সাড়ে আটটা থেকে নটার ভেতর অফিসে পৌঁছোলাম। ওখানকার অফিসার সুন্দর মতো মধ্য বয়সী এক মহিলা। পরে নাম জেনেছি মোসফেকা মাহমুদ। তিনি সব শুনে বললেন-তোমার আব্বা-আম্মা আছেন তোমাকে আশ্রয় দিতে চান, তবুও কেন তুমি চলে আসতে চাও? আমি তাকে সব খুলে বলেছিলাম। ঠিক এ সময় আপা আপনি ওখানে ঢুকলেন। আমি থেমে গেলাম। মোসফেকা আপা সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, তাঁর সামনে বলতে পারো উনি আমাদের আপা। পরে আপা আপনার নামই শুধু জানলাম না। যখন আপনি, বাসন্তী আপা, জেরিনা আপা, নূরজাহান আপা আমাদের কাছে আসতেন, নিজেদের কথা বলার ছলে আমাদের কথা জেনে নিতেন। আমি আপাতত ওখানে আশ্রয় পেলাম। ওরাই খোঁজ করে চাকুরি দেবেন এবং তখন আমি হোস্টেলে চলে যাবো।
মাস খানেকের ভেতর আমি একটা সাহায্য সংস্থায় কাজ পেলাম। বলতে গেলে কনিষ্ট কেরানির পদ। কিন্তু আমার জন্য ওটা আশাতীত। প্রথম মাসের মাইনে পেয়ে বাবাকে দু’শ টাকা পাঠালাম। রশিদ এলে বুঝলাম বাবা টাকা পেয়েছেন। পরে একটা চিঠি দিয়ে সব জানালাম। আমি ভালো আছি, সুখে আছি, আবার পড়াশুনা শুরু করেছি ইত্যাদি। মনে হলো আব্বা বেঁচে গেছেন। খুব সুন্দর চিঠি লিখেছেন। বাড়ি যেতে বলেছেন ছুটিতে। এই হোস্টেলে থাকার সময় জেরিনা আপার কাছ থেকে যে স্নেহ আর উপদেশ পেয়েছি তা কখনও ভুলবো না আপা। ওঁর মৃত্যুর সময়। আমি দেশে ছিলাম না, তাই শেষ দেখাটুকু দেখতে পারি নি। উনি আমার বড় ভাইয়ের সঙ্গে খুব মন খুলে আলাপ করতেন এবং বলা বাহুল্য অধিকাংশ আলোচনাই আমার সম্পর্কে।
আমার বিএ পরীক্ষার ফল বেরুলো। ভালো করলাম। চাকুরিতে উন্নতি হলো। একেবারে শক্ত হয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করলাম। হারুন নাকি প্রায়ই ভাইয়ার সঙ্গে দেখা করে আমার ঠিকানা জানতে চায়। ওর বাবার ব্যবহারের জন্য বার বার ক্ষমা চেয়েছেন ভাইয়ার কাছে। আমি গায়ে লাগাই নি। এখন আমার কারও সাহায্যের প্রয়োজন নেই অতএব ওকে একটু নাড়া দেওয়া যেতে পারে। গাইড দেখে ওর অফিসের ফোন নম্বর বের করলাম। হারুন-উর রশিদকে চাইতেই পেয়ে গেলাম। মনে হলো পদমর্যাদা আছে। হ্যালো বলতেই ও চমকে উঠলো। বললো, কে? কে বলছেন? গলা শক্ত করে বললাম, আমি। এক সময় কোনও কালে আপনি আমাকে চিনতেন। নরম গলায় বললো, ময়না, কোত্থেকে চলছে? নাম ঠিকানা, ফোন নাম্বার সব দিয়ে শনিবার আমার সঙ্গে হোস্টেলে দেখা করতে আসতে বললাম। ও ঠিক সময় মতো এলো। আমাদের উল্টো দিকেই একটা চাইনীজ বেঁস্তোরা ছিল ওখানে গিয়ে বসলাম কথা কারও শেষ হয় না। পর দিনের প্রোগ্রাম করে সেদিন দুজনেই চোখের জলে বিদায় নিলাম। এ কথা সত্যি আমি হারুনকে ভালোবাসতাম। প্রেম চেতনার প্রথম মুহূর্ত থেকে বধূবেশে ওর ঘরে যাবো-এ আমার স্বপ্ন ছিল না, ছিল বাস্তব সত্য। তারপর কোথা দিয়ে কি হয়ে গেল, মনে হয়েছিল ওকে পাবার অধিকারও আমি হারিয়েছি কিন্তু ওর বাবার ব্যবহার আমাকে প্রতিহিংসার পথে ঠেলে