ব্যাপারটা ভালমত বুঝে নেয়ার জন্যে ড্রাইভারের কাঁধে দুটো টোকা দিল। রানা।
এখানে থামো একটু, সিগারেট কিনব। ট্যাক্সি থেমে দাঁড়াতেই নেমে পড়ল রানা। দেখল, পেছনের ট্যাক্সিটাও থেমে দাঁড়িয়েছে। কেউ উঠল না, কেউ নামল না–যেন ইচ্ছে হয়েছে তাই দাঁড়িয়েছে ট্যাক্সিটা, এমনি। একটা হোটেল ফোয়ায়ারে ঢুকে এক প্যাকেট সিগারেট কিনে রানা যখন বেরোচ্ছে, তখনও তেমনি দাঁড়িয়ে রয়েছে ওটা। রওয়ানা হয়ে গেল রানার ট্যাক্সিটা, খানিক চলবার পর রানা বলল, ডাইনে মোড় নাও। প্রিনসেনটি ধরে। এগোও।
কিন্তু ওটা তো শিফলের রাস্তা না। আপত্তি জানাল ট্যাক্সি ড্রাইভার।
না হোক। ওই রাস্তা দিয়েই যেতে চাই আমি। ডাইনে ঘোরো।
ঘুরল ড্রাইভার, পেছনে মার্সিডিজটাও ঘুরল এইদিকেই।
থামো। দাঁড়িয়ে পড়ল ড্রাইভার। মার্সিডিজও দাঁড়িয়ে গেছে। রাগ হলো রানার। সবকিছুরই একটা সীমা আছে। চিড়িয়া মনে করেছে নাকি ওকে। ব্যাটারা? নাকি ননীর পুতুল? গাড়ি থেকে নেমে মার্সিডিজটার দিকে এগিয়ে। গেল রানা, এক ঝটকায় দরজা খুলে বাকা হয়ে ঝুঁকল সামনের দিকে। নীল স্যুট পরা বেটেখাট, মোটা, টাকপড়া এক লোক বসে আছে ড্রাইভিং সীটে, চেহারায় একটা বেপরোয়া ভাব।
গুড ইভনিং, বলল রানা। ভাড়া যাবে?
না। ভুরু কুঁচকে আপাদমস্তক দেখল লোকটা রানাকে, বোঝাবার চেষ্টা করল–খোঁড়াই কেয়ার করে সে রানাকে, তেড়িবেড়ি করে লাভ হবে
তাহলে দাঁড়িয়ে আছ কেন?
সিগারেট খাওয়ার জন্যে কেউ থামতে পারবে না, এমন কোন আইন আছে?
না, এরকম আইন নেই। কিন্তু তুমি তো সিগারেট খাচ্ছ না, বাছা?হাসল রানা। যাই হোক, মানিক্সস্ট্রাটের পুলিস হেডকোয়ার্টারটা চেনা আছে? লোকটাকে গম্ভীর হয়ে যেতে দেখে রানা বুঝল, ভাল করেই চেনা আছে ওর জায়গাটা। বলল, সোজা চলে যাও ওখানে। ওখানে গিয়ে হয় কর্নেল ডি মোন্ড নয়তো ইন্সপেক্টর মাগেনথেলারের সঙ্গে দেখা করে বলো কার্লটন হোটেলের ছশো বাইশ নম্বরে থাকে মাসুদ রানা–তার বিরুদ্ধে তোমার একটা কমপ্লেন আছে।
কমপ্লেইন্ট? অবাক হয়ে চাইল লোকটা রানার মুখের দিকে। কিসের কমপ্লেইন্ট?
নালিশটা হচ্ছে এই যে, লোকটা তোমার গাড়ির ইগনিশন কীটা কেড়ে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে খালের মধ্যে। কথাটা শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে লোকটা কিছু বুঝে ওঠার আগেই বিদুৎবেগে ইগনিশন কী বের করে নিল রানা। লক থেকে, সাই করে ছুঁড়ে মারল ওটা খালের মাঝ বরাবর। ছপাৎ শব্দ তুলে তলিয়ে গেল চাবিটা। ছানাবড়া হয়ে গেছে লোকটার চোখ। চোখ টিপল। রানা। আর কোনদিন আমাকে অনুসরণ করবার চেষ্টা কোরো না। লোকটা আমি তেমন সুবিধের নই। দড়াম করে দরজা লাগিয়ে দিয়ে দ্রুতপায়ে ফিরে এল সে নিজের ট্যাক্সিতে।
মেইন রোডে উঠে এসে আবার থামতে বলল রানা ট্যাক্সি ড্রাইভারকে। পাওনা চুকিয়ে দিয়ে বলল, ভাবছি, হেঁটেই যাব।
শিফল যাবেন হেঁটে। চোখদুটো কপালে উঠল ড্রাইভারের। কত। কিলোমিটার জানা আছে আপনার?
