রাবি দাঁড়িয়ে আছে ভিতর দিককার দরজার সামনে। বাদলা তার কোলে। বোধহয় কোল থেকে একটু পিছলে পড়েছিল, আঁকি (ঝাঁকুনি) দিয়ে রাবি তাকে জায়গা মতন উঠাল। বলল, কুনসুম ঠাণ্ডা লাগলো হুজুর? আমি যহন আপনেরে সমবাত দিতে গেলাম তহনও তো দেকলাম ভাল!
চোখ তুলে রাবির দিকে তাকালেন মান্নান মাওলানা। তহন লাগে নাই। লাগলো এই বাইত্তে আইতে আইতে।
কন কী? কেমতে?
খেতখোলার মাঝখান দিয়ে হাইট্টা আইলাম তো! মনে অয় এর লেইগাই লাগছে। শীতের দিনে খোলা জাগায় বাইর অইলেঐ ঠাণ্ডা লাগে আমার।
দেলোয়ারা বললো, চা খাইবেননি?
মান্নান মাওলানার মুখ উজ্জ্বল হল। খাইতে পারি।
দুদচা না আদাচা?
এনামুল বলল, আদাচাঐ দিতে কন। ঠাণ্ডার মইদ্যে আদাচা খাইলে আরাম পাইবো।
মান্নান মাওলানা বললো, হ এইডা ঠিক কথা।
দেলোয়ারা এনামুলের মুখের দিকে তাকাল। তুমিও ইট্টু খাইবানি বাজান?
এনামুল বলল, না। চা আমি খাই না।
মান্নান মাওলানা বললেন, ক্যা?
চা খাইলে আমার শইল কইষ্যা (কষে) যায়।
তাইলে না খাওনঐ ভাল।
দেলোয়ারা বললেন, আদাচা খাইলে শইল আরও বেশি কষে।
তারপর রাবির দিকে তাকালেন তিনি। ঐ রাবি, মাওলানা সাবরে এককাপ আদাচা বানাইয়া দে।
দিতাছি।
বাদলাকে কোলে নিয়েই রান্নাঘরের দিকে চলে গেল রাবি।
এবার মান্নান মাওলানার দিকে তাকাল এনামুল। হঠাৎ আমারে দিয়া মজজিদ করাইতে চাইতাছেন ক্যান আপনে?
মান্নান মাওলানা একটু থতমত খেলেন। তবে পলকের জন্য। তারপরই নিজেকে সামলালেন। তুমি ছাড়া আমগো পাড়ায় আর টেকাআলা মানুষ কে আছে? কারে কমু?
যে সব লোকের টাকা আছে তাদের মধ্যে কাউকে কাউকে টাকাআলা বললে তারা খুশি হয়। এনামুল এই ধরনের লোক। মান্নান মাওলানার কথা শুনে ভিতরে ভিতরে খুবই খুশি হল সে। তবে মুখে তা প্রকাশ করল না। মুখটা হাসি হাসি করে বেশ একটা বিনয়ের ভাব ফোঁটাল। কী যে কন মাওলানা সাব! আমি আর কয় টেকার মালিক! আমারে কিনতে পারে এমন মানুষ ম্যালা আছে গেরামে।
গেরামে থাকতে পারে, আমগো পাড়ায় নাই।
আছে।
কেডা কও তো!
ধরেন রাজা মিয়া।
রাজা মিয়ার টেকা আছে জানি। তয় তোমার লাহান না।
আরেকজন তো আপনের বাইত্তেঐ আছে। ম্যালা টেকার মালিক।
কেডা, কার কথা কইতাছো?
মন্তাজ।
হ মন্তাজের টেকা আছে। তয় যাই কও, তোমার লাহান না।
দেলোয়ারা বললেন, আপনেরই বা কম টেকা আছেনি।
মান্নান মাওলানা আকাশ থেকে পড়লেন। আমার টেকা! আমি টেকা পামু কই?
আপনের ছোডপোলা থাকে জাপানে। বাড়ির একখান পোলা জাপানে থাকলে আর কিছু লাগেনি? মাসে সব বাদ দিয়া কমপক্ষে লাকটেকা পাড়ায়। বচ্ছরে বারোলাক। চাইর পাঁচ বচ্ছর ধইরা আছে। আপনের আর লাগে কী!
