তবে অফিসে গিয়ে আজকাল সে কিন্তু অতো ক্লান্তি বোধ করে না। আরেকটা জিনিস ময়না নিজেই লক্ষ্য করেছে সে কারও সঙ্গেই প্রয়োজন ছাড়া কখনও একটা কথাও বলে নি। আজকাল কিন্তু বলে। কুশল জিজ্ঞেস করে। তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে ভালোমন্দ আলাপও করে। মনে হয় তার জীবনের জমাট পাথরখণ্ডগুলো বুঝি গলতে শুরু করেছে। সে পাশে কাউকেই সইতে পারতো না। আজকাল কিন্তু অনেক সময় পাশে কাউকে সে কামনা করে। অন্যকে হঠাৎ ডেকে চা খাওয়ায়। তার ঘনিষ্ঠ দু’একজন মেয়ে মন্তব্য করে। ময়নার কানে আসে, হেসে উড়িয়ে দেয়। আগের দিন হলে চাকুরি যেতো। একি হারুনের সান্নিধ্যের ফল, হবেও বা! ময়না গোপনে জীবনের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে। পরদিন বিকেলের দিকে হারুন ওকে ফোন করলো, ময়না আমি আজ আসতে পারবো না। তাড়াতাড়ি নারায়ণগঞ্জ যেতে হবে। কাজ পড়েছে। যদি কাল না আসি তাহলে হয়তো আর ফোন করবো না। কারণ তাহলে ধরে নিও আমি নারায়ণগঞ্জে আটকে গেছি। তবে পরও নিশ্চয়ই আসবো। ময়না বললো, এসো, তবে পরশু এসেই ফোন করো। আমি একটু চিন্তায় থাকবো। পরদিন বিকেলে ফোন পেলো ময়না। ও নারায়ণগঞ্জ থেকে কথা বলছে। ওর ছোট বোন আসিয়ার বিয়ের কথা পাকা হলো। আগামী মাসে বিয়ে হয়ে গেলে হারুণের দায়িত্ব কর্তব্য সব শেষ। বড় আপা, মেজো আপার বিয়ে হয়ে গেছে যুদ্ধের আগে। একমাত্র আসিয়াই বাকি ছিল। ওর ছোট দু’ভাই দুজনেই পড়া শেষ করে চাকুরি করছে। বেশ স্বচ্ছল গোছানো সংসার। তাকে নিয়ে অমন অঘটন না ঘটলে আজ তো তাদেরও সুন্দর ছিমছাম সংসার হতো। বড় ভাই আর সে চাকুরি করতো, মন্টু পড়া শেষ করে যা হয় একস্টা করতো। সে অবশ্য মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে একটা ব্যাংকে চাকুরি পেয়েছে। এক বছর পর আরেকটা পরীক্ষা হবে। পাশ করলে অফিসারের গ্রেড়ে যাবে। এতেই আব্বা-আম্মা খুশি। তাছাড়াও দৈনিক শ’ দুশ আব্বা এখনও উপার্জন করেন। তার জন্যে ভাইয়া বিয়ে করছে না। কারণ বলে না। কিন্তু ময়না বোঝে, ভাইয়াকে বোঝাতে চেষ্টা করে, কিন্তু ভাইয়া কোনও কথাই কানে নেয় না।
দু’দিন পর হারুন ঠিকই ফোন করলো। ময়নার কিন্তু দুশ্চিন্তা হচ্ছিলো। বোনের বিয়ের নাম করে নিজেরও একটা ব্যবস্থা করে আসবে নাতো? অসম্ভব কিছু না। পুরুষের চরিত্র তো তার দেখা হয়ে গেছে। কামনা জেগে উঠলে ওদের কি স্ত্রী-পুত্র কন্যার কথা মনে থাকে? আর ময়নাতো ওর ছোট বেলার বান্ধবীর চেয়ে বেশি কিছু নয়। হারুন বলেছে একটু আগে আসবে। ময়নাকে এক জায়গায় নিয়ে যাবে। একটু সেজেগুজে থাকতে বলেছে। ময়না রাজি হয়ে ফোন রেখে দেয়। কোথায় নেবে তাকে? কাকে দেখাবে যে সেজেগুজে থাকতে হবে। হবে কোনও বন্ধু বান্ধবীর ওখানে। আসলে ময়না কারও সামনেই যেতে চায় না। হারুম সমস্ত ব্যাপারটা ওর কাছে সহজ করতে চায়। ওকে স্বাভাবিক দেখতে চায়। কিন্তু ময়না কিছুতেই তার জড়তা কাটাতে চায় না। হারুন এখন জোর করে না। ঠিক করেছে সব কিছু ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসুক সেই ভালো। জানি না হারুনকে কতোদিন অপেক্ষা করতে হবে, হোক। সে তো সারা জীবন অপেক্ষা করবার প্রস্তুতি নিয়েই ছিল।
