ফিরোজার মুখের দিকে তাকিয়ে পান চাবাতে চাবাতে মান্নান মাওলানা বললেন, মন্তার সমবাত কী লো?
ফিরোজা চোখ তুলে তাকাল না, কথার জবাবও দিল না।
তিনি প্রশ্ন করেছেন অথচ সামনে দাঁড়ান মানুষ জবাব দিচ্ছে না এটা হতে পারে। এটা বরদাশত করবার মানুষ মান্নান মাওলানা নন। প্রথমেই প্রচণ্ড একখান ধমক দিবেন, তারপরও কথার জবাব না পেলে কোনওদিকে তাকাবেন না, কোনও কিছু খেয়াল করবেন না, গায়ে হাত তুলবেন।
তবে এখন তেমন কোনও অনুভূতি হল না মান্নান মাওলানার। একদমই রাগলেন তিনি। মুখখানা হাসি হাসি করে নরম গলায় বললেন, তুই আমারে এত ডরাচ ক্যা লো ছেমড়ি? আমি কি বাঘ ভাল্লুক যে তরে খাইয়া হালামু, নাকি তর লগে কোনওদিন রাগ করছি, তরে ধমক দিছি!
এবার পলকের জন্য মান্নান মাওলানার দিকে চোখ তুলে তাকাল ফিরোজা। তারপরই আগের মতো মাথা নিচু করল, কিন্তু কথা বলল না।
মান্নান মাওলানা বললেন, মন্তার সমবাত বেবাকঐ আমি জানি। দুই বউ লইয়া মোজে (মৌজে) আছে। এক রাইত এই বউর কাছে আরেক রাইত ঐ বউর কাছে। মাইনষে যা কউক আমি মনে করি কামডা মন্তা খারাপ করে নাই। ভাল করতাছে। মোসলমানের চাইরখান পইরযন্ত বিয়া জায়েজ।
বলেই চোখ মুখের অশ্লীল ভঙ্গি করলেন মান্নান মাওলানা। খিক করে একটু হাসলেন। জুয়ান মর্দ পুরুষ পোলাগো তিন চাইর বউ না অইলে কাম অয় না। একখান বউ থাকলে দুই তিনডা পোলাপান অওনের পর হেইডা যায় ভিজা কেথার লাহান লোতলোতা হইয়া। হেইডারে আর বউ মনে অয় না। তহন আরেকখান বিয়া করুন লাগে। দুইনম্বরডা যহন দুই তিনডা পোলাপান পয়দা কইরা আগেরডার লাহান অইয়া যায় তহন করতে হয় তিন নম্বরটা। এইভাবে চাইরখান জায়েজ।
আবার খি খি করে হাসলেন মান্নান মাওলানা। হোন ছেমড়ি, তুই তো ডাঙ্গর অইছস, দুইদিন বাদে বিয়া দিলে বচ্ছরও ঘোরতে দিবি না, পোলাপান পয়দা কইরা হালাবি, আমার কথা হুইন্না রাখ, কামে লাগবো। পুরুষ পোলাগো জুয়ানকি থাকে সইত্তর আশি বচ্ছর আর মাইয়া ছেইলাগ কুড়ি বহর। ডাকের কথা আছে, মাইয়া ছেইলারা কুড়িতে বুড়ি। আতাহারের মারে দেহচ না একদোম বুড়ি অইয়া গেছে। আর আমারে দেখ। অহনতরি কী জুয়ান! তর লাহান ছেমড়ির লগে বিয়া হইলে বচ্ছর বাদে পোলা অইবো।
মান্নান মাওলানার কথা শুনতে শুনতে ফিরোজার মনে হচ্ছিল সে যেন আর বেঁচে নাই, সে যেন মরে গেছে। এই ধরনের কথা সে জীবনেও শোনেনি, তাও বাপ দাদার বয়সী কোনও পুরুষ মানুষের কাছে। নাতনীর বয়সী মেয়েকে কেমন করে এসব কথা বলতে পারে একজন মানুষ! তাও যে মানুষ মাওলানা। পরহেজগার লোক।
মান্নান মাওলানা বললেন, হোন ছেমড়ি, তরে এই হগল কথা কওনের কারণ আছে। মাসে মাসে দোকানের কর্মচারি দিয়া মন্তার মারে টেকা পাডায় মন্তা। হেই বেডা দুই তিনদিন বাইত থাইক্কা বাজার হাট কইরা দিয়া যায়। মন্তার মায় বুড়ি তো আর দুইন্নাইদারি বোজে না অহন, বোজচ তুই। বেডা যে আহে, দুই তিনদিন যে থাকে বাইত্তে, তরা বলে একঘরে হোচ?
