সারা পথ শেফা যেন মুক বধির একটা প্রাণীর মতো স্থানুবৎ বসে রইলো। ইমাম কি যেন বলছিল শেফার কানে গেল না। শুধু মনে হচ্ছে টেপরেকর্ডার যেন কানের কাছে বেজেই চলেছে যোগীর কণ্ঠস্বর নিয়ে, আম্মু আম্মু আম্মু। বাড়িতে এসে কুন্দকে বুকে নিয়ে উপুড় হয়ে পড়লো শেফা। তার সব ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে পড়েছে। আম্মা এসে দাঁড়ালেন, মাথায় হাত রেখে বললেন, শেফা স্থির হও। ছেলেকে মানুষ করতে হবে। ছেলে মানুষ করতে পারা যেমন গৌরবের অমানুষ হলে তেমনি লজ্জা ও কলঙ্কের। পর্দার ওপাশে ইমাম দাঁড়িয়ে, মনে হয় যেন আম্মা ওকেই ধিক্কার দিচ্ছেন। আম্মা বসলেন শেফার পাশে। বললেন, শেফা ভেবে দেখো আমান যেদিন আমেরিকা গেল আমার কেমন লেগেছিল। তোমার যোগী তো ছমাস বাদেই আসবে তোমার কাছে। তুমি ইচ্ছে করলেই ওকে দেখতে যেতে পারবে। কিন্তু আমার আমান, ওতো হারিয়ে গেছে আমি জানি। হয়তো দু’পাঁচ বছর পর সপ্তাহ দুয়েকের জন্য আসবে, আবার চলে যাবে। বিয়ে করেছে ওদেশী মেয়ে। আমাদের উপর তার তো আর টান থাকবার কথা নয়। ওঠো শেফা, আমাকে দেখো। সত্যিই শেফা উঠে বসলো। ধড়মড় করে বললো, আব্বার খাওয়া হয়েছে? না মা, তুমি বিছানা নিলে ও মানুষটা খায় কি করে! শেফা কুন্দকে শাশুড়ির কাছে দিয়ে একরকম দৌড়েই নিচে চলে গেল। একটি ক্ষুদ্র প্রাণীর অনুপস্থিতিতে বাড়িঘর কেমন যেন নিস্তব্ধ শান্ত হয়ে গেছে। অবশ্য কুন্দ এখন সারাবাড়ি ঘুর ঘুর করে বেড়ায়। দাদা-দাদিকে ডাকে।
মাসখানেকের ভেতর প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নিহত হলেন। এবার ইমাম একেবারেই ঘরে বন্দি হলো। আশ্চর্য! ওর আব্বা ভালো মন্দ কিছুই ওকে বললেন না। গতবার সঙ্গে করে অফিসে নিয়ে গিয়েছিলেন। শেফা বলতেই বললেন, ওর কোনও অভিভাবকের দরকার নেই। ও এখন বড় হয়েছে। একাই চলতে পারবে। তবুও বড় ছেলেকে ডেকে ওর দিকে একটু চোখ রাখতে বলেছেন। একেই বলে বাপের মন, মানতে চায় না।
সেই প্রথম জীবনের মতো ইমাম বই নিয়ে বসে থাকে, কি বই শেফা জানে না। আগে পলিটিক্যাল বই পড়তো। এখন পড়ে খ্রিলার। কুন্দকে নিয়ে কখনও কখনও বাইরে যায় কিন্তু শেফাকে অনুরোধ করে না। একদিন গিয়েছিল সংসদ ভবনের কাছে লেকের পাড়ে। বেশিক্ষণ বসলো না শেফা। সংসদ ভবন দেখলে ওর ভাঙ্গে লাগে না। ওর মনে হয় ওটা অভিশপ্ত। ওখানে কোনও নির্বাচিত সংসদ বসলো না। বঙ্গবন্ধু ভেবেছিলেন কি, আর হলো কি। শেফার কষ্ট হয়। সবাই তো দিব্যি খেয়ে হৈ চৈ করে বেড়াচ্ছে। ওই মানুষটার জন্য ওর বুকটা কেন এমন করে কাঁদে। সম্ভবত ওই মনটাও যে ওদের জন্য কেঁদেছিল। এ স্পর্শকাতরতা উভয়ের জন্যই বোধহয় সংক্রামকভাবে সংবেদনশীল।
