শারীরিক যন্ত্রণা, ক্লান্তি ও মনোকষ্টে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ বিকট আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেল। সাইরেন বেজে উঠলো। চেঁচামেচিতে আর সিস্টারদের কথায় বুঝলাম ইন্ডিয়ানরা বোমা ফেলছে আর নিচের থেকে অ্যান্ট্রি এয়ারক্রাফট ছোঁড়া হচ্ছে। আমার ম্যালেরিয়ার কাপুনি উঠে গেল। দুদাঁতের পার্টিতে যেন করতাল বাজছে। সিস্টাররা নেই সব শেল্টারে গেছে। বোকার মতো আমি দাঁড়িয়ে আছি। আমি মরলেই-বা কি আর বাঁচলেই-বা কি? আবার সাইরেন বাজলো, একে একে সব জায়গায় ফিরে এলো। পরদিন আরও ব্যস্ততা। শুধু ট্রাক আর জিপের আওয়াজ। আমি ঘরেই বন্ধ তবে কেউ কিছু আর বলে না। কোনো কর্মের নির্দেশও এলো না। এতোক্ষণে বুঝলাম কর্মকর্তা সে দিন আমাকে ডেকে কেন পছন্দ করলেন। তারপর তিন-চার দিন এরকম হলো। নির্যাতনের চিৎকারও আসে না। সিস্টাররা শুধু বলাবলি করছে মুক্তি বাহিনী ওদের মেরে ফেলবে। একজন আমার দু’হাত ধরে বললো বহিন, আমরা তো সাধ্যমত তোমার খেদমত করেছি, তুমি আমাদের বাঁচাও। হেসে বললাম, আমিও তো এখন তোমাদের একজন, আমাকে বাঁচাবে কে? আমাকে পেলেও ওরা ভোমাদের যা করবে আমার তাই-ই করবে। যে সেন্ট্রি সব সময় রক্তচক্ষু করে তাকাতো, তুই তোকারি ছাড়া কথা বলতে না আজ সকালে দেখি এক সিস্টারের হাত ধরে বলছে ওর দেশে জরু আছে বাল বাচ্চা আছে, ও মরে গেলে তাদের কি হবে। ইচ্ছে হচ্ছিল জোরে হেসে উঠি। ওয়োরের বাচ্চা আমার আব্বা আম্মার কি হয়েছে, কি করেছিস তোরা জানিস না? আমাদের যা করেছিস তোদের শাস্তি হবে তার চেয়েও হাজার গুণ, কুত্তার বাচ্চারা। আজ সবার কথা মনে পড়লো। হয়ত বা বেঁচে যেতে পারি। আবার সবার সঙ্গে দেখা হবে-কি সব ভাবছি আমি, তারাই কি আর বেঁচে আছে। কেউ কোনও কাজ যেন করে না, নিয়ম রক্ষা করে চলেছে। ডাল চাপাতিও পড়ে থাকে। দু’চার জন বাঙালি যারা আছে তাদের মুখ শুকিয়েছে এদের চেয়েও বেশি। এতোদিন দেখলে নাক সিটকাতে। এখন বলে, আপা ভালো আছেন তো? এই তো ছাড়া পেয়ে যাবেন। দেশ স্বাধীন হয়ে গেল বলে। আপনি রেডিও শুনতে পান না। আজ কালের মধ্যেই এরা আত্মসমর্পণ করবে। বন্দি শিবিরে বসে শুনলাম বাইরের আওয়াজ ‘জয় বাংলা’। এরা কারা? কারা এ স্লোগান দিচ্ছে? কিন্তু এদের সবার হাতে তো অস্ত্র, এরা কেন ওদের গুলি করে মেরে ফেলছে না। ময়না কিছু বুঝতে পারে না। শেষ পর্যন্ত শুনতে পেলো আজ বিকেল ৪টায় পাকিস্তানিরা আত্মসমর্পণ করবে। তারপর ও মুক্ত। মুক্ত? কিন্তু কিসের থেকে মুক্তি, যে পাশবিক পরিস্থিতির পথ বেয়ে সে এখানে এসে পৌঁছেছে সে জীবন থেকে তাকে মুক্তি দেবে কে? সে যাবেই বা কোথায়? সত্যিই সন্ধ্যায় বাংলা ও হিন্দীতে জানানো হলো বাঙালি যারা আটক আছেন তারা নিজের নিজের বাড়িতে চলে যেতে পারেন। কেউ বাধা দেবে না। দৌড়ে বেরুলাম। পথ-ঘাট কিছু চিনি না বড় রাস্তা ধরে দৌড়োচ্ছি। আমার মতো আরো লোক দেখলাম। একজনকে বললাম ভাই শহরে যাবার পথ কোন দিকে। দেখিয়ে দিলো, সেও পালাচ্ছে। রাজাকার ছিল, এখন সবার সঙ্গে না মিশে গেলে মুক্তিবাহিনীরা গুলি করে মারবে।
এক সময় বুঝলাম আর্মি সেনানিবাসের বাইরে এসে গেছি, আর দৌড়োবার দরকার নেই। কিন্তু আমি তো যাবো চাষাড়া, কোন পথে বাস যায়। কতো বাসে করে ঢাকায় এসেছি মিটিং মিছিল করতে। ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর সেই বক্তৃতা। ময়নার গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠলো। হঠাৎ থেমে গেল ময়না, সেতো মুক্তি পেয়েছে কিন্তু বঙ্গবন্ধু বেঁচে আছেন কি? রাস্তায় একজনকে জিজ্ঞেস করলো বঙ্গবন্ধু কোথায়? লোকটা ওর দিকে এমন করে তাকালে মনে হলো সে পাগল। বুঝলো এভাবে যাকে তাকে সব কিছু বলা ঠিক হচ্ছে না। দেশতো বদলে গেছে, মানুষের আচার আচরণ তো বদলেছেই। শরীর ক্লান্ত, উত্তেজনায় হেঁটে চলেছে। কিছু দূরে গিয়ে সে চেনা পথ পেলো। কোনও রকমে নারায়ণগঞ্জের বাসে সে চড়ে বসলো। সত্যিই সে চাষাড়া যাচ্ছে? বাস ছেড়ে দিলো। হঠাৎ মনে হলো তার কাছে তো একটা পয়সাও নেই। যদি অপমান করে নামিয়ে দেয়। আব্বার নাম বলবে। হাতে পায়ে ধরবে। তবে সত্যি কথা বলা যাবে না। সিস্টারদের কথা মনে পড়লো, মুক্তিবাহিনী যদি মেরে ফেলে। রাস্তা লোকে লোকারণ্য। স্টেনগান থেকে গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে মুক্তিবাহিনীরা চলেছে, সঙ্গে দু’চারজন হ্যাঁ ভারতীয় সৈন্য ওদের গলায় ফুলের মালা। এরা চিৎকার করেছে ‘জয় বাংলা’, ময়নাও বাসের ভেতর থেকে চিৎকার করে উঠলো জয় বাংলা। বাসের সব মানুষ ওর দেখা দেখি চেঁচিয়ে উঠলো ‘জয় বাংলা’। ও কনডাক্টরকে ডেকে বললো ওর পয়সা নেই। কনডাক্টর হেসে বললো, ঠিক আছে আপা, দ্যাশ স্বাধীন অইছে। হগগল কিছুই স্বাধীন। আমারে আরেক দিন দিয়া দিয়েন।
বাড়ির কাছে নেমে দৌড়ে গলিতে ঢুকে দেখলো দরজায় তালা। কিন্তু ঠেলতেই খুলে গেল। ভেতরে ঘন অন্ধকার, চারদিকে সব ছড়ানো ছিটানো। তবে কি ওরা আব্বা আম্মাকে মেরে ফেলেছে। এখন তো রাত। এতোক্ষণে মনে হলো ওর পরনে লুঙ্গী। দরজা বন্ধ করে আস্তে দরজাটা ভিড়িয়ে দিয়ে সামনে মেঝেতে শুয়ে পড়লো। সকালেই সে কাপড় বদলে সালাম চাচার দোকানে গেল। সালাম চাচা দোকান খুলেছে। তবে জিনিসপত্র নেই। ময়নাকে দেখে বললো, এসে গেছিস তোরা? কি চেহারা হয়েছে তোর। ময়না বললো, চাচা, আমাকে পাঁচটা টাকা দেবেন। আঝা এলে দিয়ে যাবো। নিয়ে যা, বাবা এলেই দেখা করতে বলিস। মাথা নেড়ে ময়না আরেকটু এগিয়ে গেল। ডালপুরীর দোকানও খুলেছে। চারটে ডালপুরী এনে বাড়িতে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলো। পানির একটা জগ আর গ্লাস ভালো করে ধুয়ে পেট ভরে পুরী চারটে খেয়ে প্রাণভরে পানি খেলো। বাবা-মার শোবার ঘরটা ঝেড়ে ঝুড়ে আলমারি খুলে পুরোনো ফেলে যাওয়া চাদর বের করে বিছানা করে ময়না ঘুমিয়ে পড়লো। দরজায় ধাক্কা ধাক্কিতে ঘুম ভেঙে গেল। দৌড়ে দরজার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো, কে? আরে আমি দরজা খোল। আব্বা দাঁড়িয়ে। ময়নাকে দেখে প্রথম দু’পা পিছিয়ে গেলেন তারপর ময়না বলে চিৎকার দিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরলেন। আব্বাকে ভেতরে টেনে এনে দরজা বন্ধ করে দিলো ময়না। ঘর দোরের অবস্থা দেখে চোখ মুছে বললেন, কোনো ভয় নেই, তুই ফিরে এসেছিস, খোকা খবর পাঠিয়েছে আবার সব হবে। তোর মুখ শুকনো কিছুই তো জানি না। ময়না সালাম চাচার কাছ থেকে যে টাকা এনেছে তা আব্বার হাতে দিয়ে সব ঘটনা বললো। মাথা নিচু করে বললো আমি যে এখানে একা এসেছি এ কথা তুমি বাড়িতে বলো না। বোলো আমি আগে তোমার সঙ্গে এসেছি, আম্মারা পরে আসবে। আব্বা বললো, তুই দরজা বন্ধ করে থাক। আমি দুটো লোক ডেকে আনি বাড়িঘর পরিষ্কার করার জন্য, আর আমাদের দু’জনের জন্য খাবারও নিয়ে আসি। বাবা বাও কিনে আনলেন। সন্ধ্যা নাগাদ সবকিছু এক রকম গোছানো হলো। আব্বা বললেন, তোর আম্মা আমার জন্য খুব চিন্তা করবেন। কারণ কথা ছিল বিকেলে ফিরে ওদের নিয়ে আসবো। কিন্তু তোকে একা রেখে যাবো না। কাল সকালে নাশতা খেয়ে চলে যাবো। দু’টা নাগাদ ফিরে আসবো! সকালটুকু একা থাকতে পারবি না মা? বাবার বুকের মধ্যে মুখ লুকিয়ে কেঁদে উঠলো ময়না। আব্বা মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে তার সবটুকু কষ্টই যেন নিজের বুকে টেনে নিলেন। রাতে ডালভাত আর আলুসেদ্ধ দিয়ে পরম পরিতৃপ্তির সঙ্গে খেলো দু’জনে। তারপর মায়ের আর তার ছোট বোন চায়নার গল্প শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়লো।
