শেফা এক পুত্রসন্তানের মা হলো। বাড়িতে সেকি আনন্দ উৎসব। বড় ভাশুরের দুই মেয়ে তাই এ উত্সব আরও জাকজমকপূর্ণ। খুব তাড়াতাড়িই আকিকার ব্যবস্থা হলো। তিন-চারশ লোক দাওয়াত করলেন শ্বশুর। নাম রাখলেন আরমান। শেফা কিন্তু মনে মনে ওকে আরেক নামে ডাকে আর সোচ্চারে বলে যোগী, কেউ জানে না এ নামের পরিচয়। শুধু শেফা এ নামটা তার হৃদয়ে রক্ত দিয়ে লিখে রেখেছে। শ্বাপদশঙ্কুল অরণ্যে শেফা সেদিন একজন দেবদূত প্রত্যক্ষ করেছিল তার নাম যোগীন্দর সিং, যে তার পবিত্র শিরস্ত্রাণ খুলে শেফার অপবিত্র দেহটাকে সযতে ঢেকে দিয়েছিল আর কয়েকবার তাকে মাতসম্বোধন করেছিল। তাই তো শেফা মনে মনে যোগীন্দকে তার প্রথম সন্তান ভাবে। চার-পাঁচ বছর হয়ে গেল কিন্তু তার মুখখানা শেফার স্মৃতিতে অম্লান। তাই তো আরমানকে যোগী ডেকে তাকে চুমুতে ভরে দেয়। মনে মনে বলে আল্লাহ্ যেন তেমনিই সারা জীবন মায়ের সম্মানের হেফাজত করে। শরতের নীল আকাশে শাদা পেঁজাতুলোর মতো হাল্কা ছন্দে ভেসে চলে শেফা, জীবনের এতো সুখ আছে তা কি কখনও সে ভাবতে পেরেছিল। আব্বা-আম্মা প্রায়ই আসেন। ইমাম সোনালির একটা বিয়ে ঠিক করেছে। ওর পরিচিত এক ব্যবসায়ীর ছেলে। ছেলেটা লেখাপড়ায় খুব ভালো। নিউক্লিয়ার ফিজিকস্ এ গবেষণার জন্য কমনওয়েলথ স্কলারশীপ পেয়েছে। সোনালিকেও নিয়ে যাবে, তাই আগামী মাসেই বিয়েটা হবে। তবে এবার আব্বা মেয়ে বিয়ে দেবেন তার নিজের জায়গায়। সামনে থাকবে বড় জামাই, সবাই দেখবে তার সৌভাগ্য। যারা একদিন টিটকারী দিয়েছিল, অজি তারা সালাম দেবে। রথের চাকা তো এমনি করেই একবার শূন্যে ওঠে একবার মাটি ছুঁয়ে। সত্যিই যাবার আগে বাবা জীবনে একটা পূর্ণতার স্বাদ পেয়ে গেলেন। ছেলেটা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে। ও বেরিয়ে এলে তার আর কোনও দায় দায়িত্ব থাকবে না।
বিয়ে হয়ে গেল! যতোটা আনন্দ সবাই প্রত্যাশা করেছিল সত্যিকার আনন্দ তাকে ছাড়িয়ে গেল! ইমামের বাবা মা ও ভাইয়েরা গিয়েছিল। আব্বা সবার জন্য হোটেল বুক করে রেখেছিলেন। তাই কারও কোনও কষ্ট হয় নি। তবে শেফা তার যোগীকে নিয়ে নিজের সেই পুরোনো শেফার ঘরেই রইল। এক সময় মেয়ে জামাই চলে গেল। ওরাও সবাই চলে এলো। সেই মেলা শেষের ভাঙা বাঁশি আর কলাপাতার মতো রইলেন শুধু আব্বা আর আম্মা। তারা যেন জীবনে পূর্ণতার স্বাদ পেয়েছেন।
