আশ্চর্য ব্যাপার, রুস্তমের গলা দিয়ে শব্দ বের হল না। কথা বলতে গিয়েও রুস্তম দেখে কথা সে বলতে পারছে না। গলা বন্ধ হয়ে গেছে। বুকের ভিতর ফুরিয়ে আসছে দম। চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। জিবলাটাও থাকতে চাইছে না মুখের ভিতর, নিজের অজান্তেই অনেকখানি বের হয়ে আসছে। থুতনি ছাড়িয়ে নেমে গেছে। গামছার ফাঁস কঠিন থেকে কঠিন হয়ে আটকে গেছে গলায়।
রুস্তম তার তাগড়া জোয়ান শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে দুইহাতে টেনে ছাড়াতে চাইল গামছার ফাস। কোরবানী দেওয়া গরুর মতো দাপড়া দাপড়ি করতে লাগল। বিন্দুমাত্র আলগা করতে পারল না। কোরানী দেওয়ার সময় গরুর সর্বাঙ্গ যেমন চেপে ধরে আট দশজন তাগড়া জোয়ান পুরুষ, যতই দাপড়া দাপড়ি করুক লোকগুলিকে যেমন গা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিতে পারে না গরু, তছিকেও তেমন ঝেড়ে ফেলতে পারছে না রুস্তম। তছি যেন এখন আর কোনও নরম কোমল, ঢলঢল যৌবনের যুবতী মেয়ে না। তছি যেন এখন কোনও অবলা নারী না। তছি যেন এখন একাই আট দশজন তাগড়া জোয়ান পুরুষ। রুস্তম নামের গরুটাকে মাটিতে ফেলে জবাই করতাছে। রুস্তমের গলায় গিট দিয়ে ধরা গামছা যেন ঝকঝকা ধারের গরু জবাই করার বিশাল ছুরি। সেই ছুরি দিয়ে পুচিয়ে পুচিয়ে রুস্তমকে যেন সে জবাই করতাছে।
রুস্তমের ধ্বস্তাধ্বস্তি আর তছির রাগ ক্রোধের হিসহিস শব্দে বনফুলের মাথার ওপর ওড়াউড়ি করতে থাকা প্রজাপতিগুলি ভয় পেয়ে অন্যদিকে উড়াল দিয়েছে। মধু খেতে আসা মৌমাছিরা বন্ধ করেছে গুনগুন শব্দ, পালাবার পথ খুঁজছে। আমগাছের আগডালে বসা রাজঘুঘুটা আচমকাই স্তব্ধ হয়েছে। গাবগাছের গোড়লের কাছে স্থির হয়ে থাকা আরজিনাটা লুকাতে ব্যস্ত হয়েছে অন্ধকার খোড়লে। বনফুলের গন্ধে মাতায়োরা হাওয়া হয়েছে আরও ধীর। দূর থেকে ভেসে আসা কোকিলের ডাক আর শোনা যায় না।
কতক্ষণ, কতক্ষণ এভাবে চলেছে কে জানে। হঠাৎ করেই যেন নিজের মধ্যে ফিরে এল তছি পাগলনি। একে একে সব মনে পড়ল তার। মুরলিভাজার ঠোঙাটা পড়ে আছে রুস্তমের পায়ের কাছে। ধ্বস্তাধ্বস্তির ফলে যে কয়টা মুরলি তখনও ছিল ঠোঙায় সেগুলি ছড়িয়ে পড়েছে এদিক ওদিক। গামছার ফাস তখনও শক্ত হাতে টেনে রেখেছে তছি। রুস্তমের কোনও সাড়া নাই। একবোরেই স্থির হয়ে আছে সে। ধ্বস্তাধ্বস্তি দূরের কথা, হাত পা ছোঁড়া দূরের কথা, লড়াচড়াও নাই তার। কুকরার আন্ডার মতন চোখ দুইটা বেরিয়ে, ভুরুর তলায়, নাকের বাঁকের কাছে এসে ঠেকে আছে। হাঁ করা মুখ থেকে জিভ বেরিয়েছে বিঘতখানেক। থুতনির তলায় বরকির দাঁড়ির মতো ঝুলছে। এসব দেখেও ক্রোধ যেন কমল না তছির। গামছার ফাসে হ্যাঁচকা একটা টান দিল, দিয়েই ছেড়ে দিল। নুনের বস্তার মতো একদিকে কাত হয়ে পড়ল রুস্তম।
তছির বুক তখন হাপরের মতন ওঠানামা করতাছে। ফোঁস ফোঁস ফোঁস ফোঁস করে শ্বাস পড়ছে। গভীর ক্লান্তিতে ভেঙে আসতে চাইছে শরীর। ইচ্ছা করে রুস্তমের পাশে সেও লুটিয়ে পড়ে থাকে।
তছি তা করে না। ক্রোধ এখন অচেনা এক দুঃখে রূপ নিয়েছে। গভীর কষ্টের এক কান্নায় বুক ফেটে যেতে চাইছে, চোখ জ্বালা করতাছে। তবু শেষ ক্রোধটা রুস্তমের ওপর মিটাল সে। ডান পা তুলে প্রচণ্ড একখান লাথি মারল রুস্তমের মুখ বরাবর। দাঁতে দাঁত চেপে বলল, মিটছে না, মনের খায়েশ মিটছে না তর?
