কিন্তু ভেবেছিলাম কি, আর হলো কি? ঢাকার ২৫শে মার্চের জুলুম আর অত্যাচার থেকে নারায়ণগঞ্জ দূরে রইলো না। এখানেও অত্যাচার প্রচণ্ড আঘাত করলো। বাড়িঘর ছেড়ে সবাই পালালো, আমরাও বাড়ি ছেড়ে গ্রামে গেলাম। কিন্তু মাসখানেক পরে বুঝলাম যে আগুন থেকে উত্তপ্ত কড়াইয়ে পড়েছি। এখানে মিলিটারি নেই, কিন্তু তাদের দেশীয় দোসররা সব রকম অপকর্মই করে চললো। বাড়িঘর জমি-জমা দখল করবার জন্য মিথ্যা নালিশ জানিয়ে থানা থেকে পুলিশ এনে পুরুদের ধরে নিলো, মেয়েদের প্রকাশ্যে লাঞ্ছিত করলো এবং সন্ধ্যার অন্ধকারে মুখ বেঁধে নিয়ে দিয়ে এলো সামরিক ঘাঁটিতে। এভাবে এই ময়নাও একদিন জালে ধরা পড়লো। বড় ভাই ও ছোট ভাই দু’জনেই পালিয়েছে। সম্ভবত ভারতেই চলে গেছে। বাবাকে থানায় নিয়ে খুব মার ধর করলো। খবর পেয়ে ছুটে গেলাম আমি ও মা। বাবাকে ছেড়ে দিলো, জামিন রাখলো আমাকে। পাকিস্তানিদের অত্যাচারের দরজায় যখন আমি উৎসর্গীত হলাম তখন আর অনাঘ্রাতা পুষ্প নই। রাজাকারের উচ্ছিষ্ট হয়ে গেছি। আমাকে গ্রামে রাখলো না, নিয়ে এলো নারায়ণগঞ্জে। খুব আশা ছিল নারায়ণগঞ্জ গেলে পালাতে পারবো। ওখানকার ফাঁক ফোকরও আমার চেনা। কিন্তু না, যে নারয়ণগঞ্জে আমি এলাম তা প্রায় জনমানব শূন্য বিরাণ পুরী। মিলিটারী জিপ ছাড়া অন্য কোনো গাড়ির আওয়াজ নেই। কদাচিৎ রিকশার টুং টাং শোনা যায়। আসলে যে জায়গাটায় আমাকে নিয়ে এলো আমি সাতদিন চেষ্টা করেও এলাকাটা চিনতে পারলাম না। তারপর একদিন সন্ধ্যায় আমাদের জিপে তুললো। এই প্রথম বার আমরা দু’জন ছিলাম ওখানে। আমাদের চোখ বেঁধে দিলো। বুঝলাম না কোন পথে চলেছি। তবে রাস্তার অবস্থায় মনে হলো ঢাকামুখী যাচ্ছি না, চলেছি অন্যত্র। ভোররাতে এক জায়গায় থামলাম। আমাদের নামিয়ে নেওয়া হলো। চোখের বাধন খুলে দিয়ে ধাক্কা দিয়ে একটা ঘরে ঢুকিয়ে দিলো। চোখ রগড়ে দেখলাম ঘরটা বেশ বড়। আকারে লম্বা। মনে হলো কোনও স্কুল। লাইন করে বেঞ্চ সাজিয়ে কম্বল পেতে বিছানায় শুয়ে আছে আরও কিছু মেয়ে, যারা আগেই এসে সিংহাসন দখল করেছে। একজনের কাছে গিয়ে ফিস ফিস করে জানতে চাইলাম ওটা কোন জায়গা? মেয়েটি খেঁকিয়ে উঠে বললো, চুপ থাক, গলার আওয়াজ শুনলে মেরে ফেলবে। ভয়ে কাঠ হয়ে গেলাম। মনে হলো ভোর হয়ে আসছে। ঘরের জানালা সব পেরেক ঠুকে কাঠ লাগিয়ে বন্ধ করা, তাই আলো অন্ধকার ঠিক বুঝতে পারলাম না। দরজাটা খোলা ছিল, এতোক্ষণে আলো ঢুকলো, জানালার ফাঁক ফোকর দিয়েও আলো দেখা দিল। খুব গরম লাগছিল। এর ভেতর মেয়েগুলো কেমন করে কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে ছিল তাই ভাবছিলাম। পরে নিজেও অমন থেকেছি। মার খাওয়া কুকুর যেমন ঘরের দরজায় মরার মতো পড়ে থাকে আবার মার খাবার জন্য, এরাও তাই।