মান্নান মাওলানা আবার নাক টানলেন। তুমি যা কইলা এইডা পুরাপুরি সত্য না। মাসে লাটেকা আজাহারে পাড়ায় না। অনেক কম পাড়ায়। মাসে কামাই করে লাক দেড়েক এইডা আমি বুজি। বহুত চালাক পোলা আজাহারে। বাড়িতে অল্প টেকা পাড়ায়, বাকি নিজের কাছে রাখে। আমার এই পোলাডা অন্যপদের। সহাজে কেরে বিশ্বাস করে না।
হোনলাম জাপানে বলে কেঐ আর থাকতে পারবো না। ঐ দেশের সরকার বলে ধইরা ধইরা বেবাকতেরে দেশে পাড়াইয়া দিবো!
কথাটা শুনে চমকালেন মান্নান মাওলানা। কার কাছে হোনলা?
ফকির বাড়ির মালেকের বউয়ে কইলো। মালেকের এক পোলায় থাকে জাপানে।
হ, ইব্রাহিম। আজাহার ইব্রাহিম অরা একলগেই গেছিল। ইব্রাহিম পত্র লেকছেনি? পত্রে এই হগল কথা লেকছে?
হ। মালেকের বউয়ে তো কইল।
তাইলে কথা মিছা না।
মান্নান মাওলানা চিন্তিত চোখে খোলা দরজা দিয়ে বাইরে, আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
শীতের বিকাল দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে তখন। রোদ উঠে গেছে গাছপালার মাথায়। একটু পরেই আকাশ থেকে নামতে শুরু করবে কুয়াশা। চকমাঠ, গিরস্ত বাড়ির উঠান পালান ভরে যাবে কুয়াশায়। কুয়াশার উপর কুয়াশার মতো জমবে অন্ধকার। শন শন করে বইবে উত্তরের হাওয়া। পাটাপুতার মতো ভারী একখান রাত নামবে।
মান্নান মাওলানাকে চিন্তিত দেখে এনামুল গলা খাঁকারি দিল। আপনে এত চিন্তায় পড়লেন ক্যা মাওলানা সাব?
মান্নান মাওলানা মুখ ঘুরিয়ে এনামুলের দিকে তাকালো। চিন্তার কথা। আজাহাররে যুদি জাপান থিকা খেদাইয়া দেয় তাইলে বিপদে পইড়া যামু।
কীয়ের বিপদ?
এতবড় সংসার। বড় পোলার বিধবা বউ পোলাপান, আমি, আতাহার, আতাহারের মায়। এতডি মাইনষের সংসার চলবো কেমতে?
সংসার কি আজাহারের টেকায় চলেনি?
তয়!
ক্যা বিলে আপনের এত খেতখোলা, এত ইরি পান, এতডি গরু। আজাহারের টেকা না পাইলে কী! অভাব আছেনি আপনের!
মান্নান মাওলানা হাসলেন।
দেলোয়ারা বললেন, মাওলানা সাবে খালি গলা হুগায়।
এনামুল বলল, বাদ দেন এই হগল কথা। কামের কথা কন।
তখনই বড় একটা কাপে চা এনে মান্নান মাওলানার হাতে দিল রাবি।
দেলোয়ারা বললেন, বাদলা কো?
রাবি লাজুক গলায় বলল, রান্দনঘরে।
কী করে?
বাডিতে ইট্টু চা দিছি। ফুয়াইয়া ফুয়াইয়া খাইতাছে।
দেলোয়ারা একটু রাগলেন। এতটু পোলার চা খাওনের অব্বাস করিচ না।
রাবি কথা বলল না।
চায়ে চুমুক দিয়ে মান্নান মাওলানা বললেন, রাজা মিয়ার টেকা আছে, মন্তাজের টেকা আছে আমি জানি। তাগো দুইজনরে ধরলে দুইজনে টেকা দিয়া, দুইজনে মিল্লা মজজিদ একখান বানাইয়া দিবো। তাগো আমি ধরতে চাই না।
