একটু থেমে এনামুল বলল, সবমিল্লা কত টেকা লাগতে পারে মাওলানা সাব কইলেন না?
চাইর পাঁচলাক টেকা।
হ আমিও এমনুঐ আন্তাজ করছি। পাঁচলাক টেকা আমি খরচা করুম।
এত সহজে এতদিনকার স্বপ্ন সত্য হবে ভাবেননি মান্নান মাওলানা। উত্তেজনায় ফেটে পড়তে চাইছিলেন তিনি। তবু কায়দা করে চেপে রাখছিলেন উত্তেজনা। এখন সবকিছু একেবারে পাকা হয়ে যাওয়ার পর ধীর শান্ত গলায় বললেন, আমার যে আরেকখান কথা আছে।
এনামুল হাসল। কন। যা কথা আছে কইয়া হালান।
মজজিদের ইমাম হমু আমি।
হইবেন। আমার আপিত্তি নাই। আপনে যহন আছেন অন্য ইমাম আনুম ক্যা? অন্যরে যেই মায়না দিমু আপনেও ঐডাই নিবেন।
অনেকক্ষণ পর এই প্রথম কথা বললেন দেলোয়ারা। মাওলানা সাবে তো বলে। মায়না নিবো না!
একথা শুনে বেশ একটা দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলেন মান্নান মাওলানা। বেতনের কথা শুনে আনন্দিত হয়েছিলেন। মসজিদের ইমামতি পাওয়া মানে গ্রামের মাতব্বরি সর্দারি সব পাওয়া। বিচার সালিশের ভার সব পড়বে তার ওপর। তিনি যা বলবেন তাই হবে। সমাজে মসজিদের ইমামের বিরাট দাম। ইমাম সাহেবের কথার উপর দিয়া কেউ কোনও কথা বলে না। ইমাম সাহেব যা বলবে তাই হবে। ইমামের মিথ্যাও সত্যর চেয়ে জোরাল। এই ক্ষমতার লগে যদি মাসে মাসে পাওয়া যায় বেতন তাহলে তো সোনায় সোহাগা।
কিন্তু বেতনটা যে দেলোয়ারার কারণে হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। এজন্য অবশ্য মান্নান মাওলানাই দায়ী। দেলোয়ারার কাছে মসজিদের কথা বলতে এসে বেতন না নেওয়ার কথা তিনি নিজ মুখেই বলেছিলেন! ইস আগ বাড়িয়ে কথা বলে নিজের কতবড় সর্বনাশ যে করে বসে আছেন মান্নান মাওলানা!
সর্বনাশের হাত থেকে তাকে বাঁচিয়ে দিল এনামুল। বলল, না না, মায়না নিবো না ক্যা? মায়না ছাড়া ইমাম আমি রাখুম ক্যা? লাক লাকটেকা খরচা কইরা মজজিদ বানাইতে পারুম আর ইমাম রাখুম মাগনা, এইডা অয় না। লেইজ্জ মায়না আপনে পাইবেন মাওলানা সাব, চিন্তা কইরেন না।
মান্নান মাওলানা হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন। মুখে অমায়িক হাসি ফুটল তাঁর। ঐডা লইয়া আমি চিন্তা করি না। আমি জানি তুমি আমারে ঠকাইবা না। তুমি মানুষ ঠকাও না। মানুষ ঠকাইলে এতঅল্প বন্ধে আল্লায় তোমারে এতটেকা দিতো না।
মান্নান মাওলানার কথা শুনে মুগ্ধ হল এনামুল। সে আর কোনও কথা বলল না। খোলা দরজা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে রইল।
বাইরে তখন শীতের বিকাল প্রায় শেষ। গাছপালার মাথায় জমতে শুরু করেছে। কুয়াশা। ঘরের ভিতর কুয়াশার মতো করে জমছে অন্ধকার। হঠাত্র যেন এই পরিবেশটা খেয়াল করলেন মান্নান মাওলানা। ব্যস্তভঙ্গিতে উঠে দাঁড়ালেন। তয় যাই অহন। নমজের সমায় অইয়া গেল।
এনামুল বল, আইচ্ছা যান। ফাইনাল কথা তো অইয়া গেল। দশ পোনরো দিনের মইদ্যে আমি আবার বাইত্তে আইতাছি। আইয়া মাডির কাম শুরু কইরা দিমু। আপনে ধইরা নেন মজজিদ আপনের অইয়া গেছে।
হেইডা আমি জানি।
তয় আমারে আপনে দোয়া কইরেন। কামডা যেন ঠিকঠাক মতন করতে পারি।
গদগদ ভঙ্গিতে এনামুলের মাথায় হাত রাখলেন মান্নান মাওলানা। খালি দোয়া করুমনি তোমারে! জান পরাণ দিয়া দোয়া করুম। ধর্মের কতবড় একখান কাম যে তুমি করলা, আখেরের কতবড় কাম যে করলা এইডা অহন বোজবা না। এইডা বোজ পরে।
মান্নান মাওলানা বেরিয়ে গেলেন। দেলোয়ারাও উঠলেন। দেখে এনামুল বলল, আপনে উঠলেন ক্যা আম্মা?
