে আশ্চর্য এক উদাসীনতা। আকাশের দিকে তাকিয়ে কী দেখছিল বদর কী দেখছিল না, বদর ছাড়া কেউ তা জানে না।
বেশ খানিকটা বেলা হয়েছে। শীত সকালের কুয়াশা কেটেছে অনেক আগে। রোদ এখন দারাস সাপের মতো তেজাল। দুনিয়াদারি ভেসে যাওয়া এই রোদ তোয়াক্কা না করে নিঃশব্দে কাজ করে যাচ্ছে মাটিয়ালরা। সড়কের মুখে দাঁড়িয়ে তাদের কাজ তদারক করতাছে হেকমত। আলী আমজাদ সাইটে নাই বলে ছাতাটা সে নিজের মাথায় ধরে রেখেছে।
আড়চোখে একবার হেকমতকে দেখল লোকটা তারপর আবার বলল, কাম করবেন না?
এবার আর লোকটার দিকে তাকাল না বদর। আকাশের দিকে যেমন তাকিয়ে ছিল তেমন তাকিয়ে থেকেই শান্ত গলায় বলল, না।
ক্যা?
চোরেরা এই হগল কাম করে না। তারা খালি চুরি করে।
বদরের কথা বুঝতে পারল না লোকটা। অবাক গলায় বলল, জ্বে!
হ। হারাদিন ঘুমায় চোরেরা, হারারাইত চুরি করে। শইল্লে তেল মাইক্কা, লুঙ্গি কাছা দিয়া খন্তি হাতে লইয়া যায় গিরস্ত বাড়িতে। পিড়া খুইদ্দা গিরস্তঘরে সিং (সিধ) দেয়। দিনের বেলা চোরেগো কোনও কাম থাকে না। আমারও নাই।
ভাঙাচোরা শরীরের বয়স্ক লোকটা এবার থতমত খেল। মাজায় তার গামছার মতো করে বাঁধা খয়েরি রঙের পুরানা কালের একখান চাদর। গায়ে ছেঁড়া হাতাআলা গেঞ্জি। হাতে গোড়া, মাথায় সাপের মতো কুণ্ডলি পাকান নাড়ার বিড়া। মুখের দাঁড়িমোচ ধুলায় ধূসর। কন্ট্রাক্টর সাহেব সাইটে নাই দেখে কাজে ফাঁকি দিয়ে বদরের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে সে। আমোদ ফুর্তিতে ভরপুর বদর কাজ না করে চকে বসে আছে কেন জানার ভারি কৌতূহল হয়েছিল তার। অসুখ বিসুখ করেনি তো বদরের।
কন্ট্রাক্টর সাহেবের তুলনায় লেবার সরদার হেকমতও কম কঠিন লোক না। দশদিকে চোখ তার। হেকমতের সামনে কাজে ফাঁকি দেওয়া খুবই কঠিন। ফাঁকি হেকমতের চোখে পড়বেই। তবু ঝুঁকি লোকটা নিয়েছে। দূর থেকে বসে থাকা বদরকে দেখে বুকের ভিতরে আশ্চর্য এক মমত্ববোধ জেগে উঠেছিল তার। বদরের কাছে না এসে পারেনি। হেকমতের হাতে ধরা পড়লে পড়বে। কন্ট্রাক্টর সাহেবের মতো নির্দয় মানুষ না হেকমত। ধরা পড়লে কাজ থেকে ছাড়িয়ে দেবে না। হাত পায়ে ধরে অনুনয় বিনয় করলে মাফ করে দিবে। বদরের জন্যে না হয় হেকমতের হাত পায়ে ধরবে সে!
