দেলোয়ারাও হাসলেন। হ একদম উচিত শিক্ষা দিছো বাজান। জিন্দেগানিতে আর বড়কথা কইতে পারবো না।
রাবি বলল, কথা যাঐ কইছেন না কইছেন, কামডা তো ঠিকঐ দিলেন মামা!
এনামুল আবার হাসল। কেন যে দিছি হেইডা বোজলে তুই আর মতলার বউ হইতি। তুই হইতি আমার খালা। খালায় যা বোজনের ঠিকঐ বোজছে।
এনামুল আবার হাসল। কেন যে দিছি হেইডা বোজলে তুই আর মতলার বউ হইতি। তুই হইতি আমার খালা। খালায় যা বোজনের ঠিকঐ বোজছে।
১.৫৬-৬০ মাকে টেনে তুলল তছি পাগলনি
গভীর রাতে মাকে টেনে তুলল তছি পাগলনি। ওমা, ওডো তো। ওডো।
ছাপড়া ঘরের ভিতরে গাঢ় অন্ধকার। এই অন্ধকারে পাশাপাশি শুয়েছিল তিনজন মানুষ। তছি তছির মা আর আবদুলের ছোটছেলে বারেক। বারেক একেবারে দাদী ন্যাওটা। দিনেরবেলা যেখানে থাকুক না থাকুক সন্ধ্যা হলে দাদীর আঁচল আর ছাড়ে না। রাতের খাওয়া দাওয়া সব দাদীর হাতে। পেশাব পায়খানা ধরলে তাও করাতে হবে দাদীর। আর ঘুম তো আছেই। দাদীর বিছানায় শুয়ে তার বুকের কাছে মুখ গুঁজে না। দিলে ঘুমই হয় না বারেকের।
এদিকে সন্ধ্যার পর থেকে নাতিটা তার লগে লগে থাকে বলে, দিনের আলো নিভে যাওয়ার পর থেকে তছির মাও বারেকের জন্য আকুল হয়ে যায়। বারেককে এক পলক না দেখলে অস্থির লাগে। বারেক একরাত কাছে না থাকলে ঘুম হয় না। বাড়ির পুবের ভিটার ছাপড়াঘরের মেঝেতে একপাশে পাগল মেয়ে অন্যপাশে নাতি না থাকলে অসহায় লাগে। মনে হয় কী যেন নাই, কী যেন নাই।
গিরস্তের সংসারে বউ শাশুড়ির ঝগড়া তো আছেই। কোনও কোনওদিন আবদুলের বউ আর তার শাশুড়ির ঝগড়া হলে, শাশুড়িকে জব্দ করবার জন্য রাতেরবেলা ছোট ছেলেটাকে নিজের কাছে আটকে রাখে আবদুলের বউ। মায়ের হাতে ভাত পানি ভয়ে ভয়ে খায় ছেলে কিন্তু শোয়ার সময় লাগে গণ্ডগোল। ছেলে কিছুতেই অন্য ভাই বোনের লগে মা বাবার পাশে শোবে না। প্রথমে ঘ্যান ঘ্যান করবে, আমি দাদীর কাছে যামু। ওমা, আমি দাদীর কাছে যামু। তারপর আরম্ভ করবে কান্না। শাশুড়ির ওপরকার জেদ তখন ছেলের ওপর ঝাড়ে আবদুলের বউ। গুমগুম করে কিল মারে ছেলের পিঠে। দাঁতে দাঁত চেপে বকাবাজি করে ছেলেকে। চুপ কর গোলামের পো। চুপ কর। দাদীর কাছে যাইবো! তুই কি তর দাদীর পেডে পয়দা অইছস না আমার পেডে! দাদীর কাছে হুইলে ঘুম আহে আমার কাছে আইবো না ক্যা?
