ভয়ে ভয়ে তছির মা তারপর বলল, আইচ্ছা ক।
এক বেডা আমারে নষ্ট করতে চাইছিলো।
কথাটা শুনে আঁতকে উঠল তছির মা। চোখে লেগে থাকা ঘুম পলকে উধাও হয়ে গেল। চাপা ভয়ার্ত গলায় বলল, কচ কী? কবে?
আইজঐ।
কোনহানে? সীতারামপুর। মুরলিভাজা কিনতে গিয়া?
না। আমি সীতারামপুর যাই নাই। আমি গেছিলাম কোলাপাড়া।
কার লগে গেছিলি?
ঘটনা খুলে বলল তছি। রুস্তম রিকশাআলা কীভাবে তাকে রিকশায় তুলেছে, কীভাবে কোলাপাড়া বাজার থেকে কিনে এনেছে মুরুলিভাজা, কীভাবে নিয়ে গেছে খালপারের নির্জন ছাড়াবাড়িতে, কীভাবে দখল নিতে চেয়েছে তছির শরীরে আর কীভাবে তছি তাকে গামছার ফাঁসে আটকে শায়েস্তা করেছে, সব বলল। শেষ পর্যন্ত লোকটার যে চেতন ছিল না, বিঘত পরিমাণ জিভ বেরিয়ে এসেছিল মুখ থেকে এবং তছি তাকে লাথি মেরে ফেলে দিয়েছে খালের পানিতে এসব শুনে গলা শুকিয়ে গেল তছির মায়ের। ঢোক গিলে কোনও রকম সে বলল, বেডায় মইরা যায় নাই তো? মাইরা হালাচ নাই তো বেডারে?
তছি নির্বিকার গলায় বলল, কইতে পারি না। আমার তহন কান্দন আইছিলো। কানতে কানতে সড়কে উটছি। দৌড়াইতে দৌড়াইতে বাইতে আইছি। বাইত্তে আইয়া দেকলা না কেথা মুড়াদা (কাঁথা মুড়ি দিয়ে) হুইয়া পড়লাম। তুমি ভাত খাইতে ডাকলা, উটলাম না। দোফইরা ভাত খাই নাই, রাইতকার ভাত খাই নাই। হুইয়াঐ রইলাম। কোন মরার মুরলি যে গোলামের পোয় খাওয়াইলো, আমার দিহি আর খিদা লাগে না। আর এই যে এতক্ষুণ হুইয়া রইলাম, ঘুম কইলাম আহে নাই আমার। এমতেঐ হুইয়া রইলাম।
তছির মা বলল, আমি এই হগল চিন্তা করতাছি না। আমি চিন্তা করতাছি অন্যকথা।
কী কথা?
বেডা যুদি মইরা গিয়া থাকে তাইলে তো সব্বনাশ অইবো।
কীয়ের সব্বনাশ?
বাইত্তে দারগা পুলিশ আইবো। দারগা পুলিশ আইয়া ধইরা লইয়া যাইবো তরে। জেলে দিবো তরে, ফাঁসিতে দিবো।
একথায় তছি একেবারে দিশাহারা হয়ে গেল। ভয়ে আতংকে কুঁকড়ে গেল। কও কী?
হ। মানুষ খুন করলে ফাঁসিতে দেয়।
হায় হায় আমি তো এইডা বুজি নাই। ওমা, মা তয় আমি অহন কী করুম? দারগা পুলিশে আইয়া যুদি ধইরা লইয়া যায় আমারে? যুদি ফাঁসিতে দেয়?
