হঠাৎ ডোর বেসটা বাজলো, চাচি যেন কার সঙ্গে কথা বলে বসতে বললেন। একটু পরেই পর্দা তুলে বললেন, ময়না তোর সঙ্গে কে যেন একজন মহিলা দেখা করতে এসেছেন। আলসেমী ভেঙে বসবার ঘরে ঢুকেই ময়না অবাক। আপা আপনি, আপনি কি করে এ বাড়ি চিনলেন? তার মানে? সারা দুনিয়া চষে বেড়াচ্ছি আর এতবড় বাড়িটা…! না না, তা বলছি না। ঠিকানা পেলেন কোথায়? কেন তুমিই তো একদিন দিয়েছিলে মনে নেই? চলুন আমরা ভেতরে গিয়ে বসি। চাচি কুণ্ঠিতভাবে বললেন, না না তোমরা এখানেই বসো। আমি চা পাঠিয়ে দিচ্ছি। আগন্তক এগিয়ে এসে চাচির হাত ধরে বললেন, কিছু লাগবে না চাচি আম্মা, আমি এক জায়গা থেকে দাওয়াত খেয়েই আসছি। যদি কিছুক্ষণ থাকি আর চা খাই তবে আপনার কাছ থেকে চেয়েই খাবো। মনে থাকে যেন মা, কাকে আর চা খাওয়াবো। তবুও তো এ মেয়েটা আছে তাই সারাদিনে দু’একবার মুখ খুলতে পারি। মহিলা অন্য দরজা দিয়ে ভেতরে গেলেন আর ওরাও বারান্দায় এলো। বাঃ। সুন্দর তো জায়গাটা। তোমার পছন্দ আছে ময়না পছন্দ না, এটা আমার পরম সৌভাগ্য আপা, যেমন আপনার মতো বোন পেয়েছিলাম জানি না কি সুকীর্তির ফলে। আর এই চাচা চাচিও আল্লাহর রহমত। বেতের চেয়ারটা আপাকে দিয়ে ময়না একটা মোড়া নিয়ে আপার কাছে কোল ঘেঁষে বসলো। হাত দু’খানা আপার কোলের ওপর তুলে দিয়ে মাখাটা নামিয়ে আনলো সেই হাতের ওপর। আপা আস্তে আস্তে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। তারপর বললেন, ময়না, আমি তোমার কাছে এলাম গল্প করতে আর তুমি বসলে কাঁদতে। এমন করলে আমি চলে যাবো। এক ঝাঁকুনি দিয়ে মাথাটা তুলে ময়না বললো, না না আপা আর কাঁদবো না, বিশ্বাস করুন আমি আর কারও সামনে চোখের পানি ফেলি না।
বুঝেছি সেই প্রথম থেকেই আপাকে পেয়েছো কান্নার খুঁটি হিসেবে। মনে আছে একদিন পাশের হোস্টেল থেকে তুমি আমাদের সমিতির অফিসে এসেছিলে ফোন করতে। আমাকে দেখতে পেয়ে দ্রুত সরে যাচ্ছিলে। আমি তোমাকে ডাকলাম, ময়না। তুমি অবাক হয়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলেছিলে আমার নাম আপনি জানলেন কি করে? ময়না অবাক হয়েছিল আমি ওর পরিচয় জানি দেখে। বলেছিলাম, জেরিনা, মিসেস জেরিনা আলিম, তোমার সব কথা আমাকে বলেছেন: ময়না দীর্ঘশ্বাস চেপে বললো, জেরিনা আপা তো নেই। আমি জানি, ও আমার ছোট বোনের চেয়েও বেশি ছিল। অতো বড় লোকের একমাত্র মেয়ে অমানুষ স্বামীর হাতে কি অত্যাচারই না সয়ে গেল। থাক ওর কথা আরেক দিন শুনো। তোমার কথা বলো। তোমার সময় আছে তো? সেদিন থেকেই তো আমরা বন্ধু হয়ে গেলাম, তাই না আপা? তাই একদিন আপনার ঘরে বসে বলেছিলাম, আপা আমি একজন বীরাঙ্গনা। কিন্তু আপনাদের দেওয়া পরিচয় অঙ্গের ভূষণ হয়েই রইলো, তাকে না পারলাম পরতে, না পারলাম ফেলতে। লোকচক্ষে হয়ে গেলাম বারাঙ্গনা। সত্যি মানুষ তাই ভাবে। দুর্দিনে কেউ পাশে এসে দাঁড়ালো না কিন্তু ধিক্কার দের বেলায় দিব্যি সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