ছেলে তারপর গুঙিয়ে গুঙিয়ে অনেকক্ষণ ধরে কাঁদে। মারের ভয়ে আর কথা বলে। রাত গম্ভীর হয়, ছেলের আর ঘুম আসে না। মা বাবা ভাই বোনের পাশে শুয়ে উসপিস উসপিস করে সে, এপাশ ওপাশ করে আর থেকে থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
ওদিকে তছির পাশে শুয়ে তার মায়েরও একই অবস্থা। ঘুম আসে না। কী রকম যে ছটফট ছটফট করে! মায়ের এই অবস্থা দেখে তছি পাগলনিরও মন খারাপ হয়। মাকে বুঝ দেওয়ার জন্য বলে, তুমি এমুন কইরো না মা। আটু সবুর করো, আটু রাইত অউক বারেকরে আমি আইন্না দিমুনে।
মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, কেমতে আনবি? ঐ গোলামের ঝিয়ে কি পোলাডারে ছাড়বো?
ছাড়বো। তুমি দেইক্কোনে।
গভীর রাতে তছি তারপর ছাপড়াঘরের ঝাঁপ খুলে বেরয়। পা টিপে টিপে এসে দাঁড়ায় আবদুলের ঘরের সামনে। নরম হাতে বেডায় টোকা দিয়ে ফিসফিস করে ডাকে, বারেক, ও বারেক ঘুমাইছস বাজান, ঘুমাইছস?
বারেকও তার দাদী আর পাগল ফুফুর মতো জেগে থাকে। ফুফুর গলা শুনেই বিছানা থেকে মাথা তুলে ঘরের ভিতরটা দেখে। ফুফুর মতন ফিসফিস করে বলে, না ঘুমাই নাই ফুফু।
তাইলে বাইর অ। কেঐ যেন উদিস না পায়।
আইচ্ছা।
ছেলে তারপর পা টিপে টিপে ঝাপের কাছে যায়। যেন আওয়াজ না হয় এমন ভঙ্গিতে ঝাঁপ একটুখানি ফাঁক করে নিজের শিশু শরীর সেই ফাঁক দিয়ে গলিয়ে দেয়। বাইরে বের হবার লগে লগে পাগল ফুফু তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে। আঁচলে জড়িয়ে বুকে করে নিয়ে যায় নিজেদের ঘরের দিকে। দাদীর বুকে নাতিকে পৌঁছে দেওয়ার পর যেন শান্তি তছির।
রাত দুপুরে পাগল ননদিনী এসে যে বেডায় টোকা দিয়ে তার ছেলেকে ডাকছে, ছেলে যে ঝাঁপ গলিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে এসবই টের পায় আবদুলের বউ। তখন সে আর কোনও কথা বলে না। মানুষের জন্য মানুষের এই টান, মায়া মমতার এই খেলাটা তার ভাল লাগে। শাশুড়ির লগে ঝগড়াঝাটির কথা ভুলে যায়। ছেলে বেরিয়ে গেছে বলে আলগা হয়ে আছে ঝাঁপ। উঠে যত্ন করে সেই ঝাঁপ লাগায় সে। তারপর নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ে।
নাতিকে রাতেরবেলা নিজের কাছে রাখতে রাখতে তছির মায়ের এমন এক অভ্যাস হয়েছে, ঘুমিয়ে থাকলে বারেক ডাকলে তো মনে হয়ই বারেক ডাকছে, তছি ডাকলেও মনে হয় বারেকই ডাকছে। আজ রাতেও তাই হল। তছির ডাকে ধরফর করে উঠল সে! কিন্তু জড়িয়ে ধরল বারেককে। কী অইছে মিয়াভাই? ডাক পারো ক্যা? পেশাব করবা?
বারেক ঘুমে কাদা। সে কোনও সাড়া দিল না। অন্যপাশ থেকে তছি বলল, বারেকে তোমারে ডাক দেয় নাই। আমি ডাকদিছি।
ক্যা?
কথার কাম আছে।
তছির মা হাই তুলল। রাইত-দোফরে কীয়ের কথা? বিয়ানে কইচ।
বিয়ানে কওন যাইবো না। অহনঐ কমু!
ইস কুয়ারা।
কথাটা বলেই ভয় পেলে গেল তছির মা। রাত দুপুরে পাগল মেয়ের লগে রাগ করা ঠিক হবে না। কী না কী করে ফেলে। হয়তো চিইক্কর (চিৎকার) শুরু করল, হয়তো একহাতে মুঠি করে ধরল মায়ের চুল। হয়তো কিল থাবড় মারল মাকে, খামছি দিয়ে ছাল চামড়া তুলে ফেলল।
