সকালে যখন জেগেছে সারাবাড়ি তখন রোদে ভরে গেছে। আব্বা শোবার ঘরে নেই। গোসলখানা থেকে পানির শব্দ আসছে। সম্ভবত গোসল করছেন। ওহো আব্বা তো সকালেই আম্মাকে আনতে যাবেন। মুখ হাত ধুয়ে নিলো ময়না। আব্বা তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নাশতা আনতে গেলেন। আজ সালামের দোকানের পুরী আর ভাজি। ময়নার পেটে যেন রাক্ষস ঢুকেছে। খেয়েই চলছে। আঃ আর কোনও দিন নিজেদের ঘরে বসে খাবে এ কথা তো সে কল্পনাও করে নি। ভাবতে গেলেও গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। আব্বা ওকে যে কেউ এলে দরজা না খুলতে বলে সতর্ক করে দিয়ে দুটোর ভেতরেই ফিরে আসবেন বলে গেলেন। ময়না ঘুরে ঘুরে ঘরের টুকি টাকি জিনিসপত্র গোছাতে লাগলো। ওর বেশ কিছু পুরোনো সালোয়ার কামিজ পেলো। এগুলো আর কষ্ট করে লুট করে নি। ভাগ্যিস আব্বার ডিসপেনসারী ঘরটায় হাত দেয় নি। ওষুধের বাক্সগুলো ঝেড়ে মুছে গুছিয়ে রাখলো ময়না। কাল থেকেই আব্বা চেম্বার খুলতে পারবেন। এবার ওর বিএ পরীক্ষাটা দিতে হবে এবং একটা চাকুরিও যোগাড় করতে হবে। কারণ এ ধাক্কার পর আব্বার নতুন করে জীবন শুরু করতে বেশ কষ্ট হবে। তারপর ভাইয়া এলে আস্তে আস্তে তার ঘটনাটা লোক জানাজানি হবে। তখন আব্বাকে কি সংগ্রামের মুখোমুখি হতে হবে তা ময়না ভাবতেও চায় না। হঠাৎ ধড়মড় করে উঠে বসলো ময়না। এতো ঘুম কোত্থেকে আসছে সে ভেবে পায় না। উঃ না সে আর ভবিষ্যতের কথা ভাববে না। যে কটা দিন থাকবে বাবা-মায়ের বুকে থেকে একটু শান্তি পেয়ে যাক। সে বাইরে বেরুবে না। কারও সামনে যাবে না। কারণ এ ছোট জায়গায় কি সেই ঘৃণিত সংবাদ এসে পৌঁছোয় নি? যারা তাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল, সেইদিন থানায় যারা তাকে হাজতে ঢুকিয়ে দিয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে ফিরে এসেছিল তারা কি এ বিজয় গৌরবের কথা এখানকার লোকজনকে বলেনি? তবে সালাম চাচা কিছু জানে না মনে হলো। ডালপুরী ওয়ালাও তো স্বাভাবিক ব্যবহার করলো। তাহলে ওই শয়তানদের কি মুক্তিবাহিনী মেরে ফেলেছে। হতেও তো পারে। আব্বা ডিম এনে রেখে গেছেন। হাতড়ে হাতড়ে সামান্য মসলা পাওয়া গেল। ও ভাত-ডাল আর ডিমের তরকারি রান্না করে রাখলো। এতো বেলায় সবাই কি প্রচণ্ড খিদে নিয়েই না আসবে।
দরজায় কড়া নড়লো, চায়নার গলা পেলো ময়না। দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলে দিলো। চায়না চিৎকার করে ময়নাকে জড়িয়ে ধরলো। কিন্তু মায়ের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠলো ময়না। মা কঙ্কালসার হয়ে গেছে, মুখের ওপর যেন কেউ কালি লেপে দিয়েছে। মা চিৎকার করে উঠলো ‘ময়না’। মা তার হাতের ওপর ঢলে পড়লেন। মুখে চোখে পানি দিয়ে মাকে সুস্থ করা হলো। অনেকক্ষণ ফ্যাল ফ্যাল করে ময়নার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন তিনি। যেন চিনতে পারছেন না, অস্ফুটে বললো, ময়না, আমার ময়না। ময়না ওর বুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। ধীরে সুস্থে সবাই স্বাভাবিক হয়ে এলো। পাঁচদিন পর বড় ভাইয়া ফিরে এলো কিন্তু একা, মন্টু আসে নি। ও অসুস্থ, হাসপাতালে আছে। ওর একটা হাতে স্প্রিন্টার লেগেছিল, ওটা অপারেশন হয়েছে। ওকে আরও দু’সপ্তাহ কোলকাতায় থাকতে হবে। সব খবর শোনা হলো। মন্টুটা থাকলে কতো আনন্দ হতো। ওর বাঁ হাতটায় কিছুটা খুঁত হয়ে গেছে। অবশ্য ওর কাজ কর্মে কোনও অসুবিধা হবে না। ভালো হাসপাতালে আছে। সম্পূর্ণ সুস্থ হলেই চলে আসবে। মাঝে একবার বড় ভাই যাবে। কিন্তু তার আগে চাকুরিতে জয়েন করতে হবে। টাকা পয়সা দরকার। আব্বার অবস্থা তো বুঝতেই পারছো। তাছাড়া ময়নার ব্যাপারটা এতো সহজে নিষ্পত্তি হবে না। লোকজন সবে আসতে শুরু করেছে। ঘটনাটা ঘটেছিল থানায়। সুতরাং সেখানে তামাসা দেখবার লোকেরও অভাব হয় নি। ঠিক আছে এখন তো আর পেছন পেছন পাক আর্মি তাড়া করছে না। ধীরে সুস্থে ভেবে-চিন্তে একটা ব্যবস্থা করা যাবে। তার আগে ওর বিএ পরীক্ষাটা দেবার ব্যবস্থা করা দরকার। ঘরের জিনিসপত্র সব লুট হয়ে গেছে। আস্তে আস্তে সেগুলোও কিনতে হবে। একা তো, সব দায় দায়িতুই তার। চায়নাকে স্কুলে পাঠাতে হবে। মন্টু এলে আবার কলেজে যাবে। মা তো শুধু বলে, খাই না খাই কি আসে যায়, আল্লাহ তো আমাদের জানগুলো রেখেছেন। ময়নাও তাই ভাবে বেঁচে আছি বলে নানা সুবিধা অসুবিধার বায়নাক্কা। আর যদি এর ভেতরে একজন ফিরতে না পারতো? সত্যিই এর চেয়ে বড় সত্য হয় না। তাইতো আমাদের দেশে বলে, বসতে পারলে শুতে চায়।
এভাবে প্রায় এক মাস কেটে গেল। ছোটভাই মন্টু ফিরে এলো। বাঁ হাতের কব্জিটা নেই, ফেলে দিতে হয়েছে। আম্মার এক দফা কান্নাকাটি সুখের ও দুঃখের মিশ্র অনুভূতি। মন্টু প্রাণ নিয়ে ফিরে এসেছে। নিঃসন্দেহে সুখের আর হাতখানা গেল সে দুঃখ তো কম না। সংসারে কিছু অনটন বোঝা যায়। কারণ আব্বার প্রাকটিস আগের মতো নেই। দশ মাসের অত্যাচারে আর অর্থাভাবে মানুষ মরলেও আর চিকিৎসা করাতে পারছে না। বড় ভাইয়ের মিলের অবস্থা ভালো না। ক্ষমতাসীনরা। বাড়ির আসবাবপত্র থেকে আরম্ভ করে মিলের যন্ত্রপাতি পর্যন্ত সরাতে শুরু করেছে। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকেই আত্মগোপন করতে বাধ্য হয়েছে। কারণ নেতৃত্বের লোভে রাজনীতির নামে সেখানে হচ্ছে প্রচণ্ড দলাদলি আর যারা সুযোগ সন্ধানী পাকিস্তানি মনে প্রাণে) তারা ইন্ধন যোগাচ্ছেন তাতে। সুতরাং বড় ভাই চাকুরি খুঁজছে। অস্বস্তি লাগে ময়নার। সে তো যে কোনও একটা প্রাইমারি স্কুলেও তিন চারশ টাকা মাইনের একটা কাজ করতে পারে। আচ্ছা নার্সিং-এর ট্রেনিং-এ ঢুকলে কেমন হয়? কিন্তু সেখানেও তো সে এখনই নগদ টাকা আব্বাকে এনে দিতে পারবে না। এমন যখন পারিবারিক অবস্থা তখনই ঘটনাটা ঘটলো। নিরুপায় আব্বা হারুণের আব্বার কাছে গিয়েছিলেন। ময়না আর হারুনের সম্পর্কটা দু’পরিবারই বুঝতো। এর শেষ কোথায় তাও তারা স্থির করে রেখেছিলেন। সেই আশায় বুক বেঁধে ময়নার আব্বা গিয়েছিলেন হারুনের বাবার কাছে যদি এখন তারা বিয়েটা দিতেন। কার হারুন ঢাকায় একটা বৈদেশিক বাণিজ্য সংস্থায় ভালো চাকুরি পেয়েছে। হারুনের আব্বা ময়নার আব্বাকে যতোদূর পারা যায় কথা শুনিয়েই ক্ষান্ত হন নি, রীতিমতো অপমান করে চলে যেতে বলেছেন। আব্বা শিশুর মতো কাঁদছেন। ময়না কিছু বুঝবার বা জানবার আগেই আম্মা ছুটে এসে তার দু’গালে কয়েকটা চড় বসিয়ে দিলেন। রাগে কথা বলতে পারছেন না, চিবিয়ে বললো, ফিরে এলি কেন? যে নরকে গিয়েছিলি সেখানেই থাকতে পারলি না? ওরা এতো লোক মেরেছে, তোকে চোখে দেখলো না? কোন সাহসে ওই পাপদেহ নিয়ে এ বাড়িতে ঢুকেছিস বল? বল? আব্বা দৌড়ে এসে আম্মাকে ছাড়িয়ে নিয়ে বললেন, এ তুমি কি করছো? জানো না কি দাম দিয়ে তোমরা আমাকে পেয়েছে? ধিক্কার আমাকে। ও মান দিয়ে আমাকে বাঁচালো আর আমি কিছু করতে পারলাম না ওর জন্যে। তুমি, তুমি কেমন করে ওর গায়ে হাত দিলে ময়নার মা এবার আম্মা আমার ওপর আছাড় খেয়ে পড়লেন, ক্রমাগত চিৎকার করছেন মা, মাগো তোর এই হতভাগী মাকে ক্ষমা করে দে। আমি পাথর হয়ে গেছি। ছোটবেলা থেকে কতো দুষ্টুমি করেছি কিন্তু আজ পর্যন্ত মনে পড়ে না আব্বা-আম্মা কেউ কখনো ভুলেও আমার গায়ে হাত দিয়েছেন। আমার সমস্ত দেহটা জ্বলে যাচ্ছে। আঘাতের দুঃখে নয়, অকারণ আপমানে। আমি তো আব্বার জন্যেই থানায় গিয়েছিলাম। আব্বা ছাড়া পেলেন আমি বন্দি হলাম। আর সে কারণে আম্মা আমাকে মরতে বলছেন। অথচ আমি ফিরে এলে ওরা যে খুশি হয়েছিলেন তাও তো মিথ্যে নয়। মায়ের হাত থেকে আস্তে আস্তে নিজেকে মুক্ত করে নিলাম। ততোক্ষণে বড়ভাই ফিরে এসেছে। সব কিছু শুনে বাবাকে অনুযোগ করলো, তুমি আমাকে বা ময়নাকে না জানিয়ে এ কাজ করতে গিয়েছিলে কেন? তোমার মনে হয় বুদ্ধিশুদ্ধি লোপ পেয়েছে। আমি সোজা গিয়ে বিছানায় আশ্রয় নিলাম। না, আর না। এ বাড়ির অন্ন এবং আশ্রয় দুই-ই আমার উঠে গেছে। ভোরবেলা কেউ ওঠবার আগে ছোট একটা ব্যাগে সামান্য কিছু কাপড়-জামা, ছোট ব্রাশ, তোয়ালে নিয়ে ঘর ছাড়লাম। বড় ভাইকে একটা চিঠি লিখে এলাম। সম্মানজনক আশ্রয় পেলে ওদের জানাবো। আব্বা আম্মাকে সালাম জানিও। আমার খোঁজ করো না। এসে সোজা উঠলাম নারী পুনর্বাসন কেন্দ্রে, ধানমন্ডীতে। কিছুদিন ধরে কাগজে এ প্রতিষ্ঠানের নাম, ঠিকানা ও কর্মকাণ্ড সম্পর্কে পরিচিতি বেরুচ্ছিল।
