একটু বসি? ক্লান্ত ময়নার কণ্ঠ। নিশ্চয়ই, চলো বসবার ঘরে যাই, নতুবা আবার আমার কোন ব্যবহারে তুমি ক্ষুণ্ণ হয়ে পড়বে। একটু সুস্থির হয়ে ময়না বললো, কবে নিয়েছে এ বাড়ি। আমাকে বলোনিতো? এ বাড়ি নিয়েছি ‘৭৩ সালে তখন তুমি তো আমার কাছে ছিলে না। কেন তোমার পছন্দ হয়নি? ময়না ঘাড় কাত করে সম্মতি জানালো। কেন হবে না। ময়না, আমরা তো আলাদা নই। ভেতরে গিয়ে দুটো কোক, দুটো গ্লাস আর একটা চীপসের প্যাকেট প্লেটে বসিয়ে ট্রে করে নিয়ে এলো। ময়না জিজ্ঞেস করলো, একা থাকো তোমার খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা কি? না না একা থাকি না। নারায়ণগঞ্জের একটা ছেলে আমার কাজ করে, সঙ্গে থাকে। আজ তোমাকে আনবো বলে ওকে ছুটি দিয়েছি। ছেলেটা খুবই কাজের। এবার হারুন একটু অন্তরঙ্গ হয়ে বসে ময়নার পাশে। ওর হাত দুটো তুলে নিয়ে বলে, ময়না, কবে আসবে তুমি আমার এ ঘরে, কবে এ সুর আমাদের ঘর হবে?
হারুনের হাতের ভেতর ময়নার হাত কাঁপছে, ঘামছে। ও কথা বলতে চেষ্টা করছে কিন্তু পারছে না। হারুন উঠে দাঁড়িয়ে ওকে বুকে টেনে নিলো। বলে, ময়না, এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে। তোমার বাবা আমাদের বাড়ি থেকে আসার পর আমার ভাই হাশেম আমাকে সব কথা বলে। আমি কাউকে কিছু বলি নি। কোম্পানির কাছে বাড়ি চেয়েছি। ওরাই এটা ঠিক করে দিয়েছে। ভাড়া ওরাই দেয়। আমি তারপর এক রাতও ও বাড়িতে থাকি নি। সেদিন আসিয়ার বিয়ের কথা ঠিক হতে হতে অনেক রাত হয়ে গেল। বড় ভাইয়ের সঙ্গে বাকি রাতটুকু কাটিয়ে এসেছি। তুমি ওর কাছ থেকে জেনে নিও। মা তোমাকে খুব ভালোবাসেন ময়না। সব সময় জিজ্ঞেস করেন আমি তোমার খবর রাখি কিনা। এবার মাকে বলেছি। মা বললেন, তোর বাবার তখন মাথা ঠিক ছিল না। তুই বলে দেখ। ময়না রাজি হলে আমরা ওদের বাড়ি গিয়ে প্রস্তাব দিব। মাকে বলেছি ওর মতের দরকার হবে না। সে রাজি হলে আমরা নিজেরাই বিয়ে করে নেবো। মা হাতটা চেপে ধরে বললেন, না বাবা, যেখানেই করিস আমাকে আর ময়নার মাকে ডাকিস। আমরাও মেয়ে মানুষের জাত, এটা ভুলিস না।
ময়না ডুকরে কেঁদে উঠলো সত্যিই হারুণের মা ওকে খুব ভালোবাসতেন। ডাকতেন পাগলী বলে। ময়না এবার বললো, হারুন তোমার এক দেহে এত গুণ জানতাম না। হারুন লাল হয়ে বললো, দেখো ময়না, স্বামীকে শ্রদ্ধা করতে হয়, সম্মান করতে হয়, নাম ধরে ডাকতে নেই। ওগো, হ্যাঁগো বলতে হয়। ময়না বললো, ব্যাস, মাত্র এই? না না আরও আছে। রোজ সকালে স্বামীর পা ধুয়ে দেবে, এই লম্বা চুল দিয়ে পা মুছে দেবে! ব্যাস ব্যাস