মোতালেবের উদ্দেশ্য ততক্ষণে বুঝে ফেলেছে এনামুল। বুঝেও না বোঝার ভান করল। সরল গলায় বলল, হ তা তো লাগবোঐ।
ঐ কামডা আমারে দেও। দরকার অইলে কনটাক দিয়া দেও। বেবাক কাম ঠিক মতন কইরা দেই। তোমার কোনও চিন্তা থাকবো না।
এনামুল কথা বলবার আগেই দেলোয়ারা গম্ভীর গলায় বললেন, না তরে কোনও কাম দেওন যাইবো না।
মোতালেব থতমত খেল। ক্যা?
তুই আইজ কাইল বহুত বড় বড়কথা কচ।
কবে আপনের লগে বড়কথা কইলাম আমি?
হারিকেন হাতে রাবি এসে দাঁড়াল ভিতর দিককার দরজার সামনে। তার পিছনে বাদলা। হারিকেনটা দুই কামরার মাঝামাঝি মাটিতে রাখল রাবি। ঘরের ভিতর জমে ওঠা অন্ধকার হারিকেনের আলোয় কেটে গেল।
রাবি এবং বাদলার দিকে একবার তাকালেন দেলোয়ারা, তারপর বললেন, কয়দিন আগে বাদলারে তুই মারছস। আমি হেই কথা জিগাইছি দেইক্কা আমার লগে কুইদ্দা (রেগে ওঠা অর্থে) উঠছস। এনামুলের কথা কওনের লগে লগে কইছস আমি তরে এনামুলের ডর দেহাইনি!
বাদলার গায়ে হাত তোলার কথা উঠেছে দেখে রাবি ভাবল এই তো সুযোগ। এই সুযোগে এনামুল মামার সামনে মোতালেবকে যতটা নাকাল করা যায় করবে সে।
দেলোয়ারার দিকে তাকিয়ে রাবি বলল, বুজি, আসল কথাডিই তো কইতাছেন না আপনে। হেয় যে বাদলারে কইছিলো আমগো তো বাইত থিকা উড়াইয়া দিবোঐ দরকার অইলে আপনেরে শুদ্দা উডাইয়া দিবো।
একথা শুনে মুখ চুন হয়ে গেল মোতালেবের। কোনও রকমে সে বলল, না এই কথা আমি কই নাই। কীরে বাদলা, কইছি?
বাদলা বলল, হ কইছেন।
বাদলাও যে এরকম সাক্ষী দিবে ভাবেনি মোতালেব। সে একেবারে বেকুব হয়ে গেল। মুখে আর কথা জুটল না।
এনামুল ততক্ষণে বেশ রেগেছে। রাগলে নাকের পাটা ফুলে যায় তার। এখনও ফুলল। গম্ভীর গলায় বলল, আমি আগেও দুই চাইরবার হুনছি আমগো ঘরে যারা থাকে তাগ লগে খারাপ ব্যবহার করেন আপনে। উল্টাপাল্টা কথা কন। আমার মা খালারেও বলে বকাবকি করেন। এত সাহস আপনে পান কই? আমরা কি আপনের হাতের ফাঁক দিয়া পইড়া যাই? বিপদে পড়লে তো পয়লা দৌড়াইয়া যান ঢাকায়, আমগো বাসায়। টেকা দিয়া সাহাইয্য করলে আপনেরে আমিঐ করি। মাইয়ার চিকিৎসা করাইবেন কইয়া তিন চাইর মাস আগেও তো পাঁচ হাজার টেকা আনছেন আমার কাছ থিকা।
একথা শুনে ঝট করে এনামুলের দিকে তাকালেন দেলোয়ারা। কও কী? পাঁচ হাজার টেকা আনছে? কবে আনলো? তুমি দিহি আমারে কিছু কইলা না?
কই নাই এমতেঐ। মাইনষের উপকার কইরা সেই কথা না কওনঐ ভাল।
মাইয়ার চিকিৎসা কইলাম ও করায় নাই।
তাইলে কী করতাছে টেকা আইন্না?
