দিন পনেরো পর ফিরে এলো ভাইয়া, যেন একটা বেবুন। মুখ ভর্তি দাড়ি, গোফ, মাথায় বড় চুল। কিছুতেই সে এগুলো ফেলছে না। বাবা নিজে সেলুনে গিয়ে ওকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে আনলেন। বললেন, দুঃখের দিন পার হয়ে গেছে। এবার মানুষের মতো বাঁচার সংগ্রাম করো। বইপত্র তো সব গেছে। যা পারো যোগাড় করে পড়াশুনায় মন দাও! শেফার জন্য কেউ মন খারাপ করো না। ও আমার মেয়ে, ওকে আমরা খুঁজে পাবোই। আমাদের ওপর আল্লাহর রহম আছে। এমন সময় নারী পুনর্বাসন কেন্দ্র থেকে আমার খবরসহ চিঠি এলো। আব্বার সে কি আনন্দ আর উত্তেজনা। যাবার আগে আমার পছন্দের মাছ পর্যন্ত মাকে কিনে দিয়ে গেলেন। ভাইয়া সঙ্গে যাবে জিদ ধরলো কিন্তু আব্বা নিলেন না। বললেন, মা বোনকে দেখো। বিপদ আমাদের এখনো কাটে নি। আব্বা চলে গেলেন। কিন্তু যখন একা ফিরে এলেন, আপা বিশ্বাস করবি না, রাত্রিতে মহরমের মাতম। বাবার মুখ থেকে কিছু শুনবার জন্যও আমরা অপেক্ষা করলাম না। ধরে নিলাম তুই-তুই মরে-হেসে বললাম, সোনা, আমি তো সত্যি অর্থেই মরে গেছি। ও লাফ দিয়ে উঠে আমার মুখ চেপে ধরলো তারপর আমার বুকে মাথা রেখে সে কি আর্তনাদ। মনে হলো এই দশ মাসের দুঃখ-কষ্ট-যন্ত্রণাই সব উজাড় করে ঢেলে দিলো। সকালে চোখে মুখে রোদ লাগায় উঠে বসলাম। সোনালি তখনও ঘুমুচ্ছে। চোখের কোণে তখনও এক ফোঁটা পানি জমে আছে। আস্তে আস্তে আমরা স্বাভাবিক হতে শুরু করলাম। একদিন ভাইয়াকে বললাম, কলেজে যাবো। ও বারণ করলো। বললো, আপু আরও কটা দিন যাক। তোকে কেউ যদি অপমান করে আমি তো খুনাখুনি করে ফেলবো। অপমান করবে কেন? কি করেছি আমি? আমার কণ্ঠে বিস্ময়। ভাইয়া উত্তর দিলো, কিছু করলে তো তোকে দোষ দেওয়া যেতো। আমরা তোদের রক্ষা প্রতে পারি নি সেই লজ্জা আর দুর্বলতাকে চাপা দেবার জন্য তোদের ওপর অত্যাচার করতে পারি। তুই বুঝিস না আপু। মুক্তিযুদ্ধ এতো রক্ত নিয়েছে। কিন্তু আমাদের নোংরা স্বভাবটা ধুয়ে মুছে দিতে পারে নি। যত্তোসব রাজাকারের বাচ্চা। তবুও সাহস করে গেলাম কলেজে। ছেলে মেয়ে অনেকেই দৌড়ে এলো, কোথায় ছিলাম, কেমন ছিলাম। এখানে সবাই বলছে তোকে পাকআর্মি ধরে নিয়ে গেছে। যাক বাবা বেঁচে গেছিস। আর্মি ধরলে কি হতো বলতে? সব শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। না, সত্যি কথা এদের সামনে বলা যাবে না। কিন্তু আমি এ মিথ্যার বোঝা কেমন করে বয়ে বেড়াবো? এ মুখোশ কি সারাজীবন মুখে এঁটে থাকবো? ভাবলাম, আমাদের ঘরে পরিবর্তন না হলেও আমাদের চার দেওয়ালের বাইরের জগতটা অনেক উল্টে-পাল্টে গেছে। না শেফা আর বাইরে যেতে চায় না। দেখা যাক ওরা কতো দিন এসব নিয়ে নোংরামি করতে পারে।