আর না, সব শেষে শক্ত একটা লাঠি দিয়ে ঐ পা দুটো ভেঙে দেবে! ছিঃ ছিঃ ছিঃ কি যে বলো, নাও এটুকু মুখে দাও। রাতের খাবার আজ আর রেস্তোরাঁয় নয়। হাকিম রান্না করে রেখে গেছে। ভাতটা আমি করে নেবো। আর চাইলে তুমিও করতে পারো। হারুণের কাছে ঘনিষ্ঠ হয়ে ময়না বলে আমার বড় ভয় করে হারুন। সবল হয়ে হারুন বলে কিসের ভয় ময়না? আমার দিকে তাকাও, আমার এ বিশাল বুকের ভেতর থেকে কে তোমার কি ক্ষতি করবে? আমার উপর ভরসা করতে পারে না? পারা তো উচিত হারুন, তবুও কেন জানি না কিসের ভয় আমার। আমি জানত স্ব ইচ্ছায় কোনও পাপ, কোনও অন্যায় করি নি। তবুও পর্বত প্রমাণ অপরাধের বোঝা মাথায় নিয়ে আজ দু’বছর পথ চলেছি। আমি বড় ক্লান্ত হারুন। একা একা আর পারছি না। শোনো, আগামী মাসের সতেরো তারিখে আসিয়ার বিয়ে ঠিক হয়েছে। তুমি যাবে না। কিন্ত্র খালাম্মা খালু সবাইকে আঝা গিয়ে দাওয়াত করে আসবেন এবং আমার বিশ্বাস তাদের অন্তরে যতো ব্যথাই তারা পান না কেন, দাওয়াতে তারা ঠিকই আসবেন। তারপর আম্মা-আব্বা গিয়ে সব কথাবার্তা বলে আসবেন।
ময়না হঠাৎ মুখ তুলে বললো, বিয়ে কিন্তু ঢাকায় হবে। নিশ্চয়ই বলে পাশের ঘরে চলে গেল হারুন। একটু পরে একটা শাড়ির বাক্স নিয়ে এলো। কমলা রঙের এটা দারুণ কাজ করা বেনারসি। ময়না, এই শাড়ি দিয়ে আমি আজ নতুন করে তোমার মুখ দেখলাম। ছিঃ ছিঃ কি যে ছেলেমানুষী করো, লজ্জায় কুঁকড়ে গেল ময়না। হারুন উঠে এসে ওর হাত ধরে বললো, প্লিজ ও ঘরে গিয়ে শাড়িটা পরে এসো। ওর কথা ফেলতে পারে না ময়না, শাড়িটা পরেই আসে। বাঃ চমৎকার। আমার রুচির প্রশংসা করলে না ময়না? রাজ্যের লজ্জা ওকে ঘিরে ধরেছে। ধুপ করে একটা সোফায় বসে পড়লো ময়না হাত থেকে ছোট বাক্সটা বের করে একটি ছোট ডায়মন্ড আংটি ময়নার অনামিকায় পরিয়ে দিলো হারুন। সহজাত রীতিতে ময়না নিচু হয়ে হারুনকে সালাম করতে গেলে বন্দি হলো তার হাতের ভেতর। হারুন অনুমতি নিয়ে তার চোখের ওপর উষ্ণ ওষ্ঠ ছেলো, তারপর যথাস্থানে।
রাত দশটায় বাড়ি ফিরে এলো ময়না বেবিট্যাক্সি করে। আজ হারুন তাদের প্রথম অভিসারের লগ্নে আর কারও উপস্থিতি চায় নি। কি দ্রুত কেটে গেল মাসটা, আসিয়ার বিয়ে হয়ে গেল, ময়নাদের বাড়িতে হারুণের বাবা-মা বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এলেন। চোখের জলে সব ভুল বোঝাবুঝি দূর হয়ে গেল। বিয়ে হলো ঢাকায়। দু’তরফের আত্মীয়, বন্ধু সবাই এলেন কয়েকজন তৎকালীন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। নারায়ণগঞ্জের জোহা সাহেবও এসেছিল।
