ইমামের অর্থের ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু হৃদয়ে কোনো চাপ সৃষ্টি হয় নি। তাই খুব তাড়াতাড়ি ওরা সামলে উঠে আবার খাওয়া দাওয়া গান বাজনায় মেতে উঠেছে। আমানের গান বাজনার সখ। মাঝে মাঝে বাড়িতে জলসা বসায়। তখন শেফার খুব ভালো লাগে। তবে ইদানিং দু’ভাইরই খাদ্যের থেকে পানীয়ের দিকে ঝোঁক বেড়েছে। বাড়িতে বেশ একটি বড়ো সড়ো বার কর্ণার করে ফেলেছে। প্রথম প্রথম দু’একবার শেফা আপত্তি করেছে। ইমাম বলে, তুমি তো উকিলের মেয়ে। ব্যবসায়ীদের এসব প্রয়োজন হয় পার্টির কাছ থেকে কাজ পাবার জন্য। ইদানিং বেশ কিছু আর্মি অফিসার আসে তাদের বাড়িতে। ওরাও নাকি ব্যবসা করে। চাকুরিতে থেকে মিলিটারী অফিসাররা কেমন করে ব্যবসা করে শেফা ভেবে পায় না। নিশ্চয়ই অসভাবে অর্থোপার্জন করে। ইমামদের সুবিধা করে দেয়, নিজেরা কমিশন পায়।
শেফার ভয় করে তার যোগী পবিত্র থাকবে তো? সেও কি পৈত্রিক ব্যবসায় নেমে এমনিই উশৃঙ্খল হয়ে যাবে? কাঞ্চন মূল্যে পৃথিবীকে বিচার করবে? ইমাম মাঝে মাঝে শেফাকে অনুযোগ করে সে এমন ঠাণ্ডা হয়ে গেল কেমন করে, মনে হয় তার কিছুই ভালো লাগে না। শেফা বলেছিল, তুমি ঠিক ধরেছো। আমার কেমন যেন ভয় ভয় করে, ভালো লাগে না। ইমাম হঠাৎ কেন জানি না রেগে গেল। সাধারণত সে শান্ত স্বভাবের। বললাে, তুমি সব সময় আমার আর্মির পার্টনারদের নিয়ে নানা কথা বলাে। এ তােমার কেমন স্বভাব। কোন দিন পাক আর্মি তােমার সঙ্গে কি ব্যবহার করেছিল তুমি সব সময় ওটাই মনে করবে। এরা বাঙালি, এদেশের ছেলে, বােঝ না কেন? শেফা উত্তর দেয় না। শুধু বলতে ইচ্ছে করে, যে ধর্মের যে জাতের হােক না কেন খাকি কাপড় গায়ে তুললেই মানুষের মনুষ্যত্ব বােধ কমে যায়। কারণ এদের ভেতর সবাই কিন্তু ভালাে মানুষ নয়। সে একজন যুবতী মহিলা। পুরুষের দৃষ্টির ভাষা সে পড়তে পারে। ওর ননদ আজকাল এলে সকালের দিকে আসে। বলে, তােমাদের বাড়ির সন্ধ্যার আড্ডা আমার ভালাে লাগে না ভাবি। দিন গড়ায়, শেফার কোলে একটি মেয়ে এসেছে । শেফা নাম রেখেছে, কুন্দ। অবশ্য আকিকায় একটা লম্বা চওড়া নাম রেখেছেন শ্বশুর। যােগীর এখন ছ’বছর, ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে স্কুলে যায়। শেফা চোখ মেলে তাকিয়ে থাকে আর মনে মনে বলে, যােগী তাের নামের মর্যাদাটা রাখিস বাবা। আমার জন্মের ঋণ যেন শােধ হয়।