তছির লাথথি খেয়ে রুস্তমের দেহ তখন গাছের গুঁড়ির মতো গড়িয়ে যাচ্ছে ভাঙনের দিকে। দেখতে দেখতে ঝপ করে গিয়ে পড়ল খালের পানিতে। সেই শব্দে কী হল তছির, বুকের কান্না, চোখের কান্না আর ধরে রাখতে পারল না সে। মুখে আঁচল চেপে গুঙিয়ে গুঙিয়ে কাঁদতে লাগল। কাঁদতে কাঁদতে বনফুলের ঝোপের আড়াল থেকে বেরুল। বেরিয়ে পাগলের মতো সড়ক বরাবর ছুটতে লাগল।
.
১.৫৫
গলার চেন হাতাতে হাতাতে এনামুল বলল, বলেন মাওলানা সাব, খবর কী?
মান্নান মাওলানা বসে আছেন হাতলআলা ভারী চেয়ারে। বিকাল হতে না হতেই শীতের কাপড় পরে বাড়ি থেকে বেরিয়েছেন। খয়েরি রঙের ফ্লানেলের পানজাবি। পানজাবির উপর নীল রঙের হাফহাতা সোয়েটার। গলায় জড়ান হলুদ রঙের মাফলার। পায়ে উলের সাদা মোজা আর খয়েরি রঙের পাম্পসু। এমনিতেই পেট মোটা মানুষ তার ওপর পরেছেন এতগুলি কাপড়, মান্নান মাওলানাকে দেখাচ্ছিল গাবগাছের গুঁড়ির মতন। তার ওপর কাপড় একেকটা একেক রঙের। কাপড়ের কারণে তাকে মনে হচ্ছিল সার্কাসের জোকার। বসে আছেন ঘরের ভিতর, দেলোয়ারদের বড়ঘরের উত্তর দিককার কামরায়, তবু যেন শীতে কাতর।
এনামুলের কথা শুনে একবার নাক টানলেন মান্নান মাওলানা আছে, খবর আছে। আমার পত্র পাও নাই তুমি?
হ পাইছি।
পত্রে তো খবর আমি কিছু লেকছিলাম।
হ লেকছেন। তয় তেমুন খোলসা কইরা কিছু লেকেন নাই। বাড়িতে আসনের পর আম্মায় আমারে কইছে।
কী কইছে?
আমারে দিয়া গেরামে একখান মজজিদ করাইতে চান।
মান্নান মাওলানা আবার নাক টানলেন।
এনামুলের পাশাপাশি চৌকিতে পা ঝুলিয়ে বসে আছেন দেলোয়ারা। খানিক আগে চোখ থেকে চশমা খুলে মুছে নিয়েছেন। মন দিয়ে এনামুল আর মান্নান মাওলানার কথা শুনছিলেন। মান্নান মাওলানাকে পরপর দুইবার নাক টানতে দেখে বললেন, ঠাণ্ডা লাগছেনি মাওলানা সাব?
হ বইন। ভাল ঠাণ্ডা লাগছে। আমার ইট্টু ঠাণ্ডার বাই আছে। শীতের দিনে ঘন ঘন লাগে।
