মজনু মুগ্ধ গলায় বলল, আমি তোমার মনের আশা পূরণ করুম খালা। দেইখো আমি ঠিকঐ বড় খলিফা অমু।
ডালা থেকে একটা পিঠা নিল মজনু। খালার মুখের সামনে ধরে বলল, অহন আমার হাত থিকা এই পিডাডা খাইবা। না খাইলে তোমার লগে আর কথা নাই। আইজ ঢাকা যামু গা।
টাকা হাতে ধরা মরনি অদ্ভুত চোখে মজনুর দিকে তাকাল, হাসিমুখে এক কামড় পিঠা খেল। তারপর ডানহাত বাড়িয়ে পিঠাটা নিল। দে বাজান, খাইতাছি।
মজনু বলল, খাইতে খাইতে আমার মার কথা কও খালা, বাপের কথা কও।
বাপের কথা কী হুনবি! মেউন্না (মেনিমুখো) পুরুষপোলা। তর মায় মরণের পর চল্লিশ দিনও গেল না, আরেকখান বিয়া করলো। তর মিহি (দিকে) ফিরাও চাইলো না।
কেমনে চাইবো, আমি তো তহন তোমার কাছে!
আমার কাছে থাকলেই কি পোলা দেকতে আহন যায় না?
আহে নাই?
না কোনওদিন আহে নাই। মাইনষের কাছে কইতো বউ মরছে, পোলাও মরছে। এর লেইগাঐত্তো তর বাপের মুখ তরে আমি কোনওদিন দেকতে দেই নাই। বাপ পোলা কেঐ কেঐরে চিনে না। নতুন সংসারে ম্যালা লোপান তার। আছে ভালঐ।
বাপের কথা বাদ দেও। মার কথা কও।
মরনি আরেক কামড় পিঠা খেল। তর মার আহুজ পড়বো, আমি গেছি বইনের কাছে থাকতে। তিনদিন আহুইজ্জা বেদনায় কষ্ট পাইলো বইনে। তারবাদে তুই অইলি। ভালয় ভালয়ই অইলি। মাত্র ছয়দিন, দোফর বেলা ছটফট করতে করতে মইরা গেল বইনে। আমার চোক্কের সামনে। আমি তরে কুলে লইয়া বইয়া রইছি, তুই বুজলিও না কারে তুই জীবনের তরে হারাইলি।
মজনু করুণ মুখে হাসল। আসলে হারাই নাই খালা। যে মরছে হে মরছে, আমি তো আমার মার কুলেই আছি। এই যে আমার মা।
বলেই খালার একটা হাত ছুঁয়ে দিল মজনু।
মরনি আবার দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ঠিক কইছস তর মা অমু দেইক্কাঐ আল্লায় আমারে পোলাপান দিলো না। তর রুজি খামু দেইকাঐ বস্বেরকালে (বয়সকাল) রাড়ি (বিধবা) অইলাম। বিলে চৌদ্দগণ্ডা জমিন, চাইর শরিকের বাড়িডার দক্ষিণ দিকে এডু জাগা, দুইখান ঘর, এই হগল রাইক্কা তর খালু মরলো। বাজানরে, দুইন্নাইতে তুই আর আমি ছাড়া আমগো কেঐ নাই।
জামগাছ থেকে টুনটুনিটা কখন উধাও হয়েছে, পাকা ডালিমের মতো রোদ কখন আরও উজ্জ্বল হয়েছে, দুইজন মানুষের কেউ তা খেয়াল করে না। তারা স্তব্ধ হয়ে থাকে গভীর কোনও দুঃখ বেদনায়।
.