যেন এই রাত দুপুরেই দারোগা পুলিশ এসে দাঁড়িয়েছে বাড়ির উঠানে, কোন ঘরে লুকিয়ে আছে তছি, জানার চেষ্টা করতাছে। এখুনি যেন ঝাঁপ সরিয়ে এই ঘরে ঢুকবে তারা, তছিকে ধরবে, এরকম আতংকিত অবস্থা হল তছির। অতিরিক্ত ভয় পাওয়া শিশু যেভাবে মায়ের বুকে মুখ লুকায়, মাকে দুইহাতে জড়িয়ে ধরে কুঁকড়ে মুকড়ে যায়, তছি তেমন শিশু হয়ে গেল, মায়ের বুকে মুখ লুকাল। শরীর তখন থরথর করে কাঁপছে তার। গলা বন্ধ হয়ে আসছে। তবু ফিসফিস করে বলল, আমারে কোনওহানে হামলাইয়া (লুকিয়ে) থোও মা। কোনওহানে হামলাইয়া থোও। এমুন জাগায় হামলাও, দারগা পুলিশ আইয়া য্যান বিচড়াইয়া না পায় আমারে। আমার য্যান ফাঁসিতে না দেয়। মাগো, মরণরে বহুত ডরাই আমি।
অসহায় মেয়েটিকে বুকে জড়িয়ে ধরে তছির মা তখন স্থির হয়ে আছে। এই মেয়েকে সে কোথায় লুকিয়ে রাখবে!
.
১.৫৭
হামিদা বলল, কীরে তুই তর বাপের লগে কথা কচ না?
উঠানের কোণে দাঁড়িয়ে ছাই দিয়ে দাঁত মাজছে নূরজাহান। খানিক আগে ঘুম থেকে উঠেই রান্নাচালায় ছুটে গেছে। চুলা থেকে নাড়ার ছাই তুলে বাঁহাতের তালুতে নিয়েছে। এখন উঠানের কোণে দাঁড়িয়ে সেই ছাই ডানহাতের এক আঙুলে ছুঁইয়ে চুঁইয়ে দাঁত মাজছে। নূরজাহানের চারপাশে ঝকমক ঝকমক করতাছে শীত সকালের রোদ। গাছগাছালির ডালপালা চকেমাঠে জমে থাকা কুয়াশা কাটতে শুরু করেছে।
মায়ের কথা শুনে পিরিক করে থুতু ফেলল নূরজাহান। কথা বলল না।
ঘরের পুবকোণে, বাড়ির নামার দিকে কদু উসসির আঁকা (লাউ সিমের মাচান)। লতার গোড়ার কাছে হাতদুয়ের লম্বা আর হাতখানেক চওড়া একখান গর্ত। পানির ঠিলা এনে সেই গর্তটার সামনে রেখেছে হামিদা। এখন ঠিলা কাত করে একটু একটু করে পানি ঢালছে গর্তে। কদু উসসির শিকড় ধীরে শুষে নিচ্ছে পানি। একবারে পানি ঢেলে গর্ত ভরে দিলে অতিরিক্ত পানির চাপে পচন ধরে যেতে পারে শিকড় বাকড়ে। এইজন্য এভাবে পানি দিতে হচ্ছে গোড়ায়। একবার কিছুটা পানি ঢেলে অপেক্ষা করতে হচ্ছে কখন মাটির তলায় চলে যায় পানি, কখন চুমুকে চুমুকে পানি শেষ করে আবার হাঁ করবে কদু উসসির শিকড়।
নূরজাহান কথা বলছে না দেখে চোখ তুলে মেয়ের দিকে তাকাল হামিদা। কথা কচ ক্যা?
নূরজাহান আনমনা গলায় বলল, কী কমু?
জিগাইলাম যে তার বাপের লগে কথা কচ না ক্যা?
ক্যা কথা কই না জানো না তুমি?
থাবড় দিছে দেইক্কা!
নূরজাহান কথা বলল না। উদাস হয়ে চকের দিকে তাকিয়ে রইল।
হামিদা বলল, পোলাপানে দোষ করলে মা বাপে তাগো মারবো না?
নুরজাহান বলল, কী দোষ করছিলাম আমি।
মাওলানা সাবরে গাইল দিছস। রাজাকার কইছস।
কীর লেইগা কইছি জানো?
প্রথমবারের ঢেলে দেওয়া পানি শুষে নিয়েছে মাটি। ধীরে ধীরে মাটির তলায় মিলিয়ে যাচ্ছে পানি, এই দৃশ্য তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিল হামিদা আর কথা বলছিল না। পানি মিলিয়ে যেতেই গর্তের মুখে আবার কাত করল ঠিলা। তুই কইলে সেন্না (তো) জানুম!
হোনতে চাইছো?
এই যে চাইতাছি। ক।
দাঁত মাজতে মাজতে উদাস হয়ে গেল নূরজাহান। অহন আর কইয়া কী অইবো!