এর ভেতর একটা উত্তেজনাকর পরিস্থিতি এলো। ছোট চাচার শালীর বিয়ে। বিয়েতে সব আত্মীয়ই নিমন্ত্রিত হয়েছেন। কিন্তু আমরা হই নি। চাচার কানে কথাটা গেছে। চাচা এসে আম্মাকে জিজ্ঞেস করে গেলেন। তারপর কিছু না বলে চাচীকে তার বাপের বাড়ি থেকে নিয়ে গেছেন। এই বিয়েতে শুধু নিজে যান নি তাই নয়, চাচি ও তাঁর দু’ছেলে-মেয়েকেও যেতে দেন নি। চাচার শশুর এসে আব্বার কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন। মেয়ের বিয়ে নানাজনে নানা কানা ঘুষা করছিল বলে উনি আমাদের দাওয়াত দিতে সাহস পান নি। এজন্য চাচা নাকি ওকে যথেষ্ট অপমান করেছে। বাবা বললেন, শেফা ওর ভাইয়ের মেয়ে তার সম্পর্কে কুৎসা করলে ওর তো লাগবেই। কিন্তু আমার কাছে আগে আসেন নি কেন, তাহলে তো আপনার মেয়ের বিয়েতে যেতে পারতো। চাচার আরও রাগ ছিল। চাচা ইন্ডিয়া চলে গিয়েছিলেন। চাচি তার বাবার কাছে থাকতে চেয়েছিল, তার বাবা আশ্রয় দেন নি। চাচি শেষ পর্যন্ত মায়ের সঙ্গে খালার বাড়িতে ছিলেন। চাচা অসম্ভব পেয়ার। শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে আপাতত সম্পর্ক ছিন্ন করলেন। আমি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হলাম। বুঝলাম এমনি করে একটার পর একটা ঝড় ঝাপ্টা আসবে, আমার জন্য আব্বা যন্ত্রণাকাতর হবেন। তার চেয়ে আমি যদি ঢাকা গিয়ে একটা কাজ দেখে নিই তাহলে বিএ পরীক্ষাটাও দেওয়া হয়ে যাবে, কিছুদিনের জন্য আব্বাও একটু স্বস্তিবোধ করবেন।
চিঠি লিখলাম মোশফেকা আপার কাছে, আমি গেলে আমার চাকুরিটা পাবো কিনা। উনি উৎসাহ দিয়ে লিখলেন চাকুরি আরও খালি আছে। আমি বিনা দ্বিধায় ঢাকা আসতে পারি। আমি সব সংকোচ বিসর্জন দিয়ে আব্বার সঙ্গে সরাসরি কথা বললাম। সব ব্যাপারে বুঝিয়ে বললাম। আব্বা কোনও প্রতিবাদ করলেন না। এর ভেতর আব্বা আরেকটা আঘাত পেলেন। আব্বা এক বন্ধু এমপি’র কাছে ফারুকের ও তার বাবার অপকীর্তির কথা জানিয়ে কিছু প্রতিকার প্রত্যাশা করেছিলেন। কিন্তু এমপি সাহেব অপারগ, কারণ ফারুকরা একজন বড় নেতার আত্মীয় তাই ওরা ধরা ছোঁয়ার বাইরে। আব্বা এই প্রথম দুঃখ প্রকাশ করে বললেন, শেফার মা, এ বয়সে যুদ্ধে গিয়েছিলাম কেন? এই দেখে ক্রল করে করে আমার কনুইতে কেমন ছাল উঠে চামড়া শক্ত হয়ে গেছে। আমরা সবাই কেঁপে উঠলাম। আব্বা তাহলে অস্ত্রহাতে যুদ্ধ করে এসেছেন? আজ তিনিও এত অসহায়! ঠিক করলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের কাছে যাবেন। কিন্তু আম্মা বাধা দিলেন। বললেন, তার মাথায় রাজ্যের বোঝা, কি হবে আমাদের দুঃখের কথা তাঁকে জানিয়ে? আব্বা বললেন, তাঁকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি। তিনি এর একটা বিহিত করবেনই। আব্বা নাছোড়বান্দা। গেলেন এবং ফারুকের বাবার ডিমোশন করিয়ে এলেন। আব্বার সেকি আনন্দ। মনে হলো এতোদিনে তিনি যুদ্ধ জয় করে এলেন। আমার কেন জানি না একটা তৃপ্তি এলো।, বিচার আছে। স্বাধীন বাংলায় মানুষ বিচার পাবে। তবুও আমি চলে গেলাম।