আপা আমি বেশি দূরের নই, আপনাদের একেবারে কাছের মানুষ, প্রতিবেশী বলতে পারেন আমি নারায়ণগঞ্জের চাষাড়ার মেয়ে! ও পাড়ার দস্যি মেয়ে বলে সবাই আমাকে চিনতো। আমি মর্গান স্কুল থেকে মেট্রিক পাশ করে আইএতে ভর্তি হলাম। আমাদের প্রিন্সিপাল ছিলেন নারায়ণগঞ্জ কলেজের প্রিন্সিপাল যোগেন্দ্র বাবু। বাংলা পড়াতেন। এই ভিকারুন্নেসার প্রিন্সিপাল হামিদা আলী এঁরা সবাই আমাকে চিনতেন। আমি লেখাপড়ায় খুব একটা ভালো ছিলাম না। কিন্তু ওদের স্নেহ আর আদর অনেক পেয়েছি।
রাজনীতি করতাম, ছাত্রলীগের সদস্য ছিলাম। কলেজের ওই দল গঠন ও তার কাজ করতাম। কতোদিন সভা করতে সারোয়ার সাহেবদের বাড়িতে গেছি। এভাবেই দিন যাচ্ছিল। খেলাধুলায় আমার ছিল প্রচুর আগ্রহ। এজন্য ছেলেদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল একটু বেশি। আর সে কারণে অনেকে আমাকে খুব ভালো মেয়ে বলে মনে করতো না। অবশ্য তখন সমাজটা এরকমই ছিল।
’৬৯, ’৭০ চলে গেল উত্তাল গণ-আন্দোলনের স্রোতে। আইএ পাশ করলাম দ্বিতীয় বিভাগে। বাবা খুব অসন্তুষ্ট হলেন। বাবা ছিলেন হোমিওপ্যাথী চিকিৎসক। কোনও মতে মধ্যবিত্তের সংসার চলছিল। বড় ভাই বিএ পাশ করে ঢাকেশ্বরী কটন মিলে একটা মোটামুটি ভদ্রস্থ চাকুরি পেলো। পরিবার হাফ ছেড়ে বাচলো। তবুও আব্বা আম্মা ভেবেছিলেন আমি বিএটা ভালোভাবে পাশ করলে স্কুলে একটা চাকুরি পেলে হয়তো আমার বিয়ের জন্য তিনি সাহস করে এগুতে পারবেন। আমরা দু’ভাই, দু’বোন। ছোটভাই ম্যাট্রিক দেবে, বোন ক্লাস এইটে। মা সেলাই করে কিছু উপার্জন করতেন। মোটামুটিভাবে দারিদ্র ঠিক ছিল না। অবশ্য তাই বলে বিলাসী স্বচ্ছলতাও ছিল না। ধুমসে মিটিং মিছিল করে বেড়াচ্ছিলাম। শুরু হলো বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে অসহযোগ আন্দোলন। একেবারে ছাড়া গরু হয়ে গেলাম। মাথায় যত দুষ্ট বুদ্ধি শত্রুপক্ষ অর্থাৎ মুসলিম লীগের লোকদের পেছনে লাগাবার ফন্দি ফিকির করা, এভাবেই হাল্কা উচ্ছ্বাস আর আনন্দে সময় কেটে যাচ্ছিলো। রাজনৈতিক পরিণামের গুরুত্বটা ঠিক অনুধাবন করতে পারি নি। নির্বাচনের পর নিশ্চিন্ত হয়ে বলেছিলাম বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রী হবেন আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করবে, আমার যা হয় একটা গতি হয়ে যাবে। অন্তত হারুন ভাই এমএ পাশ করেছে ইকনমিকস এ ও একটা ভালোমত চাকুরি পেলে না হয় ওর গলাতেই ঝুলে পড়বো! এমনই একটা মোটামুটি হিসাব করে রেখেছিলাম।
