কিছুক্ষণ পর শেফা সেই পরিচিত ভঙ্গীতে চা এনে ইমামের বেডসাইড টেবিল রাখলো। ইমাম চেষ্টা করে ভেবে দেখলো প্রায় দু’বছর পর শেফা তাকে চা দিলো। কি ব্যাপার? সে কি রিপ ভ্যানউইলকিলের মতো দু’বছর ঘুমিয়ে ছিল। ক্লান্তু স্বরে বললো, আমার কাছে একটু বসবে শেফা? শেফা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হেসে বললো, বসবো। এখন সকাল দশটা বাজে। আমার যে অনেক কাজ। জানো বোধ হয় যোগী কাল কার্সিয়াও চলে যাচ্ছে। শুনেছি, কিন্তু তোমরা তো কেউ আমাকে কিছু বলেনি শেফা? আমি ওর বাবা নই? শেফা হেসে বলে, সে কথা কি কেউ তোমাকে বলেছে? তোমার সময় কোথায়, এ সব ছোট খাটো কথা শোনার বলো? যে কাজের চাপ। আমরা তো চাপের নিচে অনেক দূরে তলিয়ে গেছি। বুঝলাম সব, কিন্তু কোনও দিন কি আমাকে এ সব কথা মনে করিয়ে দিয়েছো বলো, বলো শেফা। উত্তেজনায় ও শেফার হাত চেপে ধরে। শেফা এতোক্ষণে স্পষ্ট উচ্চারণ করলো, হাত ছাড় ইমাম। এ হাত অপবিত্র, ধরলে তোমার গুনাহ হবে। যা বলবার তুমি আমাকে বলেছো। এবার চুপ করে শুয়ে থাকো। আমার অনেক কাজ। যোগীর জিনিসপত্র ঠিক করবে। বাবার যাবার আয়োজন আছে। তাছাড়া উনি যোগীর জন্য বাচ্চাদের মতো খুব কাতর হয়ে পড়েছেন। আমার জন্য না হয় নাই হলো আব্বার কথা ভেবেও তো ওকে এখানে রাখতে পারতে, মনতির স্বরে বললো ইমাম। তুমি তো কিছুই জানো না, ওর যাবার সব ব্যবস্থা আব্বাই করিয়েছেন। আমার কোনও মতামত আছে কিনা জানতে চেয়েছেন অনেক পরে, সব ঠিক করে। তাহলে তখন বারণ করোনি কেন শেফা? ইমাম বলে উঠলো। পাগল, আব্বার চেয়ে আপনজন যোগীর আর কে আছে। তুমি তো তবুও ওকে টাকা দিয়ে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু আমার তো কোনও ক্ষমতাই নেই। তাছাড়া আব্বার ওপর আমার যেমন অগাধ বিশ্বাস, তেমনি অনন্ত নির্ভরতা। আচ্ছা, তুমি বিশ্রাম করো আমি কাজগুলো সেরে আসি। এসো কিন্তু শেফা, করুণ কান্নার মতো শোনালো ওর কণ্ঠস্বর। দ্রুতপায়ে শেফা বেরিয়ে গেল। তার গলায় কান্না জমে আছে। তরল হলে বিপদ। আল্লাহর এ দুনিয়ায় কি সবই সম্ভব? ইমাম আর কখনও তার কাছে আসবে সে ভাবে নি। আজ দু’বছর তার নিষ্ঠাবতী বিধবার জীবন চলছে। শ্বশুর-শাশুড়ি সবই বুঝতে পারেন কিন্তু এ নিয়ে দু’জনে ছেলেকে একটি কথাও কোনও দিন বলেন নি। শুধু শ্বশুর একদিন শাশুড়িকে বলেছিলেন, ছিঃ ছেলের কাছে মাথা নিচু করবে? কখনও না! ওকে চলতে দাও, হোঁচট খেলেই হুমড়ি খেয়ে এসে পড়বে। নিজের সম্মান নিজের কাছে রেখো, সে আমি থাকি আর নাই থাকি। শেফা দূর থেকে কথাগুলো শুনে অবাক হয়ে গেছে। এতোবড় মানুষটার বুকের ভেতর এতো গভীর বেদনা অথচ কতো সংযমী।