মাথা ঝাঁকাল রানা জানো তো না কত হাঁটতে পারি ভঙ্গিতে। ট্যাক্সিটা চোখের আড়াল হতেই লাফিয়ে উঠল সে একটা ট্রামে, সোজা গিয়ে নামল ড্যামে। গাঢ় রঙের একটা লম্বা কোট পরে, গাঢ় রঙের একটা স্কার্ফ দিয়ে মাথা– ঢেকে দাঁড়িয়ে আছে সোহানা ট্রাম শেলটারে। রানার অপেক্ষায়। স্যাৎসেতে, আবহাওয়ায় চুপসে গেছে।
আধঘণ্টা লেট। সময়জ্ঞান কবে হবে তোমার, রানা?
বসকে ক্রিটিসাইজ করতে নেই, সোহানা। হাঁটতে শুরু করল রানা।
রানার পাশাপাশি এগোল সোহানা। গতরাতে ছাইরঙা লোকটাকে অনুসরণ করে যে পথে গিয়েছিল সেই পথ ধরে এগোল ওরা। ক্র্যাসনাপোলস্কি। হোটেলের পাশ দিয়ে, আউডেজি ভুর্বার্গোয়াল খালের ধার ঘেষে সারি সারি। ওয়েরহাউজ ঠাসা পুরানো শহরের দিকে। বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ হেঁটে হঠাৎ রানার হাত ধরল সোহানা, মুখের দিকে চাইল।
তোমাকে এত ভয় পেতে আগে কোনদিন দেখিনি আমি, রানা।
তাই নাকি? কি করে বুঝলে যে ভয় পেয়েছি?
তোমার গোপনীয়তা দেখে। সাবধানতা দেখে।
আগে খুব অসাবধান ছিলাম বুঝি?
সোহানা বুঝল, এই লাইনে কথা এগোবে না, কাজেই সরাসরি প্রশ্ন। করল, কতদূর এগোলে? কি করে বেড়াচ্ছ দিন রাত? দেখা নেই কেন? মারিয়া বলছিল, আমাদের মানুষ বলে গণ্য করো না তুমি, দাবার ঘুটির মত ব্যবহার করছ। আমারও তাই মনে হচ্ছে এখন। তুমি বদলে গেছ, রানা।
তোমাদের সঙ্গে যোগাযোগ একটু কম রাখছি, এটা বলতে পারো। কিন্তু তোমাদের মানুষ বলে গণ্য করি না, দাবার খুঁটি হিসেবে ব্যবহার করছি,
এসব একটু বাড়াবাড়িই মনে হচ্ছে আমার কাছে। কোন রকম দুর্ব্যবহার…
না। তোমার ব্যবহার সম্পর্কে কারও কোন নালিশ নেই। নালিশ দূরে সরিয়ে রাখার জন্যে। কাজ করতে এসেছি আমরা এখানে–কিন্তু কাল বিকেল। থেকে আজ সন্ধে পর্যন্ত পচা এক হোটেলে বসে বসে অপেক্ষা করা ছাড়া আর কি কাজ করেছি আমরা? কাজ কতটা হয়েছে, কতটা বাকি আছে, কিছুই জানি না কেন আমরা?
আমিই কি জানি? হাসল রানা। দেখো, সোহানা, এখানে এক জঘন্য, অপ্রীতিকর কাজ নিয়ে এসেছি আমরা। প্রতিপক্ষ সম্পর্কে পরিষ্কার কোন ধারণা। নেই আমাদের। অথচ আমাদের আগাপাশতলা সবই জেনে গেছে। শত্রুপক্ষ। তোমাদের কথা জানি না, কিন্তু আমার সম্পর্কে সব কিছু ওদের। কাছে জলের মত পরিষ্কার। এই অবস্থায় কাজ করা কতটা মুশকিল তুমি কল্পনাও করতে পারবে না। ভয়ও পেয়েছি আমি এই জন্যেই। আমাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়া হয়েছে কতটা শক্তি ধরে ওরা। মানে মানে কেটে না পড়লে আমার কপালে কি ঘটবে সেটা জানাতেও কসুর করেনি। এই অবস্থায় তোমাদের দূরে সরিয়ে না রেখে বুকের কাছে টানলেই কি ভাল হত?
