চোখ খুলে দেখলাম আমি একটা ছোট ঘরে খাটে শুয়ে আছি। পাশে আরেকটা খাট একটু দূরে শাদা কাপড় পরা সম্ভবত পুরুষ নার্স, যাকে আমরা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বলতাম ব্রাদার, খুব নিবিষ্ট মনে কি যেন পড়ছে। মাথা কাত করতে গেলাম পারলাম না। অসহ্য যন্ত্রণা। অস্ফুট শব্দ শুনে লোকটি দৌড়ে আমার কাছে এলো, বললো, যাক আপনার জ্ঞান ফিরে এসেছে। অতি কষ্টে বললাম, আপনি বাঙালি, এখানে কেন? আমার মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ে বললেন, চুপ বাইরে সেন্ট্রি, দেওয়ালেরও কান আছে। আপনার বাঁ পায়ের দুটো হাড় ভেঙে গেছে, প্লাস্টার করা হয়েছে। তিন সপ্তাহ পর খোলা হবে। আস্তে করে বললাম, তাহলে আরও তিন সপ্তাহ আমাকে ওরা বাঁচিয়ে রাখবে। আমার মুখে হাত চেপে দিয়ে উনি দ্রুত গিয়ে নিজের জায়গায় বসলেন। আমি চোখ বুজলাম। কে যেন ঘরে ঢুকলো। জিজ্ঞেস করলো আমার জ্ঞান ফিরেছে কিনা। আশ্চর্য লোকটি কি মিথ্যা কথা বললো না। বললো, একটু আগে তাকিয়ে ছিল। হয়তো বা জ্ঞান ফিরেছে। কিন্তু আমি ওকে ডিসটার্ব করি নি। ভালো করেছে। ঠিক মতো অবজার্ভ করো। হেড ইনজুরি তো যে কোনও সময় খারাপ দিকে টার্ন নিতে পারে। চোখ বুজে ওদের সব কথা শুনছিলাম। আশ্চর্য হলাম ওরাই কি রাতে আমাদের ওই ঘরে যায়? মানুষ কি এক সঙ্গে দেবতা আর দানব হতে পারে। হয়তো পারে, জীবনে অনেক কিছুই তো জানতাম না। কিন্তু এখন জেনে লাভ! এ অভিজ্ঞতার সঞ্চয় নিয়ে আমি যাবো কোথায়?
পরদিন সকালে রোদে ঘর ভরে গেল। একজন মহিলা নার্স এলেন। আমার জ্ঞান ফিরেছে দেখে খুশি হলেন। ইনি অবশ্য অবাঙালি, উর্দু শুনে মনে হলো বিহারী। আমার মুখ পরিষ্কার করে আমাকে দুধে রুটি ভিজিয়ে খাওয়ালেন এবং পরে ওষুধ খাওয়ালেন। আমি উর্দু বলতে পারি না, তাই আমার ইংরেজির বিদ্যা দিয়ে ওকে জিজ্ঞেস করলাম আমার কি হয়েছে? আমার মুখে ইংরেজি শুনে নার্স তো গদগদ। বললো, বহিন, বেশি কথা বলো না। তোমার একটা পা ভেঙেছে। ওটা ঠিক হয়ে গেলেই তুমি আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারবে। অথবা নর্মাল লাইফ পাবে। হায়রে নর্মাল লাইফ! ডাক্তার একজন হলো কর্ণেল। খুবই ভদ্র এবং মৃদুভাষী। আমার সঙ্গে ইংরেজিতেই আলাপ করতেন। অসুখের বাইরে আর কোনও অতিরিক্ত কথা তিনি বলতেন না। একদিন ফাঁক পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন তুমি সেদিন অমন আচরণ করেছিলে কেন? আমি তার চোখে চোখ রেখে বললাম, ডাক্তার আমি মরতে