তছির মুখভর্তি মুরলি। তবু রুস্তম এসে পাশে বসার পর আরেক মুঠ মুরলি মুখে দিল। যেন যত দ্রুত সম্ভব খেয়ে শেষ করতে হবে এক ঠোঙা মুরলি। নয়তো রুস্তম যদি ভাগ বসায়।
মুরলি মুখেই তছি বলল, খুব ভাল।
কথাটা একেবারেই জড়িয়ে গেল তার। কিছুই বোঝা গেল না। অবশ্য তছির কথা বোঝ না বোঝায় রুস্তমের কিছু আসে যায় না। সে কি আর মুরলির চিন্তায় আছে। সে আছে অন্য চিন্তায়, অন্য উত্তেজনায়। তবু কোনও একটা কথা দিয়ে শুরু করতে হয় বলে কথাটা সে বলেছে।
রুস্তম যতটা নিচু গলায় কথা বলছে তছি যেন বলছে ততটাই উঁচু গলায়। মুখে মুরলিভাজা ছিল বলে কথা বোঝা যায়নি, শব্দটা বোঝা গেছে। সেই শব্দে চমকেছে রুস্তম। চঞ্চল চোখে চারদিক তাকিয়েছে। তারপর নিজের শরীর তছির পিঠে ঠেকিয়ে ফিসফিস করে বলেছে, আস্তে কথা কও, আস্তে।
মুরলি চাবাতে চাবাতে তছি নির্বিকার গলায় বলল, ক্যা?
কেঐ হুনবো।
হুনলে কী হইছে?
তছির পিঠের উপর দিকে নিজের মুখ একটুখানি ঘষে দিয়ে রুস্তম বলল, হুনলে মন্দ কইবো?
ক্যা আমরা কী মন্দ কথা কইছি?
না।
তয়?
এমুন নিটাল জাগায় আমরা দুইজন মানুষ বইয়া রইছি দেকলে মাইনষে মনে করব অন্যকাম করতাছি।
কী কাম?
তুমি বোজ না?
না।
সত্যঐ বোজ না?
তয় কী মিছা? আমি আপনের লগে মিছাকথা কই?
না মিছাকথা কইবা ক্যা! বোজবা, আস্তে আস্তে বোজবা। বহো। মুরলিভাজা খাও। তয় আওজ কইরো না।
বলে মুখখানা গভীর আবেগে তছির পিঠের উপর দিকে, আগের জায়গায় ঘষতে লাগল রুস্তম। আর দুইহাতে হাতাতে লাগল তার দুইবাহু। প্রথম প্রথম ব্যাপারটা পাত্তা দিল না তছি। তারপরই ছটফট করে উঠল। উঁহুহু, এমুন কইরেন না রিশকাআলা ভাই।
আমার জানি কেমুন লাগে!
রুস্তম গুঙিয়ে গুঙিয়ে বলল, কেমুন লাগে?
শইল্লের পশম খাড়ইয়া যায়। ক্যাতকুতি (সুরসুরি) লাগে। উঁহু উঁহু। এমুন করতাছেন ক্যা আপনে? কী অইলো আপনের, এমুন করতাছেন ক্যা?
বোজ না ক্যান এমুন করি! বোজ না তুমি?
না বুজি না। আপনে আমার কাছ থিকা সরেন, সইরা বহেন। এমুন কইরেন না। মুরলিভাজা খাইতে দেন আমারে।
তছির কথা গ্রাহ্য করল না রুস্তম। তছির কাঁধে, পিঠে মুখ ঘষতে ঘষতে, তছির বাহুতে হাত বুলাতে বুলাতে, আকাতলির (বগল) দিকে হাত দিয়ে বেশ যত্নে, বেশ কায়দায় তার গা থেকে সরাতে লাগল কাপড়। শ্বাস প্রশ্বাস হঠাৎ জ্বর আসা রোগির মতন গরম। মুখে মৃদু গোঙানীর শব্দ। বুকের ভিতর অদ্ভুত উত্তেজনা। তলপেট ফেটে যেতে চাইছে যন্ত্রণায়। পিছন থেকে আস্তে ধীরে নিজের দুটি হাত তছির বুকের দিকে এগিয়ে দিল রুস্তম।
তখনই যা বোঝার বুঝে গেল তছি। ঠোঙায় তখনও রয়ে গেছে কিছু মুরলিভাজা। সেদিকে আর খেয়াল রইল না তার। সাপের ছোবল এড়াতে যেমন করে লাফিয়ে ওঠে সাবধানী পাখি ঠিক তেমন করে লাফ দিয়ে উঠল সে। দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিস করে বলল, বুজছি। তোমার মতলব আমি বুজছি। তুমি তো মানুষ ভাল না! তুমি তো বদ! মুরলি খাওনের লোভ দেহাইয়া এর লেইগা ছাড়াবাইত্তে লইয়াছো আমারে
হিংস্র হাতে থাবা দিয়ে রুস্তমের গলার গামছাটা ধরল তছি। ধরে চোখের পলকে গিটঠু দিয়ে ফেলল। দুইহাতে দুইদিকে টেনে ধরল গামছার দুইমাথা। আগের মতোই দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিস করে বলল, কীরে খানকি মাগির পোলা, কীরে ছিলানী মাগির পোলা, মা বইন নাই তর? এই হগল করতে অয় তর মার লগে কর, তর বইনের লগে কর। আমার লগে ক্যা?