নিয়ে গিয়েছিল। ভেবেছিলাম আমার বাবার অপমানের প্রতিশোধ নেবো। হ্যাঁ আমি বীরাঙ্গনা, যুদ্ধ করে এসেছি। আমার শেষ জয় পরাজয় হারুন তোমার আব্বার সঙ্গে যুদ্ধের পরিণতি। পরদিন হারুন এলো সন্ধ্যায় ঠিক নির্ধারিত সময়ে বাইরে উদার আকাশ আর কেমন যেনো স্নেহ কোমল স্পর্শ বাতাস বইছে। ময়না বললো, চলো, আজ বাইরে কোথাও গিয়ে বসি। রেস্তোরাঁয় বসতে ভালো লাগছে না। হারুনের একটু অসুবিধা, সে নিজে অফিসের গাড়ি চালায় না। তাই ড্রাইভারের সামনে ময়নাকে নিয়ে যেখানে সেখানে বসতেও পারে না। তবুও বললো সংসদ ভবনের দিকে। গাড়ি রেখে দুজনে হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে লেকের পাড়ে বসলো। হঠাৎ ময়না হারুনকে একটা ধাক্কা দিয়ে বললো, এই ঝালমুড়ি, খাবো। হারুন কৃত্রিম গাম্ভীর্য দেখিয়ে বললো, আমরা কি এখনও ছেলে মানুষ আছি নাকি যে মুড়ি খাবো? খেতে চাইলে রেস্তোরাঁয় ঢুকতে হবে। লেকের হাওয়া এবং বস্তু ভক্ষন এক সঙ্গে চলবে না। এক সঙ্গেই চলবে, বলে ময়না ডাকলো মুড়িওয়ালাকে। হারুন মাথা ঘুরিয়ে দেখলো ড্রাইভার দেখছে কিনা। ও চিরকালই একটু শান্তি প্রিয় দুর্বল প্রকৃতির। সে মানুষ হিসেবে সত্যিই ভালো কিন্তু নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবার মতো ধৈর্য ও মনোবল তার কোনও দিনই ছিল না। তাই সাহস করে নিজে গিয়ে ময়নার সামনে সঁাঁড়াতে পারে নি। অথচ হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়েছে। ময়নার ভাইয়ের সঙ্গে অন্তত সপ্তাহে সে একদিন দেখা করেছে। তাই ওকে ময়নার ঠিকানা, ফোন নম্বর সব দিয়েছে। সে একান্তভাবেই চেয়েছে, হারুন ময়নার সঙ্গে দেখা করুক। অবশ্য ফলাফল সম্পর্কে সে খুব আশাবাদী নয়, এ কথা হারুনাকে জানিয়েছে। ময়নার জিদ তার জানা আছে তার ওপর আব্বার সেদিনের শিশুর মতো কান্না সেও তো ভুলতে পারে না।
তবুও সময়ে সব সয়ে যায়, মানুষ অনেক কিছুই ইচ্ছে করে হোক আর অনিচ্ছাতেই হোক ভুলে যায়, চেষ্টা করে ভুলে যেতে। এতে বোঝানো সত্ত্বেও সে পারে নি মুখ উঁচু করে ময়নার সামনে দাঁড়িয়ে বলতে, ময়না আমি এসেছি। চলো তোমার আশ্রয় হোস্টেলে নয়, আমার ঘরে। কতোদিন ওর হোস্টেলের সামনে এসে গাড়ি থামিয়েছে। ভেতরে ঢুকেছে আর তখনই বেরিয়ে এসেছে। নিজের থেকেই যেন ড্রাইভারের কাছে কৈফিয়ৎ দিয়েছে, না সে হোস্টেলে নেই, বেরিয়ে গেছে। চতুর ড্রাইভার সবই জানে। চুপ করে থেকে সাহেবের মান রক্ষা করে। ময়না নিজের থেকে ফোন না করলে আজও সে দূরেই রয়ে যেতো। কনুই দিয়ে ধাক্কা দিলো ময়না, এই মুখে ক্লিপ আটকেছো? হেসে ওঠে হারুন। তোমার ধ্যান ভাঙাতে সাহস পাই নি। বাজে কথা, জানো আমি প্রাণভরে আকাশ দেখছিলাম। জানো দশটা মাস আমি একবিন্দু আকাশ দেখতে পাই নি। ভেবেছিলাম হয়ত লাশ হয়ে আকাশের নিচে মাটি দেবে আমাকে। কিন্তু আমি তো আর সেই নীল আকাশ, বিকেলের সিঁদুর মাখা আকাশে অথবা কালবৈশেখীর সেই কালি ঢালা