পরদিন সকালে ইমামের চা নিয়ে সে গেল না তার বিছানায়। ডাকাডাকি করে ঘুমও ভাঙালো না। যোগীকে স্কুলে পাঠিয়ে কুন্দকে শাশুড়ির ঘরে আয়ার কাছে রেখে একটু বড় ভাশুরের কাছে গেল। ওঁরা দুজনেই একটু ব্যক্তিত্বসম্পন্ন গম্ভীর, কিন্তু স্নেহপ্রবণ। কোনও বুদ্ধি পরামর্শের প্রয়োজন হলেই সে বড় ভাইয়ের কাছে যায়। তারাও ওকে সাদরে গ্রহণ করেন। তাছাড়া এই যাতায়াতটাও ওর শ্বশুর শাশুড়ি খুব পছন্দ করেন। কারণ ইমাম আর আমান দুজনেই একে অন্যের-থেকে বেশ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। কারণ তিনি এসব ফটকা বাজারি ব্যবসা পছন্দ করেন না। ওরা ধানমস্তীতে থাকে। শ্বশুরের কাছ থেকে গাড়ি চেয়ে নিয়ে এলো। তিনি আজ সকালের দিকে বেরুলেন না। এই বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা তার মুখের দিকে চেয়ে কিছু যেন পড়তে চেষ্টা করলেন, গোলমাল কিছু একটা হয়েছে, বাবার থেকে মা তো বেশি বোঝেন, তাই দুঃখী মেয়েটার কষ্ট তাকে বিপর্যস্ত করে। শ্বশুর অতো চিন্তিত নন কারণ এ বয়সে সবাই একটু উজ্জ্বল হয়, তবে আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যায়। তিনিও বন্ধু বান্ধবের পাল্লায় পড়ে কম বদমায়েসী করেন নি। আবার সময় মতো নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন। নইলে আজ পথই সম্বল হতো। তবে জিনিসটা অতো সহজ নয় এ কথা তিনি বোঝেন। কারণ তিনি আর যাই করুন অসৎ ব্যবসায়ী ছিলেন না। কালো টাকাকে তিনি বরাবর ঘৃণা করেছেন। ভাওতাবাজির ধার কখনো পারেন নি। সত্যি তো, বৌমাতো ঠিকই বলে, বাড়িতে এতো সামরিক অফিসারের আজ্ঞা কিসের? আজ এদের জন্যেই তো কপালে তাদের এত দুঃখ! কি জানি শেষ বয়সে কপালে কি আছে।
নেহায়েৎ প্রয়োজন ছাড়া ইমাম ও শেফার কথাবার্তা বিশেষ হয় না। অফিসে যাবার আগে শেফা আসে, জামা কাপড় গুছিয়ে দিয়ে যায়। প্রয়োজনীয় কথা থাকলে দুজনেই সেরে নেয়। ইমামকে কেমন যেন অপরাধী মনে হয় শেফার। ওর দিকে চোখ তুলে তাকায় না পর্যন্ত। বাড়িতে খাওয়া এক রকম ছেড়েই দিয়েছে। মা একদিন বলেছিলেন, উত্তরে ইমাম বলে, একা খেতে ভালো লাগে না। তার থেকে হোটেলে সঙ্গী সাথী থাকে মা বলেন, বৌমাকে ডাকলেই পারিস। সন্ধের পর বাচ্চাদের দেখতে হয়। ওদের খাওয়ানো, ঘুম পাড়ানো… মাকে কথা শেষ করতে দেয় না ইমাম। মা না, ওকে বিরক্ত করে লাভ কি? আমারও দেরি হয়ে যায়, তাড়াতাড়ি ফিরতে পারি না। দুজনেই বুকে শ্বাস চেপে রেখে আলাদা হয়ে যান।
বড় ছেলে একদিন এলো। বাবার সঙ্গে গম্ভীর মুখে কি সব আলাপ আলোচনা করলো। জানিয়ে গেল আগামী মাসের দু’তারিখে আরমান কার্সিয়া যাচ্ছে। ও ওখানে ভর্তি হয়েছে। বড় চাচাই সব ব্যবস্থা করেছে। তার বক্তব্য, বংশের একটা মাত্র ছেলে তার মানুষ হওয়া দরকার। এ বাড়ির এ পরিবেশে তাকে মানুষ করা কঠিন। তিনি বুঝলেন, এ জন্যই শেফা ভাসুরের কাছে গিয়েছিল। মনে মনে মেয়েটার প্রশংসা করলেন।
