আপনে একখান মজজিদ বানাইবেন।
মান্নান মাওলানা চমকে উঠলেন। তুই জানলি কেমতো
বাদলা না এবার কথা বলল রাবি। ভাত খাইতে বইয়া দেলরা বুজির লগে এই হগল প্যাচাইল পারতাছিল এনামুল মামায়। ও হোনছে।
মান্নান মাওলানা অতি উৎসাহের গলায় বললেন, তুই সামনে আছিলি না? কী প্যাচাইল পারছে আমারে ইট্টু ক তো।
ঐত্তো আপনে পত্র লেকছেন, মজজিদ বানাইতে চান এই হগল। এনামুল মামায় এর লেইগাঐ আপনেরে খবর দিছে।
মান্নান মাওলানার চোখ তখন কী এক আশায় চকচক করতাছে। খানিক আনমনা হয়ে কী ভাবলেন তিনি তারপর রাবির দিকে তাকিয়ে বললেন, ঠিক আছে তুই যা। আমি বিয়ালে আমুনে।
.
১.৫৪
সড়কের পাশে একটা ছাড়াবাড়ি। দুপুরের পর পর নিঝুম হয়ে আছে বাড়িটা। গাছপালা আর ঝোপঝাড়ের ছায়ায় বেশ একটা শীত শীত ভাব। ডালপালার ফাঁক ফোকর দিয়ে টুকরা টাকরা রোদ ছড়িয়ে পড়েছে গাছের তলায়, ঝোপঝাড়ের মাথায়। সেই রোদে শীত ভাব কমেনি। একটা ঝোপে অচেনা কিছু ফুল ফুটে আছে। বেশ ঝাঁঝাল গন্ধ। সেই গন্ধে বিভোর হয়ে আছে বাড়ি। কয়েকটা প্রজাপতি মাতাল হয়ে উড়ছে। জামগাছটার মগডালে বসে থেকে থেকে ডাকছে একটা ঘুঘু। ঘুঘুর ডাকে নিঝুম ভাব তো কাটেইনি আরও বেড়ে গেছে।
রিকশা নিয়ে এই বাড়িটার সামনে চলে এল রুস্তম। খানিক আগে কোলাপাড়া বাজার থেকে মুরলিভাজা কিনেছে। কিনে ঠোঙাটা দিয়েছে তছির হাতে। যেন হাতে চাঁদ পেয়েছে এমন ভঙ্গিতে মুরলির ঠোঙা তছি বুকে চেপে ধরেছে। আনন্দ আহল্লাদে বিগলিত হয়ে বলেছে, অহনঐ খামু রিশকাআলা ভাই?
রুস্তম হেসেছে। না ইট্টু পরে খাও।
ক্যা?
রাস্তাঘাডে খাওন ভাল না।
তয় কই গিয়া খামু?
লও অন্য একখান জাগায় যাই। ওহেনে গিয়া নিরালায় বইয়া দুইজনে মিল্লা সুখ দুর্কের কথা কমুনে আর মুরলিভাজা খামুনে।
বাইত্তে যাইতে তাইলে দেরি অইয়া যাইবো না আমার?