চেয়েছিলাম। মুক্তি চেয়েছিলাম। ডাক্তার আমার মাথায় হাত রেখে বললেন, তুমি ভয় পেয়ো না। তোমরা মুক্তি পাবে। তোমরা শব্দটির উপর অতিরিক্ত জোর দিয়ে উচ্চারণ করলেন। ভয় হলো সম্ভবত আমার মুখ থেকে কিছু কথা বের করতে চান। কে জানে, ময়না এখন কাউকে বিশ্বাস করে না তবে একথা ঠিক একটা শয়তানের সঙ্গে এক একটা ভালো মানুষ সে দেখেছে। তবে ওদের বেশির ভাগই পাঠান অথবা সিন্ধি। পাঞ্জাবী ভদ্রলোক ওর চোখে পড়ে নি। অবশ্য অতো সুক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করবার মন মানসিকতা, পরিবেশ কি তার ছিল? হাসপাতালে থাকতে তার দরজা জানালা খোলা থাকতো। জানালার কাছেই একটা পেয়ারা গাছ ছিল, তার পাশেই নিমগাছ। নিমের পাতায় দোলা খেয়ে ঝিরঝিরে হাওয়া আসতো তার ঘরে। পাতার রঙ দেখে মনে হতো আগস্ট সেপ্টেম্বর মাস। লালচে হলুদ রঙ ধরেছে পাতাগুলোয়। পেয়ারা গাছে কাক শালিক অনেক পাখি বসতো। সারাদিন খুঁটে খুঁটে খেতো।
হঠাৎ করে পাশের বেডে একজন রোগী এলো। সে হেঁটে বেড়াতে পারে কিন্তু তাকে বিছানা থেকে নামতে দেওয়া হয় না। মেয়েটি আমার চেয়েও বয়সে ছোট। খুব বেশি হলে বছর ষোলো হবে। মুখখানা কনো ম্লান। আমার সঙ্গে কথা বলতে চাইতো কিন্তু নার্সদের ভয়ে দুজনই কাঠ হয়ে থাকতাম। একদিন মেয়েটাকে নিয়ে গেল। ডাক্তার আমাকে বললো ভালো চিকিৎসার জন্য ওকে ঢাকা পাঠানো হয়েছে। ভাবি ওর কতো সৌভাগ্য। তিনদিন এখানে থেকেই ঢাকা যেতে পারলো আর আমি তো প্রায় দু’মাস এখানে পড়ে আছি। সকাল বিকাল সিস্টারের হাত ধরে ধরে হাঁটি ওরা অবশ্য আশা করেন মাসখানেকের ভেতর আমি সম্পূর্ণ সুস্থ হবো পায়ের দিক দিয়ে। তারপর আমাকে ঢাকায় নেবে। সত্যি নিয়েও এলো। কিন্তু আসবার আগেই ওই ব্রাদারের কাছে শুনলাম ওই মেয়েটির টিবি হয়েছিল। তাই ওকে দূরে বিরান জায়গায় নিয়ে গুলী করে মেরে ফেলেছে। বললাম, তাহলে আমাকে মারছে না কেন? তুমি লেখাপড়া জানা মেয়ে তোমাকে ওরা অন্যভাবে ব্যবহার করবে বলে তোমাকে বাঁচাচ্ছে। আমার মুখ দিয়ে শুধু আল্লাহ’ আর্তনাদ বেরিয়ে এলো। বললাম, আপনি পালান না কেন? সে চেষ্টা করলে পেছন থেকে গুলি করবে। ওদের প্রয়োজন শেষ হলেই মেরে রেখে যাবে, আর তা না হলে মুক্তিবাহিনীর হাতে প্রাণ যাবে। বলেই ঝড়ের বেগে বেরিয়ে ব্রাদার দরজাতেই থেমে দাঁড়ালো। এর দিন পনেরো পর আমাকে ঢাকায় নিয়ে এলো চিকিৎসার জন্য। পা ভালো হয়ে গেছে। আমাকে নার্সদের কোয়ার্টারে রেখেছে। এতোদিনে আমার ডাক এলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে।