সারারাত ওদের দেহ-মনের ওপর যে অত্যাচার চলেছে তাতে সোজা হয়ে বসবার ক্ষমতা আর থাকে না। সবগুলোরই প্রায় গায়ে জ্বর তাই কম্বল অত্যাবশ্যকীয়। আমার পরের অভিজ্ঞতা আমাকে এসব ব্যাখ্যা দিয়েছে। কিছুক্ষণ পর তাগড়া রাক্ষুসীর মতো একটা মেয়েলোক ঘরে ঢুকলো। সামনে কুচি দিয়ে শাড়ি পরা এবং সহজেই অনুমেয় জমাদারণী। দুদিকে দু’টো গোসলখানা দেখিয়ে দিয়ে বললো, যাও, মুখ হাত ধুয়ে আর সব কাজ সেরে এসো। নাশতা লাগাবে বাবুর্চি। সারারাতের ক্লান্তি। বাথরুমে ঢুকে একটাই শান্তি পেলাম যে বাথরুমটা পরিষ্কার। পরে হাসি পেলো, দেহটাই যার নরককুণ্ড তার আবার পরিষ্কার বাথরুম! স্নান করতে ইচ্ছে করছে কিন্তু শাড়ি ভেজালে পরবো কি? সমস্যার সমাধান হয়ে গেল। জমাদারণী এসে শাড়িটা নিয়ে গেল এবং ছোটোখাটো একটা লুঙ্গী আমাকে পরতে দিলো। চোখ গরম করে বললো, শব্দ করবি না, সেপাই ডাকবো। গোসলখানার দরজা বন্ধ করা নিষেধ। লজ্জা বিসর্জন দিয়ে গোসল করে লুঙ্গী গেঞ্জি (সেটাও এদের দান) পরে নতুন ময়না বেরিয়ে এলাম। এবার তাকিয়ে দেখলাম কাল আমরা যে ছ’জন এসেছি তাদের বাকি চারজন শাড়ি পরে বসে আছে, একজন গোসলখানায় আর বাকি দু’জন, হ্যাঁ, ছু’জন যারা তখন কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে ছিল তাদের সব লুঙ্গী আর গেঞ্জি পরা। লুঙ্গীর ভেতর রক্ত ময়লা সব জমে আছে। কারণ ওগুলো কেউ ধুয়ে দেয় না। নিজেরা ধুয়ে ভিজেটাই গায়ে শুকাতে হয়।
নাশতা নিয়ে এলো একজন ছোকরা, ওরা বললো, কুক। দু’পিস করে পাউরুটি আর আধা মগ চা নামের একটা পদার্থ। তাই সবাই কি আগ্রহ নিয়ে খাচ্ছে। সত্যি ক্ষিধেই তো সবচেয়ে বড় স্বাদ। দুপুরের রুটি আর ডাল এল। সন্ধ্যা হতেই ঘ্যাট আর একটা রুটি দিয়ে গেল এবং এবার দরজা বন্ধ হয়ে গেল। সারাদিন দরজাটা খোলা ছিল, গেটে দু’পাশে দুজন সেন্ট্রি। রাতে ঘরের বাতি জ্বলছে কিন্তু কারও মুখ দেখা যায় না। কারণ বুঝতে পারলো ময়না দু’এক দিনের ভেতরই। আপা, আপনারা ঢাকার পথে গণহত্যা দেখেছেন, জগন্নাথ হলে গণকবর দেখেছেন, কিন্তু আমার মতো হতভাগিনীরা দেখেছে গণধর্ষণ, প্রতি রাতে তিনজন চারজন করে একেক জন মেয়েকে ধর্ষণ করেছে। একজনের অপকীর্তি অন্যেরা উপভোগ করেছে। কুৎসিত অশ্লীল আলাপ করেছে। আমরা ভয়-শঙ্কা অনুভুতি শূন্য চোখে তাকিয়ে থেকেছি। শুধু নিজেদের হৃদয়ের স্পন্দন শুনেছি। টিপ টিপ শব্দ কানেও মনে হয় শুনেছি। কিন্তু আমি মরেও কেন মরছি না। সমস্ত পৃথিবীর ভালো মন্দ কোনও চিন্তাই আমার মাথায় নেই, শুধু এখান থেকে পালাবো কি করে! দিন পনেরো পর আমার মনে হলো আমার মাথা খারাপ হয়ে যাবে। রাতে স্বপ্ন দেখলাম বঙ্গবন্ধু ফাঁসির দড়িতে ঝুলছেন। নিজের গলায় হাত দিয়ে দেখলাম গলা অসম্ভব ব্যথা। বুঝতে পারছি না আমি কি সম্বিত হারাচ্ছি। বাবা-মাকে মনে করতে চেষ্টা করতাম কিন্তু পারতাম না। একদিন সকালে আমি বসে আছি। দরজার কাছে দিয়ে একটা লোক যাচ্ছে। তার কাঁধে একটা লাল গামছা অথবা ভোয়ালে আর মাথায় একটা সবুজ টুপি। হঠাৎ জ্ঞান হারা হয়ে জয় বাংলা’ চিৎকার করে ঘর থেকে ছুটে বেরুলাম। দু’চারটে গুলির শব্দও কানে শুনেছিলাম। হঠাৎ মনে হলো পায়ে লাঠির বাড়ি পড়লো, এর পরে মাথায় প্রচণ্ড আঘাতে আমি পড়ে গেলাম। আসলে আপা আমিতো মরতে চেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম যে কোনও একটা অপরাধে আমাকে গুলি করে মেরে ফেলবে, এ যন্ত্রণার দায় থেকে মুক্তি পাবো।