রুস্তম এতটা কল্পনাও করেনি। প্রথমে সে হতভম্ব হল, তারপর গেল ভয় পেয়ে। শরীরের উত্তেজনা কোথায় উধাও হল! শুধু মনে হল যে রকম হিংস্র গলায় কথা বলছে তছি, শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে গলায় ফাঁস দিয়েছে গামছা, অবস্থাটা এরকম থাকবে না। এভাবে তাকে ধরে রেখে এখনই চিৎকার শুরু করবে সে। তোমরা কে কোনওহানে আছো, আউগগাও। রোস্তম রিশকাআলা আমার ইজ্জত নষ্ট করতে চায়। আর তছির সেই চিৎকার শুনে সড়ক পথে চলতে থাকা পথিকরা একজন দুইজন করে একত্রিত হবে। দল বেঁধে এগিয়ে আসবে ছাড়াবাড়ির বনফুলের ঝোপটার কাছে। তছির হাত থেকে ছাড়িয়ে নিবে রুস্তমকে। তারপর শুরু করবে মাইর। একেকজন একেক ভাষায় বকাবাজি করবে আর মারবে। কেউ কোকসা বরাবর লাথথির পর লাথি মারবে, কেউ মারবে নাকে মুখে ঘুষি। সেইসব ঘুষির কোনওটায় খাড়া হয়ে থাকা নাক যাবে চ্যাপটা হয়ে, দাঁতগুলি কদুবিচির মতন ছিটকে ছিটকে পড়বে এদিক ওদিক, জিভের অর্ধেকটা কেটে বউন্না গাছের বাকলার মতন খসে পড়বে। কারও কারও কিল ঘুষিতে ঠোঁট হবে ফালা ফালা, চোখের মণি গলে ভাঙা ডিমের মতন বেরিয়ে আসবে। কেউ হয়তো অতিরিক্ত ক্রোধে ভেঙে নেবে শক্ত কোনও গাছের ডাল। সেই ডাল দিয়ে বেছে বেছে বাড়ি মারবে হাত পায়ের জোড়ায়। জোড়াগুলি ভেঙে দিবে। অতিরিক্ত নৃশংস কোনও মানুষ হয়তো দুইখান থানইট জোগাড় করে আনবে। যে কর্মের উদ্দেশ্যে তছিকে সে এখানে নিয়ে এসেছে সেই কর্ম সমাধার অঙ্গ একটা থানইটের ওপর রেখে অন্য থানইট দিয়ে গিরস্ত বাড়ির বউঝিরা যেভাবে টাকিমাছ ভর্তা করে সেইভাবে ভর্তা করবে। গুহ্যদ্বার দিয়ে হাতের লাঠিও প্রবেশ করিয়ে দিতে পারে কেউ।
এরপর রুস্তম আর কিছু ভাবতে পারল না। দুইহাত মাফ চাওয়ার ভঙ্গিতে একত্র করে দিশাহারা গলায় তছিকে বুঝ দেওয়া, চেষ্টা করতে গেল। আমার ভুল অইয়া গেছে। মস্ত বড় ভুল হইয়া গেছে। তছি, ইন গো, বইন, তুমি আমারে মাপ কইরা দেও বইন। এমন ভুল জিন্দেগিতে আর করুম না। বইন কইলাম, তোমারে আমি বইন কইলাম, তুমি আমারে মাপ কইরা দেও। চিকইর দিও না বইন, মানুষজন ডাক দিও না। মানুষ ডাক দিলে আমার আর বাচন নাই। আমারে তারা মাইরা হালাইবো। বইন না, দরকার অইলে তোমারে আমি মা ডাকতাছি। মা, তছি মা, তুমি আমারে মাপ কইরা দেও মা।