সকাল সাড়ে আটটা। এখানে এসেই শাড়ি ব্লাউজ পেয়েছি। নতুন পুরোনো জানি না তবে লজ্জা ডেকেছে। ডাক পড়লো। বিশাল বপু এক ভদ্রলোক কাঁধে বুকে সব নানা কিসিমের ক্লিপ আটকানো। মালায়কুম স্যার। মনে হলো নিজের গলার স্বর নিজেই শুনতে পেলাম না। তিনি মাথা নেড়ে আমাকে বসতে বললেন। জিজ্ঞেস করলেন ইংরেজি জানি কিনা। হঁ সূচক মাথা নাড়লাম। তারপর বললেন তোমাকে একটা খুব গোপনীয় কাজের দায়িত্ব দেবো। আমার এখানে কয়েকজন অফিসার আছে তাদের গতিবিধি লক্ষ্য করে তুমি আমাকে রিপোর্ট দেবে। আমি বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকলাম। বললাম, আপনি আমাকে বিশ্বাস করবেন কেন? আমি তোমার সম্পর্কে রিপোর্ট সংগ্রহ করেছি। সাহস করে বললাম, তাদের সম্পর্কে কি ধরনের অভিযোগ আনা যাবে? ও ভালো কথা মুখ্যত তারা স্থানীয় বেঈমানের সঙ্গে যোগাযোগ বা ওঠা বসা করে কিনা। করলে তাদের উদ্দেশ্য কি, আশা করি আমার কথাগুলো বুঝেছো। ঘাড় নেড়ে বললাম, ওই সব অফিসারদের লিস্ট আমাকে দিন। এবার চোখ ছোট করে বললেন, পরে দেওয়া হবে। তাহলে কাজও তো আমি তখন থেকেই আরম্ভ করবো। না কাজ আজ থেকেই শুরু করবে। তোমাকে বিস্তারিত জানানো হবে। এসো, আবার দেখা হবে। মনে হলো ঘর থেকে আমি হেঁটে এগুতে পারছি না। আমার সমস্ত শরীর যেন থর থর করে কাঁপছে। আমি বুঝলাম এ সব অর্থহীন কথা, আমার আরও কোনো বড় সর্বনাশ অপেক্ষা করে আছে। সেন্ট্রি দাঁড়িয়ে ছিলো। আমাকে যথাস্থানে পৌঁছে দিলো। ঘরে ঢুকে মনে হলো আমার মাথা ব্যথা করছে জ্বর আসছে একজন সিস্টারকে বলতে সে হাসপাতালে নিয়ে গেল। হ্যাঁ আমার জ্বর এসেছে, ডাক্তার মাথায় এক্সরে করতে বললেন। কিন্তু সব কিছু করে আমাকে আমার জায়গায় ফেরত দিয়ে গেল। সারাদিন শুধু ছটফট করলাম। রাত দশটায় আমার ডাক এলো। ওই বিশাল বপু হাসি মুখে আমাকে অভ্যর্থনা করলো। আমাকে ওর ভালো লেগেছে। সকালে যেসব আলাপ করেছে তা ভুলে যেতে হুকুম করলেন। তারপর দীর্ঘদিন পর আমি আবার পশুর ভোগে লাগলাম। কিন্তু লোকটাকে খুব স্বাভাবিক মনে হলো না। কেমন যেন বিব্রত, অন্যমনস্ক। হঠাৎ আমাকে একটা ধমক দিয়ে ঘর থেকে বের করে দিলো। ফিরবার সময় লক্ষ্য করলাম সবাই খুব সন্ত্রস্ত্র। কোথা থেকে যেন যন্ত্রণা সূচক চিৎকার আসছে। মনে হয় কাউকে মারধর করা হচ্ছে। পরে দেখেছি এসব টর্চার চেম্বার! কি বীভৎস আমারও তো ওখানে শেষ হবার কথা ছিল। চারিদিকে তখন কেমন যেন ফিস ফিস আর ব্যস্ততা।
