ছ্যানে ধার দিতে দিতে এসব ভাবছে দবির। সময় যে অনেকটা কেটেছে খেয়াল করেনি। ছ্যান যে অতিরিক্ত ধার হয়েছে খেয়াল করেনি। ঘষেই যাচ্ছে, ঘষেই যাচ্ছে।
ব্যাপারটা খেয়াল করল নূরজাহান। রান্নাচালায় জলচৌকিতে বসার মতো করে বসেছে সে। টোপরে চাউলভাজা। রান্নাচালার ভিতর চুলার পারে বসে খানিক আগেই দুই খোলা মোটাচাউল ভেজেছে হামিদা। একখোলা দিয়েছে নূরজাহানকে, আরেক খোলার অর্ধেকটা নিজে নিয়েছে, অর্ধেকটা রেখেছে স্বামীর জন্য। কিন্তু স্বামীর দেখি ছ্যানে ধার দেওয়াই শেষ হয় না। কখন চাউলভাজা খাবে, কখন বাড়ি থেকে বের হবে!
একমুঠ চাউলভাজা মুখে দিয়ে স্বামীকে ডাকতে যাবে হামিদা তার আগেই নূরজাহান বলল, ও বাবা, কত ধার দেও? ছ্যান দেহি চকচক করছে!
নূরজাহানের কথায় বাস্তবে ফিরল দবির। আনমনা ভাব কেটে গেল। বালিকাচায় ছ্যান ঘষা বন্ধ করে আঙুলের ডগায় ধার দেখল। তারপর হাসিমুখে মেয়ের দিকে তাকাল। ইট্টু বেশি ধার দিলাম মা। ম্যালা গাছ ঝুড়ন লাগবো।
টোপর থেকে একমুঠ চাউলভাজা নিয়ে মুখে দিল নূরজাহান। জড়ান গলায় বলল, আইজ কোন বাড়ির গাছ ঝুড়বা?
হালদার বাড়ির।
হালদার বাইত্তে খাজুরগাছ কো?
আছে। মজনুগো সীমানায় চাইরখান খাজুরগাছ আছে।
মজনু নামটা শুনে ভারি একটা খুশির ভাব হল নূরজাহানের। উচ্ছল গলায় বলল, মজনু দাদায় বলে অহন টাউনে থাকে? আফাজদ্দি খলিফার কাছে খলিফাগিরি হিগে?
হ, আমিও হুনছি। তরে কইলো কে?
ডালায় করে চাউলভাজা এনে স্বামীর সামনে রাখল হামিদা। নূরজাহান কথা বলার আগেই বলল, অরে কি আর কোনও কিছু কওন লাগে! হারাদিন পাড়া বেড়ায়। এই বাইত্তে যায়, ওই বাইত্তে যায়, কোন বাইত্তে কী অইলো বেবাক অর জানা।
দবির তখন ছ্যান ভরেছে ঠুলইতে। ভারের দুই মাথায় ঝুলিয়েছে হাঁড়িগুলি। এখন ঠুলই মাজায় বেঁধে, কাঁধে কাছি ফেলে বাড়ি থেকে বের হলেই হয়। হামিদা যে তার সামনে চাউলভাজার ডালা রেখেছে সেদিকে খেয়ালই নাই।
ঘটনা বুঝে হামিদা বলল, খাওন লাগবো না?
দবির হাসিমুখে হামিদার দিকে তাকাল। রসের দিনে খাওন দাওনের কথা মনে থাকে না।
হামিদা বলল, মনে না থাকলেও খাওন লাগবো। নাইলে মরবা।
দবির ফুর্তির গলায় বলল, আরে না এত সকালে মরুম না। মাইয়ার বিয়া দেওন লাগবে না?
তারপর ডালা থেকে একমুঠ চাউলভাজা নিয়ে মুখে দিল।
নিজের বিয়ার কথা শুনে, বাবার ওই রকম ফুর্তির ভাব দেখে টোপর ভাল করে চেপে ধরে মা বাবার সামনে এগিয়ে এল নূরজাহান। চঞ্চল গলায় বলল, ভাল কথা কইছো বাবা। আমারে বিয়া দিয়া দেও।
মেয়ের কথা শুনে রেগে গেল হামিদা। নূরজাহানের মুখের দিকে তাকিয়ে ধমক দিল। চুপ কর খাচ্চরনি। এত বড় মাইয়া মা বাপের মুখের সামনে বিয়ার কথা কয়!