হঠাৎ কি হলো বিনা মেঘে বজ্রপাত। বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হলেন। ইমামের পরিবার ঐ রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত। বঙ্গবন্ধুকে তারা মহামানব মনে করে। ওর বাবা একেবারে ভেঙে পড়লেন। শেফার ভয় হলো আরও কিছু হবে নাকি। ইমাম একদিন অফিস খেকে ফোন করলো পুলিশ তাকে নিয়ে যাচ্ছে। পাগলের মতো শ্বশুর বেরুলেন। সন্ধ্যা নাগাদ ছেলেকে জামিনে বের করে আনলেন। অভিযোগ রাজনৈতিক নয় ব্যবসায়ে অসাধুতা। এর চেয়ে বেশি শেফা জানে না, জানতে চায়ও না। সে যেন কুঁকড়ে ছোট হয়ে গেল। রাজনৈতিক কারণে ওর জেল হলেও শেফার দুঃখ ছিল না। কারণ আব্বাকে বেশ কয়েকবার বছর দু’বছরের জন্য জেলে থাকতে সে দেখেছে। সেটা সম্মানের, কিন্তু এটা? ইমাম বোঝালো আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা থাকবার জন্যই এই নাজেহাল হওয়া! তার আব্বা আছেন। শেফার আব্বাও কম যান না। নিজের বাবার নাম এ ক্ষেত্রে উচ্চারিত হওয়াটা শেফা ঠিক সহজভাবে গ্রহণ করতে পারলো না। তবে ইমামের মানসিক অবস্থার কথা ভেবে সে চুপ করেই রইল। কয়েক দিন ইমাম ঘর থেকেই বেরুলো না। শেষ পর্যন্ত শ্বশুর ছেলেকে সঙ্গে করেই অফিসে নিয়ে গেলেন। বড়ভাই কেমন আলগা হয়ে দূরে সরে গেলেন। শ্বশুর দুঃখ পেলেও কিছু বলতে পারলেন না, কারণ বছরখানেক আগে ভাইয়ের ব্যবসার রীতিনীতি সম্পর্কে বাবার কাছে কিছু অনুযোগ করেছিলেন। কিন্তু শ্বশুর তা কানে তোলেন নি। আজ শেফার মনে হলো ভাশুর অপেক্ষাকৃত সৎ, তা না হলে তিনিও তো ওই একই পিতার সন্তান। রাজনৈতিক কারণ হলে দু’জনকেই তারা ধরতো। দুর্বল মুহূর্তে শেফার মনে একটা ছোট্ট পিপড়ার কামড়ের মতো সন্দেহের কাটা বিধলো। সত্যিই তো, রাতারাতি ব্যবসায়ে এমন কি জোয়ার এলো যে অতো বড় আলিসান বাড়ি ইমাম করে ফেললো। না শেফা আর ভাবতে পারে না। যোগীকে নিয়েই তার দিন আর অর্ধেক রাত কেটে যায়। ইমাম আরও দেরি করে ফিরতে শুরু করলো! বলে পার্টিকে এন্টারটেইন করতে হয়। বাচ্চা নিয়ে কষ্ট হবে বলে আগের মতো বাড়িতে আর পার্টি দেয় না, হোটেলেই সারে। কিন্তু মাস ছয়েক কাটবার পর সে আবার বাড়িতে পার্টি দিতে শুরু করলো। শেফার সেজেগুজে গিয়ে দাঁড়াতে হয়। রিসিভ করতে হয়। খাওয়া দাওয়ার তদ্বির করতে হয়। যদিও তার মনটা পড়ে থাকে যোগীর বেবী কটের কাছে, সেখানে আজ তার জায়গায় আয় দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু এটুকু না করলে ইমামের মনটা ছোট হয়ে যায়। তাছাড়া আজকাল ওর কিছু কিছু ব্যবহার শেফার ভালো লাগে না। কিন্তু এ নিয়ে আপত্তি করতে তার মন চায় না। একেক সময় নিজের মনেই ভাবে, তার অনেক ত্রুটি ইমাম নিঃশব্দে গ্রহণ করেছে। সুতরাং তার দোষত্রুটি, সামান্য ব্যবহার নিয়ে নাই-বা অশান্তি করলো সে। এতো কিছু পেয়েও আজকাল নিজেকে মাঝে মাঝে বড় শূন্য মনে হয়। কেন এমন হয় জানে না। সে কি অতি লোভী? এতো কিছু পেয়েও তার ভোগ তৃষ্ণা মিটলো না? কে জানে কোথায় কি গরমিল যেন হয়ে গেছে। হয়তবা বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু তার ও তার পিতৃপরিবারে একটা প্রচণ্ড আঘাত দিয়েছে।