মনে হয় মুরুব্বিদের কথা মিথ্যা হয় না। ইমাম কোথাও হোঁচট খেয়েছে। বাড়িতে তো পার্টি ডিনার সব বন্ধ। কোথায় কি করে কি জানে? আজ হঠাৎ ছেলের চলে যাবার কথায় এমনভাবে ভেঙে পড়বে শেফার তা মনে হয় না। ব্যবসায় কোথাও কোনও গলদ বাধিয়েছে। শেফা এসব নিয়ে ভাবতে চায় না কিন্তু এখন না ভেবেও পারছে না। প্রতিপক্ষ সবল হলে তার সঙ্গে লড়াই করা যায়, কিন্তু দুর্বল হয়ে নতি স্বীকার করলে তো নিজের থেকেই পরাজয় মেনে নিতে হয়। অবশ্য এ সব টালবাহানা করে যোগীকে পাঠানো বন্ধ করতে শেফা দেবে না। তার ভবিষ্যতের পথ স্পষ্ট থাকা বাঞ্ছনীয়। তাছাড়া সামনে আছেন বড় ভাই, ধীর স্থির কর্তব্যপরায়ণ। অপুত্রক এ মানুষটি যোগীকে পুত্ৰতুল্য ভালোবাসেন।
কোথা দিয়ে যে দিনটা কেটে গেল শেফার সে জানে না। বুকে পাষাণ বেঁধে সে যোগীর যার আয়োজন করেছে। মাত্র নয় বছরের ছেলে। কোনও অসুবিধা দুঃখ অভাব কিছুই তো তার ছিল না। কিন্তু না, ধনলিন্দু, লম্পট পিতার আদর্শ সে ছেলের সামনে ধরবে না। দুপুরে এবং রাতে দু’বেলাই ইমাম খাবার টেবিলে ছেলের পাশে বসে খেলো এবং আব্বা আম্মার সঙ্গেও কিছু অনাবশ্যক কথা বললো।
সকালে আব্বা-আম্মা জানালেন তারা এয়ারপোর্টে যাবেন না। ভাইয়া যেদিন গরমের ছুটিতে আসবে সেদিন তারা আনতে যাবেন। যোগী কিন্তু বেশ খুশি। শুধু দাদা দাদির কাছ থেকে বিদায় নেবার সময় ওদের চুমোয় চুমোয় ভরে দিলো। তারপর কিছু না বলে এক দৌড়ে বড় চাচার গাড়িতে গিয়ে বসলো। ইমাম আর শেফা আব্বা আম্মাকে বলে তাদের গাড়িতে উঠলো। মনে হলো শেফার, তার সমস্ত ধনরত্ন বাক্স বন্দি করে সে নিয়ে চলেছে অজানা অচেনা জায়গায়-ঢেলে দিতে। কুন্দ বাড়িতে, দাদা-দাদির কাছে! ওকে নিয়ে এলে ভালো হতো, কিছুটা অন্যমনস্ক থাকা যেতো। এয়ারপোর্টের কাজ কর্ম সারা হলো। বড়ভাই শেফাকে বললেন, কোনও চিন্তা করো না, শেফা। আমি ওকে পৌঁছে দিয়ে দিন সাতেক হোটেলে থাকবো। ও সেটেল্ড হলে তারপর আসবো। ইমামের দিকে তাকিয়ে বললেন, বাবা হয়েছিস, একটু সামলে চলিস। মেয়েটাকে বুকে করে রাখিস। পৃথিবীতে যতো মানবিক সম্পর্ক আছে, বাবা আর মেয়ের চেয়ে মধুর আর কিছু নেই। আচ্ছা চলি, খোদা হাফেজ। যোগী দিব্যি টা টা বাই বাই করতে করতে ভেতরে ঢুকে গেল। ইমাম হাত বাড়িয়ে শেফার হাতটা ধরলো। ওর হাত বরফের মতো ঠাণ্ডা এবং মৃদু মৃদু কাঁপছে। ইমাম বললো, শেফা চলো। ওখানে গিয়ে চা খাই। গলাটা আমার শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে, প্লেন না ছাড়লে যাবো না। শেফা বোবার মতো ওর সঙ্গে সঙ্গে চলল। চায়ে চুমুক দেবার সঙ্গে সঙ্গে এ্যানাউন্সমেন্ট হলো। ওপরে জানালা থেকে দেখলে যোগী তার চাচার হাত ধরে বক বক করতে করতে প্লেনে উঠে গেল। উপরের দিকে হাত বাড়ালেন কারণ তিনি জানেন অন্তত এক জোড়া চোখ হৃদয়ের শেষ বিন্দু ভালোবাসা দিয়ে এ দিকে তাকিয়ে থাকবে। ওরা চলে গেল।