ছােটভাই ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে একটা ফার্মে যােগ দিয়েছে। বিদেশে যাবার চেষ্টায় আছে। সােনালির স্বামী দায়িত্ব নিয়েছে। হয়েও যাবে, সময়ের অপেক্ষা। ও মাঝে মাঝে আসে। যােগীকে নিয়ে খুনসুটি করে। কুন্দকে নাচায়, গল্প সল্প করে খাওয়া দাওয়া করে চলে যায়। বাবা মার নিঃসঙ্গতার জন্য দু’জনেই দুঃখ করে। কিন্তু কিবা করতে পারে তারা। সেদিন কথা প্রসঙ্গে খুব সংকোচের সঙ্গে বললাে, আপা দুলাভাইকে তুই কিছু বলিস না? এতাে বেশি ড্রিঙ্ক করে যে লােকে নানা কথা বলে । তার চেয়েও বেশি স্ক্যান্ডাল আর্মির সঙ্গে এতাে দহরম মহরম কেন? এই আর্মিই আমাদের জীবনটা শেষ করতে বসেছিল । শেফা গম্ভীর হয়ে বললাে, সেন্টু যার যাতে ভালাে লাগে তাই ভালাে। সে যদি আর্মি নিয়ে নেচে সুখ পায় পাক। তবে এ নিয়ে আমি একদিন মৃদু আপত্তি করেছিলাম, বেশ ক্ষুন্ন হলাে। আমিও হাল ছেড়ে দিয়েছি। আমার কেন জানি না কিছু ভালাে লাগে না। মনে হয় কিছু একটা অঘটন ঘটবে। অঘটনের বাকি আছে কি? ১৯/২০টা কু্য হয়ে গেছে। কোন দিন সব শেষ হয়ে যাবে। তখন হয়ত একটা চরম অরাজকতা আসবে । দুলাভাই কি এসব বােঝে না? বুঝবে কেন? অর্থের মােহে অন্ধ হয়ে গেছে। তার টাকা চাই, আরও টাকা। বলে, শেফা মেয়ের বিয়ে দিতে হবে, ছেলে মানুষ করতে হবে, সােজা হয়ে হাঁটতে শিখলেই আমেরিকা পাঠাতে হবে। বলিস কি তুই? তার এতাে খরচ। ভাইয়ের মাথায় হাত রেখে হেসে ফেলে শেফা। কালচারাল বৈষম্য বড় সাংঘাতিক জিনিস ভাই ‘ এর সঙ্গে আপােস করা কঠিন, সত্যিই কঠিন।
ইমাম সেদিন ফিরলাে প্রায় সাড়ে বারােটায়। সেন্টুর কথাগুলাে এমনিতেই শেফাকে কিছুটা বিচলিত করেছে। মনে হল ছােট ভাই যেন কিছুটা অসম্মান করে গেল। রাতে মনে হলো ইমাম টলছে। শেফা বললো, বাড়িতে আব্বা-আম্মা আছেন আরেকটু সংযত হলে ভালো হয় না? নেশাগ্রস্তর মনে হয় জ্ঞান থাকে না। পরিবেশ থেকে অনেক নিচে নেমে যায়। শেফার মুখের কাছে এসে ইমাম বললো, সংযম দেখাচ্ছো। হ্যাঁ এ শিক্ষা তোমারই দেওয়া মানায়। সহস্র পুরুষকে দেই দান করে আমার চরিত্র সংশোধন করতে চাইছো? বাঃ বেশ বলে একটা হাততালি দিলো। শেফা ভয়ে দুঃখে যন্ত্রণায় পাশের ঘরে ঢুকলো। বেশ কিছু দিন হলো সে ছেলে মেয়ের সঙ্গে শোয়। তবে ইমাম এলে ওকে সেবা যত্ন করে খাইয়ে দাইয়ে ও শুতে যায়। আজকাল এর অতিরিক্ত কোনও চাহিদা ইমামের নেই। শেফা অবাক হলেও স্বস্তি বোধ করে। ভালোবাসাহীন দৈহিক মিলনে তার বড় ঘৃণা। তাই ইমামের অবহেলা বা ঔদাসীন্য তাকে বাঁচিয়ে দেয়।
কুন্দকে বুকে নিয়ে সে তার আনন্দের ভালোবাসার পৃথিবীকে আকর্ষণ করে। কি কথা আজ তাকে বললো ইমাম? জবরদস্তি অত্যাচারকে কি দেহদান করা বলে? এই দীর্ঘ ৭৮ বছরে ইমাম কোনওদিন অতীতের ওই সর্বনাশা দিনগুলোর কথা মুহূর্তের জন্যও উচ্চারণ করেন। এর মনটা ছিল মায়া মমতায় ভরা, বাপের মতোই প্রগতিশীল উদার। কিন্তু সে এমন নিচে নেমে গেল কি করে?