শেষ কথাটা এমনভাবে বললেন মান্নান মাওলান, ফিরোজা চমকে উঠল। নিজের অজান্তেই কথা বলে ফেলল। কে কইছে আপনেরে
আমি হুনছি।
কার কাছে হোনছেন?
হেইডা তরে কমু ক্যা? বাইত্তে কী কম মানুষ আছে! তিন শরিকের অউক আর যারঐ অউক বাড়ি তো আসলে আমার। এই বাড়ির কোনহানে কী হয় বেবাক আমি জানি।
তয় এইডা ঠিক জানেন না। যেই বেডারে মন্তাজ মামায় পাড়ায় হেই বেডার নাম মালেক। আমার বাপের বইশশা। আমি তারে মামা কই।
মান্নান মাওলানা আবার হাসলেন। বয়সের কথা কইচ না। এতক্ষুণ তো তরে আমি ঐ হগল বুজাইলাম।
তয় মালেক মামায় বড়ঘরে থাকে না। ঐ ঘরে থাকি আমি আর নানী। মামায় থাকে পুবের ঘরে।
চিরিক করে পানের পিক ফেললেন মান্নান মাওলানা। মুখখানা অমায়িক করে ফিরোজার দিকে তাকালেন। ঠিক আছে যা, তর কথা আমি বিশ্বাস করলাম।
তারপর একটু এগিয়ে গিয়ে ফিরোজা কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার কাঁধে হাত দিলেন, দিয়ে খামচে ধরলেন। যেন ইচ্ছা করলেই হাতটা সরিয়ে দিতে না পারে ফিরোজা, দৌড় দিয়ে পালাতে না পারে।
মান্নান মাওলানা তারপর বললেন, তরে আমি বহুত ভাল জানি ফিরি। কেন জানি কইতে পারি না। তুই এই বাইত্তে আহনের পর থিকা, তর মুখখানা দেকলে আমার মায়া লাগে। মালেকরে লইয়া তর কথা আমি অনেকদিন আগেই হুনছি, তরে কিছু কই নাই এর লেইগাঐ। তুই অনাত এতিম মাইয়া। আমি পারি মালেকের লগে একখান বদলাম রটাইয়া তরে এই বাইত থিকা খেদাইয়া দিতে। দেই নাই। দিমুও না। ঐ যে তরে আমি ভাল জানি এর লেইগা। হোন, আজাইর পাইলে আমি তগ ঘরে যামু। তুই আমারে ইট্টু সেবা যত্ন করিস।
মান্নান মাওলানা তার কাঁধ খামছে ধরার পর থেকে ফিরোজা যেন আর ফিরোজা নাই, সে যেন মাটি হয়ে গেছে, মরা গাছ হয়ে গেছে। তার কোনও অনুভূতি নাই, জীবন মরণ বোধ নাই। ফ্যাল ফ্যাল করে মান্নান মাওলানার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল সে।
এ সময় বাদলার পিছু পিছু মান্নান মাওলানার বাড়িতে এসে উঠল রাবি।
দুইজন মানুষ যে বাড়িতে এসে উঠেছে মান্নান মাওলানা তা টেরই পেলেন না। ফিরোজার কাঁধ খামছে ধরে মুখে ওসব কথা তিনি বলছিলেন ঠিকই কিন্তু ভিতরে ভিতরে মশগুল হয়ে গিয়েছিলেন অন্য একটা ব্যাপারে। মুখের পান মুখে আছে, চাবানের কথা মনে নাই। শরীর ভরে গেছে অদ্ভুত এক পুলকে। মৃতের মতো অনুভূতিহীন চোখে ফিরোজা তাকিয়ে ছিল তার দিকে। সেই চোখে চোখ রেখে গদগদ কণ্ঠে গভীর কোনও আবেগের কথা বলতে যাবেন মান্নান মাওলানা তার আগেই লোকজন দেখে বাদলা তার স্বভাব মতন কাজটা করল। রাবির দিকে দুইহাত বাড়িয়ে বলল, কুলে লও মা।