আকাশে… ওর কথা শেষ করতে দেয় না হারুন চট করে পকেট থেকে টান দিয়ে একটা ডট পেন ওর সামনে দিয়ে বলে, কবিতা লিখে ফেলুন নাম থাকবে। ময়না চোখ গরম করে বলে, খালি দুষ্টুমি। তোমার সঙ্গে কথা বলে আনন্দ নেই। বেশ তো আনন্দ না পেলে দুঃখ নিও না। আমাকে বয়স, উচ্চতা, মোটামুটি চেহারা বলে দাও আমি ধরে এনে দেবো যতো ইচ্ছে গল্প করে। ওর দিকে সম্পূর্ণ ঘুরে ময়না বললো, সইতে পারবে? বুকে বালিশ দিয়ে বিছানায় উপুড় হবে নাতো? না বাবা উপুড় না হলেও শোবার ঘরেই থাকবো। ওটা কল্পনাতেও সইতে পারি না ময়না। তাইতো প্রতিটি মুহূর্ত আমি জ্বলেছি। আমি পুড়ে পুড়ে কয়লা হয়ে গেছি ময়না, তুমি বিশ্বাস করো। ওর কাছে আরও নিবিড় করে বসে ওর হাত দুটো ধরে বলে ময়না, তোমাকে আমি এক বর্ণও অবিশ্বাস করি না হারুন। তুমি তো আমার কথা ভাবতে পারছে। কখনো-বা আশা করেছে আমাদের দেখা হবে, আবার আমরা পুরোনো জীবনে ফিরে যাবো। কিন্তু আমি? আমি প্রথম দিন থেকেই মনের দরজায় কপাট লাগিয়ে দিয়েছিলাম। জানতাম আমি আর কখনও মুক্তি পাবো না। হঠাৎ একদিন আমাকে গুলি করে মেরে ফেলবে। আশ্চর্য জানো হারু, তোমার কথা, আব্বা, আম্মা, মন্টু, চায়না, ভাইয়া কারও কথাই আমার মনে হয় নি। মনে হয়েছে বন্দি বঙ্গবন্ধুর কথা, মনে হয়েছে আমাদের মিটিং-মিছিলের কথা তাও খুব বেশি নয়, জানো হারুন আমার মাথাটা কেমন যেনো শূন্য হয়ে গিয়েছিল। শুধু ভাবতাম আমি কখন মরবো, কেমন করে মরবো। তারপর একদিন…। ওর দিকে তাকিয়ে হারুন শক্ত হাতে ওর মুখ চেপে ধরলো, না, ময়না না, তোমার কষ্টের কথাগুলো আমাকে বলল না। হঠাৎ উঠে দাঁড়ালো, চলো, বড্ড খিদে পেয়েছে। কিছু একটা খাবো, তারপর তোমাকে হোষ্টেলে ড্রপ করে চলে যাবো নারায়ণগঞ্জ। পৌঁছেতে পৌঁছেতে অনেক রাত হয়ে যাবে। মা-ভাইবোন নারায়ণগঞ্জ? অবাক হয়ে ময়না উচ্চারণ করলো। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বললো, মা এ দু’দিনেই আমাকে সন্দেহ করেছেন। আমি তো দেরি করে কখনও বাড়ি ফিরি না। মীরপুর রোডে একটা রেস্তোরাঁয় ঢুকে হাম বার্গার আর কেক নিলো। না, পুরো রাতের খাবার তারা খেতে চায় না। তাদের মুখ্য উদ্দেশ্য কথা বলা সামান্য স্পর্শ হাসি বিনিময় এর চেয়ে বেশি কিছু না। আর ময়নার তো ভয়ই যেতে চায় না। হারুন সব জানে তো? সব টুকুই কি ভাইয়া ওকে বলেছে? ভাইয়াও তো বিভীষিকার মুহূর্তগুলোর কথা জানে না। জানি না এই খেলার শেষ কোথায়। ময়না ঠিক করেছে হারুন যদি বিয়ের প্রস্তাব না দেয় সেও কিছু বলবে না। এমনিভাবে যদি জীবনটা কেটে যায় যাবে। খুব হাল্কা ছন্দে হোস্টেলে ফিরে এলো সে। রাতে শুয়ে শুয়ে ভাবে, একটা ছোট বাসা নিলে কেমন হয়? হারুনের ইচ্ছে না হলে রোজ রোজ সে নারায়ণগঞ্জ নাই-বা গেল। কিন্তু মুখ ফুটে এ প্রস্তাব দেবে কেমন করে? কি ভাববে হারুন। ভাববে যে জীবন সে যাপন করে এসেছে তেমনই একটা জীবনে সে আবার ফিরে যেতে চায়। না ও আর ভাবতে পারে না।