মাস খানেক পর একদিন ইমাম অফিসে বেরুচ্ছে এমন সময় আরমান বললো, আব্বা আমি কাল চলে যাচ্ছি। কোথায়? বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল ইমাম। কেন তুমি জানো না আমি কার্সিয়া যাচ্ছি পড়তে। বোবা হয়ে যায় ইমাম। সে আজ পরিবার থেকে কতো দূরে চলে গেছে। ছেলে চলে যাচ্ছে পড়তে দেশের বাইরে আর সে খবর সে জানে না। ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে চোখের জল চেপে রেখে অনেক দিন পর বাবার ঘরে এলো। আব্বা যেন হঠাৎ করে বুড়ো হয়ে গেছেন। তেমনি সস্নেহ কণ্ঠে বললো, না, না তেমন কোনও কথা নয়। আরমান বললো ও নাকি কার্সিয়া পড়তে যাচ্ছে, সত্যি? হ্যাঁ, কেন তুমি জানো না? বিস্ময়ের সঙ্গে জবাব দিলন আব্বা, তারপর নিজ থেকেই বললেন, অবশ্য জানবেই-বা কি করে? তুমি তোমার উপার্জন আর নিজের ভোগ বিলাস ছাড়া আর কিছুই আজকাল জানো না। হ্যাঁ ওকে এ পরিবার থেকে দূরে রাখা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। বড় খোকাকে বলেছিলাম। সেইসব ব্যবস্থা করেছে। কাল সকালের ফ্লাইটে ওরা যাবে। পারলে এয়ারপোর্টে যেয়ো। শিশুর মনে পিতা সম্পর্কে শ্রদ্ধা থাকা উচিত। ইমাম অস্ফুটে বললো, থাকবো। শেফা কিছু বলে নি, প্রশ্ন করলো ইমাম। বৌমা, ওকে তুই আজও চিনলি না এটাই আমার দুঃখ। আমার কথার উপর কথা বলবে সে আসলে তার তাগিদেই ওকে পাঠানো। ভালোই হলো। কোনদিন আমি খাকি না থাকি তার ঠিক আছে। গার্জিয়ান ছাড়া ছেলে মানুষ করা যায় না। এখন আমি নিশ্চিন্ত। আমি না থাকলেও বড় খোকা ওকে মানুষ করতে পারবে, তোমার চিন্তার কিছু থাকবে না। মাথা নিচু করে ইমাম ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। অফিসে গেল না ইমাম, ঘরে ফিরে এলো। কিন্তু ভেতরে পা দিয়েই থমকে দাঁড়ালো, শেফা ঘর গোছাচ্ছে। ওকে দেখেই চলে যাচ্ছিল, ইমাম ডাকলো, শেফা। শেফা ঘুরে দাঁড়ালো। ইমামের মনে হলো শেফা যেন অনেক লম্বা হয়ে গেছে। মুখটা কেমন যেন রক্তশূন্য। চোয়াল দু’টো মনে হয় শৃক্ত। চোখ নামিয়ে নিলো ইমাম। শেফা স্বাভাবিক গলায় বললো, কিছু বলবে? অফিসে গেলে না? শরীর খারাপ নাকি? তার কণ্ঠস্বরে এতটুকু জড়তা নেই। অবাক হয়ে ইমাম ওর দিকে তাকিয়ে থাকে। একেই বলে ধরিত্রীর মতো সহনশীল। তার মনে পড়ে না শেফা কোনও দিন রাগ করে বা উঁচু গলায় তার সঙ্গে কথা বলেছে। অথচ শুনেছে সে সাংঘাতিক একরোখা জিদ্দি ছিল। তাহলে সে কি তাকে শুধু কৃতজ্ঞতা দেখিয়েছে, অন্তর থেকে ভালোবাসতে পারেনি? হঠাৎ কানে এলো, দাঁড়িয়ে রইলে কেন? ভালো না লাগলে জামা কাপড় বদলে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নাও। এক কাপ চা এনে দেবো? বিস্মিত ইমাম অস্ফুটে বললো, দাও। তারপর সত্যি সত্যি কাপড় জামা বদলে শুয়ে পড়লো।
