এনামুল বলল, ক্যা?
তারা মানুষ ভাল না। বারোপদের কথা কইবো।
কী কথা?
তারা তো এমতেঐ আমারে দেকতে পারে না। মনে করবো মজজিদ আমি অন্য মতলবে বানাইতাছি।
মজজিদ আবার অন্য মতলবে বানায় কেমতে? মজজিদ অইলো আল্লার ঘর। মাইনষে নমজ (নামাজ) পড়বো। মজজিদের লগে মতলবের কোনও সমন্দ নাই।
এনামুলের কথা শুনে মান্নান মাওলানা মুগ্ধ হলেন। এইডা তুমি বোজো দেইক্কাঐ তোমারে ধরছি। অন্য কের কাছে যাই নাই।
বোজলাম। তয় খাইগো বাড়ির মজজিদ থাকতে একঐ গেরামে আরেকখান মজজিদ আপনে বানাইতে চাইতাছেন ক্যা?
এই প্রশ্নের উত্তর তৈরিই ছিল মান্নান মাওলানার। বললেন, খাইগো বাড়ির মজজিদটা আমগো পাড়া থিকা অনেক দূরে। অতদূরে গিয়া জামাত ধরন বহুত অসুবিদা। অনেক বুড়া মানুষ আছে এতাহানি হাইট্টা যাইতে পারে না। তাগো চিন্তা কইরা তোমারে ধরছি।
এনামুল কী চিন্তা করল তারপর বলল, ইগো বাড়ির মজজিদে মাইক আছে না?
আছে
আয়জান দিলে গেরামের বেবাকতে হোনে না?
হোনে।
নিয়ম আছে বলে এক মজজিদের আয়জান যতদূর পর্যন্ত হুনা যায় অতদূরের মইদ্যে আর কোনও মজজিদ করন যাইবো না?
কে কইছে তোমারে? আমি হুনছি।
বাজে কথা। ঢাকার টাউনে দেহো না এক মহল্লায় চাইর পাঁচখান কইরা মজজিদ। একলগে দশখান মজজিদের আয়জান হুনা যায়।
এইডার কারণ আছে।
কী কারণ?
ঢাকার টাউনে মানুষ বেশি। এক মহল্লায় যেই পরিমাণ মানুষ থাকে, একখান মজজিদে অত মানুষ নমজ পড়তে গেলে মজজিদে মানুষ আড়ে না। এর লেইগা মজজিদ বেশি। তারপরও জুমমার দিন কোনও কোনও মজজিদের সামনের রাস্তায়ও নমজ পড়তে খাড়ইয়া যায় মাইনষে।
এনামুলের কথা শুনে একটু যেন ফাপড়ে পড়লেন মান্নান মাওলানা। হাঁ করে এনামুলের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
এনামুল কী বুঝল কে জানে, বলল, ঠিক আছে আপনে যহন আইছেন আমার কাছে, মজজিদ করন ছোঁয়াবের কাম, কী রকম টেকা পয়সা লাগবো কন! চিন্তা কইরা দেখি।
মান্নান মাওলানার মুখ আবার উজ্জ্বল হল।
তখনই মোতালেব এসে ঢুকল এই ঘরে। এনামুলের দিকে তাকিয়ে খুবই ফুর্তির গলায় বলল, কুনসুম আইলা মামু?
মোতালেবকে পাত্তা দিল না এনামুল। অবজ্ঞার চোখে একবার তার দিকে তাকাল, তারপর খোলা দরজা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বলল, দোফরে আইছি।
অবজ্ঞাটা মোতালেব বুঝল, বুঝেও গায়ে লাগাল না। লম্বা বেঞ্চটায় বসল। হাসিমুখে বলল, কেমতে আইলা? লনচে?
এনামুল আগের মতোই অন্যদিকে তাকিয়ে বলল, না।
তয়?
গাড়ি লইয়াছি।
কোনতরি আইলা?
ছিন্নগর তরি।
গাড়ি ছিন্নগরে রাকছ?
না।
তয়?