১.০৭
ঘরের খাড়া পিড়ার (পৈঠা) সঙ্গে ঢেলান (হেলান) দিয়ে দাঁড় করানো হয়েছে বালিকাচা। উঠানে বসে বালিকাচায় ঘষে ঘষে ছ্যানে ধার দিচ্ছে দবির। খালি গা, লুঙ্গি কাছা মারা দবিরের পিঠে এসে পড়েছে সকালবেলার রোদ। রোদেপোড়া পিঠ চকচক করছে।
দবিরের হাতের একপাশে পড়ে আছে ঠুলই অন্যপাশে মাটির মালশায় বালি। বালিটা ছাই রঙের। এটা মুড়ি ভাজার বালি। আরবছর (আগের বছর) শীতকালে মুড়ি ভাজার পর যত্ন করে বালিটা মাটির পুরানা ঠিলায় রেখে দিয়েছিল হামিদা।
হামিদার কাছে সংসারের ফেলনা জিনিসটাও দামি। কোনও কিছুই ফেলে না সে। যত্নে তুলে রাখে ঘরদুয়ারের কোথাও না কোথাও। কে জানে কখন দরকার পড়বে কোনটার। হাত বাড়িয়ে না পেলে জোগাড় করতে জান বের হয়ে যাবে। খাটনির খাটনি সময়ও নষ্ট।
মুড়ি ভাজার বালি জোগাড় করতে হয় পদ্মারপার থেকে। মাওয়া কুমারভোগ বরাবর পদ্মারতীরে এখন বিশাল বালিয়াড়ি। পদ্মা সরে যাচ্ছে দূরে। তীরে রেখে যাচ্ছে সাদাবালি। মুড়িভাজার জন্য গরিব গিরস্তরা এসব জায়গা থেকে বালি জোগাড় করে আনে।
কাঁচা বালিতে মুড়ি ভাল ভাজা হয় না। বালি আগুনে ভাজা ভাজা করে নিতে হয়। গরম হলে বালির তেজ বাড়ে। সামান্য নুন পানি মিশান চাউল খোলায় টেলে (সামান্য ভাজা অর্থে) যে হাঁড়িতে গরম করা হয় বালি সেই বালিতে চাউল ঢেলে দুইহাতের কায়দায় আড়াই তিন পাক ঘুরালেই চুরমুর চুরমুর করে ফুটে উঠবে শিউলি ফুলের মতো মুড়ি। ভাজা মুড়ির গন্ধে বিভোর হবে দশদিক।
একবার ব্যবহার করা বালি এজন্য রেখে দেয় গিরস্ত বউরা। হামিদাও রেখেছে। যদিও মুড়ি ভাজার চেয়ে দবির গাছির ছ্যানের ধার দেওয়ার জন্য বালিটা সংসারে বেশি দরকার। মুড়ি ভাজার বালিতে ধার বেশি হয়। পাঁচ আঙুলের একথাবা বালিকাচায় ছিটিয়ে ছ্যানের আগায় একহাত মাথায় একহাত, ঘষা দেওয়ার লগে লগে ঝকঝক করে উঠবে ছ্যান। পাঁচ সাত মিনিটের মাথায় এমন হবে ধার, খাজুরগাছের গলা বরাবর ছোঁয়ালেই কোন ফাঁকে উধাও হবে শক্ত বাকল, খাজুরের নরম অঙ্গ দেখা যাবে রসে চপচপ করছে। আস্তে করে কঞ্চির নল ছোঁয়ালে ঢুকে যাবে। টুপটুপ টুপটুপ করে রস এসে পড়বে হাঁড়িতে। রাত পোহাবার জাগেই হাঁড়ি ভরে যাবে রসে। গন্ধে ম ম করবে চারদিক।
ভারটা পড়ে আছে উঠানের মাঝ বরাবর। লগে ছয়সাতটা হাঁড়ি। হাঁড়িগুলি ছিল রান্নাচালার বাতার সঙ্গে ঝুলান। বড়ঘরের চৌকির তলারগুলি কাল বিকালে মিয়াদের ছাড়া বাড়িতে রেখে এসেছে দবির। আজ এইগুলি নামিয়েছে হালদার বাড়িতে নিয়ে যাবে বলে। হাঁড়ি আরও কিছু লাগবে। মঙ্গলবার গোয়ালিমান্দ্রার হাট থেকে কিনে আনবে। এইবছর হাওয়া যেমন ছাড়ছে, রস পড়বে জবরদস্ত। কষ্ট যতই হোক চারপাশের গ্রামের সবগুলি গাছই ধরার চেষ্টা করবে দবির। রস বেচে সংসারের চেহারা ঘুরাতে হবে। চাষের জমিন যেটুকু আছে, এক কানিও হবে না। নিজে চষেও বছরের ধান হয় না। গাছি না হলে তো, শীতকালে রসের কারবার করে আয় না করলে তো তিনজন মানুষের তিন ওক্তের খাওয়াই জুটত না। তার ওপর মেয়ে বড় হচ্ছে। দুইতিন বছরের মধ্যে বিয়াশাদি দিতে হবে। আজকাল মেয়ে বিয়া দেওয়ার অর্থ সর্বস্বান্ত হওয়া। জামাইরে এইটা দেও, ওইটা দেও। যৌতুক ছাড়া মেয়ের বিয়া দেওয়া যায় না। সোনাদানা তো আছেই, নগদ টাকাও দিতে হয়। দবির গাছির মতো মানুষ এসব পাবে কোথায়? এখন থেকে এসব বিষয়ে না ভাবলে মেয়ের বিয়ার সময় জমিন বিক্রি ছাড়া উপায় থাকবে না। ওইটুকু মাত্র জমিন মেয়ের পিছনে গেলে হামিদাকে নিয়ে খাবে কী! দুইজন মানুষের তো বাঁচতে হবে, নাকি!