সন্ধ্যা অইয়া গেছে। হারিকেন ধরাই।
রাবিরে কন, রাবি ধরাইবো নে। আপনে বহেন।
দেলোয়ারা বসলেন। বসে রাবিকে ডাকলেন। ঐ রাবি, হারিকেন ধরা।
রান্নাঘরের দিক থেকে সাড়া দিল রাবি। ধরাইতাছি।
এবার এনামুল একটু লড়েচেড়ে বসল। দেলোয়ারার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, কী কন আম্মা, মজজিদের কাম তাইলে শুরু কইরা দেই।
দেলোয়ারা অমায়িক গলায় বললেন, দেও।
তার আগে অন্য কামডি যে করতে হয়।
কী কাম?
ছাড়াবাড়ি রেস্টারি।
কইরা হালাও।
আপনে তাইলে আমার লগে ঢাকা লন। মার লগে কথা কইয়া বাড়ি আমার নামে রেস্টারি কইরা দেন। দামের টেকা লগে লগেঐ দিয়া দিমুনে। দিয়া ব্যাংকে একাউন্ট কইরা দিমুনে। টেকা ব্যাংকে রাইক্কা দিয়েন।
দেলোয়ারা নরম গলায় বললেন, তুমি যা ভাল বোজো করো।
এনামুল বলল, বাড়ির দলিল পরচা কো?
তোমার মার কাছে।
তাইলে ঠিক আছে। কাইল আপনে আমার লগে লন।
লও।
অনেকক্ষণ পর এবার কথা বলল মোতালেব। হ যান বুজি। ভালকামে দেরি করন ঠিক না।
একটু থামল মোতালেব। তারপর এনামুলের মুখের দিকে তাকাল। তোমারে একখান কথা কইতে চাই মামু।
এনামুল ভুরু কুঁচকে বলল, কী?
এতবড় একখান কাম করতাছো তুমি, দেশ গেরামে কত নাম অইবো তোমার। আল্লায় টেকা দিচ্ছে তোমারে, হেই টেকা তুমি আল্লার কামে লাগাইতাছো। তয় আমরা কিছু আশা করতে পারি না তোমার কাছে? আমরা তো পর না! তোমগো আপনা মানুষঐ। আপনা মানুষগো ইট্টু দেবা না?
মুখ তুলে মোতালেবের দিকে তাকাল এনামুল। কথাডা বোজতে পারলাম না। খোলসা কইরা কন।
মোতালেব হাত কচলাতে কচলাতে বলল, মজজিদ বানাইবা, কত কাম মজজিদের! মাইট্টাল দিয়া মাডি কাইট্টা বাড়ি বানবা, হালট বানবা। বড় সড়কে আইয়া টেরাক থামবো, টেরাক থিকা ইটা নামান লাগবো, রড সিমিট নামান লাগবো। তারবাদে বাড়ি তড়ি আনন লাগবো। এই হগল কামের দেখভালের লেইগা একজন মানুষ লাগবো না?