গায়ে পড়ে এত কথা বলা মোতালেবের পছন্দ করছিল না এনামুল। তবু একটা লোক কথা জিজ্ঞাসা করলে সে কথার জবাব না দিয়ে তো পারে না। তার ওপর লোকটা যদি হয় খুব কাছের আত্মীয়।
বিরক্তি চেপে এনামুল বলল, গাড়ি ফিরত পাডাই দিছি।
কই?
কই আবার? ঢাকা।
বিরক্তির ভাব এবার পরিষ্কার ফুটল এনামুলের গলায়। মোতালেব পাত্তা দিল না। বলল, তোমারে নামাইয়া দিয়া গাড়ি ঢাকা গেছে গা?
হ।
তয় ছিন্নগর থিকা আইলা কেমতে হাইট্টা?
রিকশায় আইছি।
ও তাইলে তুমিঐ আইছো রিকশা কইরা? গেরামে প্রথম রিকশা আইলো তোমারে লইয়া? ভাল, ভাল।
তারপর যেন মান্নান মাওলানার হাতে চায়ের কাপ দেখতে পেল মোতালেব। দেখে রাবির দিকে তাকাল। ঐ রাবি, চা আছেনি?
তার ছেলের গায়ে হাত তুলেছে মোতালেব, ওই ঘটনার পর থেকে দুইচক্ষে মোতালেবকে দেখতে পারে না রাবি। দেখলেই মুখ আপনা আপনি বেঁকা হয়ে যায়। এই ঘরে মোতালেবকে ঢুকতে দেখেই হয়েছিল। এখন চায়ের কথা বলায় আরও হল। মুখ ঝামটা দিয়ে বলল, না।
এককাপ বানায় দে আমারে।
আমি অহন চা বানাইতে পারুম না। আমার কাম আছে।
হয়তো মোতালেবের কথা শুনে এনামুল নয়তো দেলোয়ারা, এমন কি মান্নান মাওলানাও রাবিকে বলতে পারেন, দে এককাপ চা বানাইয়া। এইসব মানুষের কথা রাবি না রেখে পারবে না। তারচেয়ে এখান থেকে সরে যাওয়াই ভাল। চোখের আড়ালে
থাকলে তাকে ডেকে মোতালেবের জন্য চা বানাতে কেউ বলবে না। মোতালেব এত দামী লোক না।
এসব ভেবে রাবি আর দাঁড়াল না, পিছন দিককার দুয়ার দিয়ে বেরিয়ে গেল।
মোতালেব তীক্ষ্ণচোখে রাবির চলে যাওয়া দেখল তারপর এনামুলের দিকে মন দিল।
এনামুল আর একবারও তাকায়নি মোতালেবের দিকে। সে তাকিয়ে আছে মান্নান মাওলানার দিকে। একহাতে গলার চেন নাড়াচাড়া করতাছে।
শব্দ করে চায়ে শেষ চুমুক দিলেন মান্নান মাওলানা। এই শব্দে বরাবরে মতো বিরক্ত হলেন দেলোয়ারা। নিজের অজান্তেই ভুরু কুঁচকে গেল তার। বিরক্তি কাটাবার জন্যই কিনা কে জানে, একফাঁকে চশমা খুলে শাড়ির আঁচলে মুছতে লাগলেন।
এনামুল বলল, তয় কোন জাগায় করতে কন মজজিদ।
কাপটা পায়ের কাছে নামিয়ে রাখলেন মান্নান মাওলানা। কথা বলতে যাবেন তার আগেই গভীর আগ্রহের গলায় মোতালেব বলল, কীয়ের মজজিদ?
এনামুল বিরক্ত হয়ে বলল, মজজিদ আবার কীয়ের অয়?
এনামুলের বিরক্তিটা বুঝলেন মান্নান মাওলানা। মোতালেবের দিকে তাকিয়ে বললেন, চুপ কইরা বহো মিয়া, বেশি পাচাইল পাইরো না। এনামুল সাবে কী কয় বইয়া বইয়া হোনো।
এনামুলকে সাহেব বলছেন মান্নান মাওলানা, শুনে খুবই খুশি হল এনামুল। মোতালেবের ওপরকার বিরক্তি কেটে গেল্ড। হাসিমুখে বলল, কন মাওলানা সাব কোনহানে করবেন মজজিদ?