দিন চলে যায়। শেফারও যায়। আমান বউকে তালাক দিয়ে আবার ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে এসেছে। কিন্তু ইমামের কাছ থেকে আগের মতো প্রশ্রয় না পাওয়ায় ভদ্র জীবন যাপন করছে। ফেরবার পথে লন্ডনে সোনালিদের কাছে এক সপ্তাহ ছিল। ওর একটা ফুটফুটে মেয়ে হয়েছে। এরা আর দেশে ফেরে নি। নাগরিকত্ব পেয়ে গেছে। দু’জনেই ভালো কাজ করছে। শুনে শেফার ভালো লাগলো। সেও চলে গেছে। গত বছর আব্বা আম্মা গিয়ে প্রায় ছ’মাস থেকে এসেছেন। শেফার এতে বড় তৃপ্তি, শেফা। বেঁচে আছে থাকবে। যাদের দুনিয়াতে এনেছে তাদের মানুষ করবার প্রতিশ্রুতি আছে নিজের অন্তরের কাছে। সে একজন মা এবং ব্যতিক্রমধর্মী মা, যে মেয়ের সব চেয়ে বড় পরিচয় সে বীরাঙ্গনা, শেফা দেশের জন্য তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ নারীত্ব বিসর্জন দিয়েছে। সে তো কোনও শহীদের চেয়ে কম ভাগ্যবান ও পুণ্যবান নয়। তারা প্রাণ দিয়েছে একবার, শেফা মান দিয়েছে বার বার। আজও তার স্বামী থেকে শুরু করে অনেকেই তাকে বাঁকা চোখে দেখেন। শেফা ওদের করুণা করে, কৃপা করে, সে এমনি বিজয়িনীর বেশে সংসার থেকে বিদায় নেবে। সেইদিন তার সাধনা সার্থক হবে যে-দিন সে তার যোগী, তার কুন্দর কাছে তার মূল্য তুলে ধরতে পারবে, এই তার একমাত্র ও শেষ প্রার্থনা আল্লাহর কাছে।
৫. ময়না
০৫.
রোদ মরে আসা শীতের বিকেল। ভেতরের বারান্দায় একখানা পত্রিকা হাতে নিয়ে বেতের চেয়ারে বসেছিল ময়না। একবার ভেবেছিল আজ শুক্রবার ছুটির দিন, একটু বাইরে যাবে। কিন্তু আলসেমি করে আর যাওয়া হলো না। ও একা বেশিক্ষণ চুপ করে বসে থাকতে পারে না। কষ্ট হয়। ওর অতীত ও বর্তমান দুদিক থেকে ওকে ক্ষতবিক্ষত করে। অনেকেরই পীড়াদায়ক যন্ত্রণাবিদ্ধ অতীত থাকে। এক সময় মানুষ। তার থেকে মুক্তি পায়। কিন্তু ময়নার ভাগ্যে সবই ব্যতিক্রম। এ জায়গাটা ওর ভালো লাগে। এই বিশাল ঢাকা শহরের ইট, কাঠ, লোহালক্কড়ের জঠরে নিশ্বাস ফেলবার মতো এই মৃদুমন্দ নির্মল হাওয়া তো বেহেশতী সৌভাগ্য। অনেক চেষ্টা করে বাসস্টপ থেকে সিকি মাইল দূরে এ ঘরটুকু সে পেয়েছে। সারাদিনের কর্মক্লান্তির পর এ ওর শান্তির স্বর্গ।
সবচেয়ে বড় মুস্কিল ছিল স্বামীহীনা কোনও মেয়েকে এ দেশের অতিমাত্রায় সৎ ও ধর্মভীরু বাড়িওয়ালারা বাসা ভাড়া দিতে চান না। অনেক হয়রানি সইতে হয়েছে। ময়নাকে। কিছুদিন হোস্টেলে ছিল। কিন্তু সুপার ম্যাডামের কৌতূহল তাকে টিকতে দিলো না অর্থাৎ তার নিজেরই সহ্যের সীমার বাইরে চলে গেল। প্রায় ছ’মাস চেষ্টা করে হঠাৎ তার সহকর্মী আসিফের দৌলতে এই জায়গাটুকু সে পেয়েছে। আসিফের চাচার বাড়ি এটা। তেতলা বড় বাড়ি। ওপরের দু’টো তালা ভাড়া দিয়েছেন। পাচ্ছেন বারো হাজার টাকা। আর এক তলায় তারা দু’জন অর্থাৎ স্বামী-স্ত্রী থাকেন। সেখানেই আসিফের চাচি তাকে দেখে কথা বলে তারপর রাজি হয়েছেন। ওঁর দু’ছেলে। একজন থাকে নিউইয়র্কে আর একজন ফিনল্যান্ডে। ৩৪ বছর বাদে সপ্তাহ দু’য়ের জন্যে আসে। সুতরাং নিচে যেমন খালি ঘর থাকাও নিরাপদ নয় তেমনি কথা বলার একটা মানুষ থাকলেও ভালো লাগে। তাই উভয় পক্ষই এ ব্যবস্থায় খুশি হলো। ময়না সাড়ে আটটার ভেতর বেরিয়ে যায়, ফিরতে ফিরতে সাতটা সাড়ে সাতটা হয়ে যায়। ছুটির দিনেও সে খুব একটা বাইরে যায় না। আজ ভেবেছিল যাবে, কিন্তু হয়ে উঠল না।