রাবি বলল, কী আর করবো? খাইছে। পরের টেকা বইয়া বইয়া খাইতে তো বহুত মজা।
মোতালেব তখন মাথা নিচু করে বসে আছে। যেন কারও দিকে তাকাবার মুখ আর নাই তার।
দেলোয়ারা আবার মোতালেবের দিকে তাকালেন। এত কিছুর পরও আমগো লগে এত বড় বড়কথা কেমতে কচ তুই! আরে তর তো থাকনের কাম আমগো চাকর বাকরের লাহান।
এনামুল শ্লেষের গলায় বলল, কাম কাইজ যা চায় তাও তো চাকর বাকরের কাম। কামলার কাম।
তারপর মোতালেবের দিকে তাকিয়ে বলল, ঐ মিয়া আমগো বাড়ির কামের মাইনষের লগে এত বড় বড়কথা কইয়া আমগো কাছে কাম চাইতে আহেন, সাহাইয্য চাইতে আহেন, শরম করে না আপনের? তহন বড়কথা থাকে কই?
মোতালেব মাথা তুলল না, কথা বলল না।
এনামুল বলল, মজজিদের কাম কয়দিনের মইদ্যে শুরু করুম আমি। কনটাক। আপনেরে দিমু না। ঐ আশা কইরা লাভ নাই। লেবারগ সর্দারিডা ইচ্ছা করলে আপনেরে আমি দিতে পারি। রোজ দরে পয়সা পাইবেন। তয় হেইডাও ফাইনাল না। মাওলানা সাবের লগে কথা কইয়া লই। দেহি হেয় কী কয়।
এবার মুখ তুলল মোতালেব। কাতর গলায় বলল, তুমি কইলে আমি গিয়া মাওলানা সাবরে ধরি।
না আপনের ধরনের কাম নাই। তয় আমার মনে অয় লেবার সর্দারিও আপনে পাইবেন না। মাওলানা সাবে না করবো। এই হগল তদারকি হেয় নিজেঐ করবো।
মোতালেব বুঝে গেল নানা রকম কায়দায় অপমান যা করার করা হয়েছে তাকে। কাজের লোভের মুলাটা নাকের আগায় ঝুলিয়ে দিয়েও সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। মসজিদের কাজে তার আর কোনও আশা নাই।
ব্যাজার মুখ করে উঠে দাঁড়াল সে। কারও দিকে না তাকিয়ে দুয়ারের দিকে পা বাড়াল।
এনামুল বলল, যান গা নি?
হ। কী করুম আর।
কামডা পাইলে কি এমতে যাইতেন গা?
মোতালেব কথা বলল না।
এনামুল বলল, ধরেন লেবার সর্দারির কাম আপনেরে আমি দিয়া দিলাম।
লগে লগে মুখ উজ্জ্বল হয়ে গেল মোতালেবের। তুমি তো ইচ্ছা করলে দিতে পারোঐ। মাওলানা সাবরে লাগেনি!
না তা লাগে না। কাম আমার, টেকা আমার। আমার যারে ইচ্ছা তারে আমি দিমু। আপনেরে দিয়া দিলাম।
আলহামদুলিল্লাহ।
তয় আমার কহেকখান কথা আপনের মাইন্না চলতে অইবো।
চলুম।
আমার মা খালার সামনে, আমগো বাইত্তে যারা থাকে, মতলা রাবি বাদলা অগো সামনে সিনা টান কইরা হাঁটতে পারবেন না। এমুনভাবে হাটবেন, মালিকের সামনে চাকররা যেমতে হাটে। কথা কইবেন এমুনভাবে, আপনের গলার আওজে য্যান বুজা যায়, অরা মালিক আর আপনে অইলেন চাকর। কোনও রকমের হামতাম (আস্ফালন) করলে লেবার সর্দারি আপনের থাকবো না। ঠিক আছে
মোতালেব বিনীত গলায় বলল, ঠিক আছে।
তয় যান অহন।
মোতালেব মাথা নিচু করে বেরিয়ে গেল।
মোতালেব বেরিয়ে যেতেই দেলোয়ারার দিকে তাকিয়ে হাসল এনামুল। কী কন আম্মা! উচিত শিক্ষা দিছি না?