না, কীয়ের দেরি অইবো? রিশকা কইরা আমি তোমারে দিয়ামু না? এহেন থিকা রিশকা ছাড়ুম, চোঙ্কের নিমিষে তোমগো গেরামে যামু গা।
তয় লন।
রুস্তম তারপর রিকশায় চড়েছে। হাওয়ার বেগে রিকশা চালিয়ে এসেছে ছাড়াবাড়িটার সামনে।
তছির তখন আর মন মানছে না, মন চলে গেছে আঁচলের তলায়। কতক্ষণে আঁচল তুলবে সে, মুরলির ঠোঙায় হাত দিবে। মনে মনে ততক্ষণে আরেকটা পরিকল্পনাও করে ফেলেছে সে। এখনকার মুরলিটা রুস্তমই খাওয়াচ্ছে, ওইদিকে এনামুল দাদার দেওয়া টাকা দশটা পুরা রয়ে গেল। এটা একটা বিরাট লাভ। কাল থেকে রোজ সকালে সীতারামপুরের খালের ঘাটে যাবে সে। ওখানকার মুদি দোকান থেকে এক টাকার করে মুরলিভাজা কিনে খাবে। এক টাকার করে রোজ খেলে দশ টাকায় দশদিন। একটানা দশদিন খেলে মুরলিভাজা খাওয়ার লোভটা কমবে।
এসব চিন্তা ছিল বলে কোথায় এসে রিকশা থামাল রুস্তম তছি খেয়াল করল না।
রুস্তম তখল চঞ্চল চোখে চারদিক তাকাচ্ছে। তাকিয়ে নিচু গলায় বলল, নামো।
তছি লাফ দিয়ে রিকশা থেকে নামল। আঁচলে প্যাচিয়ে দুইহাতে যক্ষের ধনের। মতো ধরে রেখেছে মুরলির ঠোঙা। কোনওদিকে খেয়াল নাই তার।
রুস্তম বলল, ঐ যে ফুলের ঝাড়টা দেকতাছো ঐডার আঐলে গিয়া বহো। আমি আইতাছি।
তছি কোনওদিকে তাকাল না, কিছু খেয়াল করল না, ভর পেট মুরলিভাজা খাওয়ার আনন্দ উত্তেজনায় বনফুলের ঝোপটার দিকে ছুটে গেল। ঝোপের আড়ালে বসেই আঁচলের তলা থেকে মুরলিভাজার ঠোঙা বের করল। কোনওদিকে তাকাল না, হামহাম করে খেতে লাগল। কোথায় বসে আছে সে, কেমন করে এখানে এল, কখন বাড়ি ফিরবে কোনও কিছুই মনে রইল না। এমন কী রুস্তমের কথাও। অচেনা মানুষটা যে মেদিনীমণ্ডল গ্রাম থেকে এতটা দূরে নিয়ে এসেছে তাকে, তছির দশ টাকার নোটখান ভাঙাতে দেয়নি, নিজের তফিলের (তহবিল) পয়সা খরচা করে কোলাপাড়া বাজার থেকে মুরলিভাজা কিনে দিয়েছে তাকে, এরকম নির্জন ছাড়াবাড়িতে নিয়ে এসেছে এসব এখন একেবারেই ভুলে গেছে তছি। তার মন ঢুকে গেছে মুরলির ঠোঙায়, মন পড়ে আছে মুরলি খাওয়ায়।
শীতকালের দুপুরে তখন লেগেছিল আশ্চর্য সমাহিত ভাব। গাছপালার আড়াল সরিয়ে গাঁদাফুলের পাপড়ির মতন রোদের টুকরা এসে পড়েছিল ছাড়াবাড়ির এখানে ওখানে। বনফুলের ঝোপের কাছটা তীব্র গন্ধে মাতোয়ারা। তছির মাথার ওপর, বনফুলের গা ঘেঁষে ওড়াউড়ি করতাছে কয়েকটা প্রজাপতি। ফুলের মধু খেতে এসেছে অজস্র মৌমাছি। মধু খেতে খেতে গুনগুন গুনগুন করে শব্দ করতাছে। তুলতুলে হাওয়া। মন্থর হয়ে আছে শীত আর ফুলের গন্ধে। জামগাছের মগডালে বসে ঘুঘুর ঘুঘ, ঘুঘুর ঘুগ শব্দে ডাকছে একটা রাজঘুঘু। গাবগাছটার অন্ধকার খোড়লে স্থির হয়ে আছে একটা আরজিনা (গিরিগিটি)। বনফুলের ঝোপ ছাড়িয়ে ভাঙনের দিকে খাল। খালের শীতল কোমল পানিতে শ্বাস ফেলতে উঠেছিল পানির তলার মাছ। আর দূরের কোনও নির্জন গ্রাম প্রান্তরের একাকী বৃক্ষের ছায়ায় বসে প্রাণখুলে ডাকছিল এক কোকিল। শীতকালেই বসন্তের ডাক ডাকতে শুরু করেছে। আশ্চর্য ব্যাপার, মুরলিভাজা খেতে খেতে কোকিলের ডাকটা পরিষ্কার শুনতে পেল তছি। কেন যে সে একটু আনমনা হল! কেন যে সে একটু কান খাড়া করল!
তখনই রুস্তম এসে বসল তার পাশে।
মাজার গামছা খুলে মাফলারের মতো গলায় প্যাঁচিয়েছে। চোখ মুখে কী রকম উত্তেজনা। আচরণে মাছের মতো চাঞ্চল্য। পাশে বসেই তছির খোলা কাঁধে হাত রাখল। জড়ান গলায় আস্তে করে করে বলল, মুরলিভাজা খাইতে কেমুন লাগে?