বিকেলে হারুন এলো। ময়নার উপর থেকে ও চোখ ফেরাতে পারে না। মুসুরি ডাল রঙের একখানা জরিপাড় শাড়ি পরেছে। ময়নার গায়ের রঙ ফর্সা। মনে হচ্ছে চারিদিক আলো হয়ে উঠালো। কানে আর গালায় মুক্তো। হারুণের দৃষ্টি দেখে লজ্জা পেলো ময়না। বারে, তুমি তো সেজে থাকতে বলেছো, লজ্জা জড়িত কণ্ঠে বললো ময়না। হারুন বললো, কিন্তু আমার কথাতো রাখে নি। এটা কি সাজা হলো? একখানা সাধারণ তাঁতের শাড়ি পরে তুমি অফিসে যাও না? যাও একটা দামি বেনারসি পরে এসো।
গম্ভীর হলো ময়না, তোমার মাথা খারাপ হয়েছে নাকি? বেনারসি? বেনারসি আমি কোথায় পাবো? স্বর তীক্ষ্ণতর হলো। হারুন নিরুত্তাপ গলায় বললো, নেই বেনারসি, বেশ তো চলো আমি কিনে দেবো তোমাকে। গাড়ির কাছে এসে পড়েছে। ময়নার গতি স্তব্ধ হলো। হারুন তুমি আমাকে নিয়ে, আমার বর্তমান অবস্থা নিয়ে কৌতুক করছো। আই এ্যাম সরি, আমি তোমার সঙ্গে যেতে পারবো না আর। হারুন ওর হাত শক্ত করে ধরলো। রাস্তার পাশে সীনক্রিয়েট করো না ময়না। গাড়িতে ওঠো তারপর না হয় আমাকে দু’চার ঘা দিয়ে দিও। ততোক্ষণে ড্রাইভার দরজা খুলে দাঁড়িয়েছে। গাড়িতে উঠে ময়না আর কোনও শব্দ করলো না, হারুনও রাস্তার দিকে মুখ করে বসে রইলো। সম্ভবত গন্তব্য ড্রাইভারকে আগেই বলে ছিল, সে নিঃশব্দে গাড়ি চালাতে লাগলো। ঈদগাহ রোডের থেকে ওঠা একটা রাস্তায় গাড়ি ঢুকে থামলো। এবার হারুন নিজেই দরজা খুলে দিল। একেবারে অন্যমনস্ক কেমন যেন অভিভূতের মতো ময়না ওর পেছন পেছন বেরুলো। দোতালায় উঠে একটা দরজায় চাবি লাগালো হারুন। ঘরে ঢুকে বাতি জ্বাললো। সুন্দর ছিমছাম বসবার ঘর, আসবাবপত্রের বাহুল্য নেই কিন্তু নিতান্ত প্রয়োজনের অভাব নেই। একটা সোফাসেট আর একটু দূরে একটি বেতের সেট। দু’জায়গায় দুই টুকরো কার্পেট, বেতের দিকে মাখন রঙের আর অন্যদিকে চকোলেট রঙের। ময়না অতিকষ্টে উচ্চারণ করলো, এ তুমি আমাকে কোথায় আনলে হারুন? গলাটা এতো ক্লান্ত যে মনে হচ্ছে অনেক দূর থেকে ওর কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে। এবার হারুন ওর দিকে এগিয়ে এলো। হাত দুটো ধরে নিজের ভেজা চোখের ওপর বুলিয়ে বললো, তোমার নিজের ঘরে এনেছি ময়না। এসো ভেতরে তোমার ঘর, কিচেন, বাথ, একটি অতিরিক্ত ঘরসহ এ্যাপার্টমেন্টটা বেশ সুন্দর। জানালাগুলো বেশ বড়। ময়না তাকিয়ে দেখলো সুন্দর আকাশ দেখা যায়।
