ঢাকায় দেড় হাজার টাকা মাইনের স্টেনো-টাইপিস্টের চাকুরি পেলাম রেডক্রসে। আমার চেয়ারম্যান গাজী গোলাম মোস্তফা। মা ছাড়া কখনও আমাদের নাম ধরে ডাকে নি। ঠিক আব্বার মতো স্নেহ পেয়েছি সেখানে। ওই বাড়িটাতে অনেক অফিস ছিল। লিফটে ওঠানামার সময় অনেকের সঙ্গেই দেখা হতো। নিত্য দেখার পরিচয়ে কখনও-বা মৃদু হাসি বিনিময় বা আসোলামু আলাইকুম কিম্বা কেমন আছেন পর্যন্তও হতো। লম্বা সুঠাম দেহের অধিকারী এক ভদ্রলোকের সঙ্গে ধীরে ধীরে পরিচয় বাড়তে লাগলো। একদিন দুপুরে লাঞ্চে ডাকলেন পূর্বাণীতে। এর আগে ঢাকায় এতো বড় হোটেলে আমি কখনও খাই নি। নিজেকে বেশ অভিজাত বলে মনে হলো। ধীরেধীরে আমার সব কথাই ভদ্রলোককে বললাম। তিনি শুনে কষ্ট পেলেন। ভদ্রলোক ব্যবসায়ী। বাবা আছেন। আরও দু’ভাই আছেন। একজন ওর বড়, একজন ওর ছোট। বড় ভাইয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। তিনি ধানমন্ডিতে থাকেন। আর ওঁরা দু’ভাই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে আর একবোন বনানীতে বাবা-মার সঙ্গে থাকেন।
যুদ্ধের সময় তারা তিন ভাই’ই ভারতে চলে গিয়েছিলেন। ছোটভাই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। ওরা বিশেষ কিছু করেন নি। বাবা-মা এখানেই ছিলেন। কয়েকদিন গ্রামে গিয়েছিলেন। ওঁদের কোনো অসুবিধা হয় নি। ব্যবসা-বাণিজ্য সবই বন্ধ ছিল। এখন আবার নতুন করে শুরু করেছেন। তিনভাই ব্যবসায় অংশীদার, তবে পৃথক পৃথক কিছু ব্যক্তিগত ব্যবসা বড় দু’ভাইয়েরই আছে। সেদিন বড়দিন, হঠাৎ ভদ্রলোক, ধরুন ‘ইমাম’ আমাকে দাওয়াত দিলেন সন্ধ্যায় ইন্টারকন্টিনেন্টালে যেতে। আস্তে আস্তে আমার সাহস আর লোভ দুটোই বেড়ে গেছে। দাওয়াত খাওয়ার পর গল্প করতে করতে তিনি আমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন। লজ্জায়, ভয়ে আমি কুঁকড়ে গেলাম। বার বার প্রশ্ন করায় বললাম, আমার আব্বাকে বলুন। কারণ তার মতোই সবার উপরে। ইমাম বললেন, আগে তোমার মতটা বলো, বলো রাজি। ঘাড় নাড়তেই পকেট থেকে ছোট একটা আংটির বাক্স বের করে আমার হাতে ছোট্ট একটা ডায়মন্ড বসানো আংটি পরিয়ে দিলেন। বেইলী রোডের হোস্টেলে পৌঁছে দেবার সময় ওর উষ্ণ ওষ্ঠ আমার ঘাড় স্পর্শ করলো। আমি হাল্কা পালকের মতো উড়তে উড়তে হোস্টেলে ঢুকলাম। রুমমেট আগেই জানতো আমি কোথায় গেছি। হাতের আংটি দেখে বললো, নিশ্চয়ই সব সেরে এলি, আমাদের করবার জন্যে আর কিছুই রাখলি না। নে মিষ্টি খা। একখানা মিষ্টি দু’জনে ভাগাভাগি করে খেলাম।