দবির কিছু একটা বলতে যাবে তার আগেই নূরজাহান বলল, কইলে কী অয়? বিয়া তো আমারে তোমরা দিবাই!
আবার ধমক দিতে চাইল হামিদা, তার আগেই দবির বলল, এমুন কইরো না মাইয়ার লগে। কইছে কইছে। পোলাপান মানুষ এই হুগল বোজেনি।
হামিদা আগের মতোই রুক্ষ গলায় বলল, কীয়ের পোলাপান মানুষ! বস কম অইছেনি তোমার মাইয়ার? দামড়ি (যৌবনবতী গাভী অর্থে) অইয়া গেছে অহনতরি কথাবার্তির ঠিক নাই। এই মাইয়ারে তুমি হামলাও গাছি। নাইলে কইলাম বিপাকে পড়বা।
কী বিপাকে পড়ম?
যেমনে পাড়া চড়ে কুনসুম কী অইয়া যাইবো উদিস পাইবা না।
দবির আবার চাউলভাজা মুখে দিল। মাইয়া হামলানের কাম বাপের না, মার। তুমি হামলাও না ক্যা?
হামিদা ঘাড় বেঁকা করে স্বামীর মুখের দিকে তাকাল। আমি কইলাম পারি।
পারলে হামলাও।
তুমি কিছু কইবা না তো?
আমি কী কমু! মাইয়া আমারও যেমুন তোমারও অমুন।
কথাখান য্যান মনে থাকে।
দবির হাসিমুখে বলল, থাকবো।
নূরজাহানের দিকে তাকাল হামিদা। কী কইছে তর বাপে হোনছস?
নূরজাহান নির্বিকার গলায় বলল, হুনছি।
তারপর আবার চাউলভাজা মুখে দিল।
দবির ততক্ষণে মুখভরে চাউলভাজা নিয়ে নিজের ভাগেরটা খেয়ে শেষ করেছে। এখন রান্নাচালার ঠিলা থেকে টিনের মগে পানি ঢেলে খাচ্ছে। মা মেয়ের কথার দিকে খেয়াল নাই।
পানি খাওয়া শেষ করে ঠুলই মাজায় বাঁধল দবির। কাছি ফেলল এক কাঁধে আরেক কাঁধে তুলল ভার। উঠান পালান ভেঙে বাড়ির নামার দিকে হেঁটে যেতে যেতে নূরজাহানের দিকে তাকিয়ে হাসল। আইজ থিকা আমি কইলাম কিছু জানি না। তর মায় যা কইবো হেইডা অইবো।
কথাটা বুঝল না নূরজাহান। বাবার চলে যাওয়া পথের দিকে খানিক তাকিয়ে থেকে মায়ের দিকে মুখ ফিরাল। আরেক মুঠ চাউলভাজা দিল মুখে। চাবাতে চাবাতে (চিবাতে চিবাতে) বলল, কী কইবা কও!
হামিদা বলল, পরে কমুনে।
না অহনেই কও। পরে হোননের সময় পামু না।
ক্যা কই যাবি তুই?
হালদার বাড়ি যামু মজনু দাদার খবর লইতে। মজনু দাদায় খলিফা অইছে কিনা জানন লাগবো।
মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে ঠাণ্ডা গলায় হামিদা বলল, যাইতে পারবি না। আইজ থিকা ইচ্ছা মতন বাড়িত থন বাইর অইতে পারবি না। তুই ডাঙ্গর অইছস। আমার লগে থাইক্কা সংসারের কাম কাইজ হিগবি।
কথাটা বুঝতে পারল না নূরজাহান। অবাক চোখে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
.
১.০৮
বাড়ি থেকে বের হবার সময় ছনুবুড়ি দেখতে পেল তার ছেলের বউ বানেছা এন্দাগেন্দা পোলাপান (ছোট ছোট ছেলেমেয়ে) নিয়ে ঘরের মেঝেতে বসে বউয়া (তেল পেঁয়াজ মরিচ দিয়ে তৈরি এক ধরনের ভাত। চাল ধুদ দুটো দিয়েই হয়) খাচ্ছে। বেশ খানিকটা বেলা হয়েছে, এসময় বউয়া খেলে-দুপুরের ভাত বিকালে খেলেও অসুবিধা নাই। আর বিকালে ভাত খাওয়া মানে রাতে না খেলেও চলবে। গিরস্ত বাড়িতে যখন অভাব দেখা দেয় তখন অসময়ে বউয়া জাউ এসব খায় সংসারের লোকে।