আমার রুমমেটের নাম জয়া। ও হিন্দুর মেয়ে। বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া। ওরও একই অবস্থা। ওকেও বাংকার থেকে বের করে এনেছিল মুক্তিবাহিনী। কিন্তু বাড়ি গিয়ে দেখে সেখানে পড়ে আছে শুধু ছাই। ওদের মেরে বাড়িতে আগুন লাগিয়ে সব। পুড়িয়ে দেয় ওর মা আর দু’ভাই বেঁচেছিল। ওরা পরে ভারতে চলে গেছে। আর ফিরবে কিনা জানে না। তবে এখন জয়ার সঙ্গে পত্রালাপ হয়। সে তো জানে পারিবারিক জীবনে এ কতো বড় ক্ষত। জয়া বলে আমি জন্ম বিধবা হিসাবে জীবন কাটাবো। কারণ হিন্দু সমাজে আমি ব্যাভিচারিণী, তার উপর আবার মুসলমান দ্বারা ধর্ষিত। ও কিন্তু কথাগুলো বলে হেসে হেসে, মনে হয় যেন দু’চোখ উপচে পড়া জল ও হাসি দিয়ে আটকে রেখেছে। শেফার বুকটা কেঁপে ওঠে। ওদের যদি ও রকম সমাজ হত তাহলে ইমাম কি ওকে বিয়ের প্রস্তাব দিতে সাহস পেতো। সারাটা রাত শেফা ঘুমালো না। নানা রকম বিভীষিকাময় স্বপ্ন দেখলে। কেন এমন হলো। আব্বার চিঠি পেলো শেফা, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ছুটি নিয়ে বাড়ি যেতে লিখেছেন আব্বা। শেফার বুকটা কেঁপে উঠলো, কে জানে কোনও আশংকাজনক কিছু হলো নাতো। যে তার কপাল কিছুই বলা যায় না। সোনালি ওকে টেনে নিয়ে বললো, আপু। তোর বিয়ে। বাবার কাছে দুলাভাই প্রস্তাব নিয়ে এসেছিলো। বাবা রাজি হয়েছে। এখন তার সাথে নাকি কি সব কথা বাকি। তাহলেই আর দেরি করা হবে না। দুলাভাইয়ের বাবা ফোনে কথা বলেছেন আব্বার সঙ্গে। আব্বাকে ঢাকা যেতে বলেছেন।
বাবা শেফাকে পরিষ্কারভাবে সব জিজ্ঞেস করলেন। ইমামের চরিত্র সম্পর্কে শেফার কি ধারণা তাকে কতো দিন ধরে চেনে ইত্যাদি। সব শেষে জিজ্ঞেস করলেন সে ইদানিং ডাক্তার দেখিয়েছে কিনা, তার শরীর সুস্থ তো? শেফা ধীর স্থিরভাবে। আব্বার সকল প্রশ্নের উত্তর দিলো। মনে হয় আব্বা খুশি হলেন। বিয়ে ঠিক হলো। কিন্তু বিয়ে হবে ঢাকায় ভাড়া বাড়িতে। এ শহরে এখনও আৰু সাহস পান না। আব্বা মনে হয় নিঃস্ব হয়ে মেয়ের বিয়ে দিলেন। তাঁর রাজনৈতিক দলের অনেক গন্যমান্য বন্ধুরা এলেন। ইমামের আব্বা-আম্মা আত্মীয়-স্বজন সবাই এলেন। শেফা যা কখনও কল্পনাও করে নি। সেই সৌভাগ্যের ছোঁয়া সে পেলো। ইমাম তাকে স্নেহ, প্রেম, ভালোবাসা সবার উপরে সম্মান দিয়ে রেখেছে। ধর্ষিত শেফার সেটাই সব চেয়ে বড় আনন্দ। ছোট দেওর আমানও খুব হাসি খুশি। ভাবি ভাবি করে তাকে বিব্রত করে রাখে। বড় ভাশুর গম্ভীর মানুষ, জাও কথা কম বলেন। কিন্তু কারও আচরণেই তার কাছে কোনও অবহেলা বা ঘৃণার ছায়া দেখলেন না। শশুর তো মা মা বলে পাগল। এ সুখ কি সে কখনও কল্পনা করেছে। ননদ তো সর্বক্ষণ সঙ্গেই থাকে। ইমাম দ্রুত ব্যবসায়ে উন্নতি করতে লাগলো। অবশ্য পেছনে তার আব্বার সাহায্যও আছে। ও গুলশানে খুব সুবিধায় একটা জমি পেলো। তাই চট করে বাড়িও শুরু করলো। ইমামের আজকাল আসতে বেশ রাত হয়ে যায়। শেফা অনুযোগ করে তারও শরীর ভালো না। ইমাম অবশ্য ঠাণ্ডা মেজাজেই শেফাকে বোঝায় তার কাজ কতো বেড়েছে।
