শেফাদের বাড়ির কাছে একটা টাইপ শিখবার স্কুল ছিল। ম্যাট্রিক পরীক্ষার পর কোনও কাজ হাতে ছিল না, শেফা ভর্তি হয়ে গেল ওখানে। ফলাফল বেরুবার পরও কলেজে ভর্তি হওয়া, ক্লাশ শুরু করতে আরও মাস তিনেক গেল। দু’মাস একটানা সেখানে নিয়মিত টাইপ শিখেছে। পরে সে আব্বাকে সার্ভিস দিতে এবং দু’দশ টাকা রোজগারও করতো। আব্বাকে অনেক আর্জি লিখতে হতো, বাইরে থেকে ভুল ভালো টাইপ করিয়ে আনতো বাবার কেরানী। বাবা রেগে যেতেন। পরে এ কাজটা শেফাই করতো।
তেমনি এখনও হাতে কোনো কাজ নেই। ওসব সেলাই এমব্রয়ডারী শিখতে ওর ভালো লাগে না। একদিন ও চুপি চুপি চেয়ারম্যান সাহেবের ঘরে ঢুকলো। কতোদিন ভেবেছে মোশফেকা আপাকে বলবে, কিন্ত্র ওকে তার বড় ভয়। উনি কখনও তাদের সঙ্গে গায়ে পড়ে কথা বলেন না। অথচ বাসন্তী আপা, পরে জেনেছি উনি শহীদ ডঃ জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতার স্ত্রী, একটা স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা, নীলিমা আপা প্রায়ই এসে আমাদের সঙ্গে নানা গল্প করতেন। বাবা-মার কথা, নিজেদের এলাকার কথা, ভবিষাতে কি করতে চাই এসব কথা, কিন্তু দুজনেই ভুলেও কখনও আমাদের দুঃখ আর নির্যাতনময় জীবনটার কথা তুলতেন না। তবুও আমি নীলিমা আপার কাছে অনেক কথা বলেছিলাম। এমনকি ফারুক ও তার বাবার পরিচয়ও দিয়েছিলাম। কিন্তু উনি চেষ্টা করেও কিছু করতে পারে নি। ফারুকরা নাকি একজন ক্ষমতাশালী মন্ত্রীর আত্মীয়। তবুও সান্ত্বনা দিতেন, মন খারাপ করো না। আজ না হোক কাল ওর বিধান হবে। আল্লাহ এতো নিষ্ঠুর নন!
চেয়ারম্যান সাহেবকে সালাম দিয়ে দাঁড়াতেই উনি খুব মিষ্টিভাবে বললেন, কি চাও? আমাকে কিছু বলবে? মাথা নেড়ে বললাম, হ্যাঁ। বললেন, বলো। বললাম, মার আমি মোটামুটি টাইপ জানি। আপনার এখানে কাজ করতে চাই। আমার বসে থাকতে ভালো লাগে না। উনি আমার নাম জিজ্ঞেস করলেন। কতোদূর পড়াশুনা করেছি ইত্যাদি বলে মোশফেকা আপাকে ডেকে পাঠালেন। মোশফেকা আপা খুশি হয়ে বললেন, স্যার কাজ দিয়ে দেখি কেমন করে, তারপর বেতন… আমি কথা শেষ করতে দিলাম না। বললাম, না। আমি বেতন চাই না। দুজনেই হাসলেন। চেয়ারম্যান সাহেব শুনেছি হাইকোর্টের একজন জজ। পরে অবশ্য নাম জেনেছি। বিচারপতি কাজী সোবহান।
পরদিন সকাল আটটা থেকে আমার কাজ শুরু হয়ে গেল। কাজ দেখে দু’জনেই খুশি। মাঝে মাঝে বাসন্তী আপা আমার মেশিনটীয় বসতেন। ওঁর স্পিড খুব ভালো ছিল। আমাকে এটা ওটা নির্দেশ দিতেন। আমার সময়টা খুব ভালো যাচ্ছিলো। মনে হতো আমি কলেজেই আছি। অতীত যেন একটা সাময়িক দুঃস্বপ্ন। হঠাৎ একদিন ডাক্তার বললেন আমি সম্পূর্ণ সুস্থ। আমি বাড়ি ফিরে যেতে পারি। অফিস থেকে বাবাকে চিঠি লিখেছিলাম। তৃতীয় দিনেই বাবা এসে হাজির। কর্তৃপক্ষের সঙ্গে, ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে আমাকে নিয়ে এলেন একটা বেবীট্যাক্সিতে। প্রথম ধাক্কা খেলাম ওখানেই। বেবীট্যাক্সিওয়ালা বছর ত্রিশের এক যুবক। আব্বাকে জিজ্ঞেস করলো, স্যার আপনের মাইয়া? অন্যমনস্কভাবে সংক্ষিপ্ত জবাবে বললেন, হুঁ। তারপরই এলো একেবারে বিকট বোমা। ও বীরাঙ্গনা বুঝি। আঃ হাঃ হালারা এক্কেরে জানোয়ার। কি যে কইরা গেছে। ও বলে চললো আমি আর আব্বা পাথরের মূর্তির মতো বসে রইলাম। সম্ভবত বেবীওয়ালা ও পাড়ায় পরিচিত এবং ও বাড়িতে কারা থাকে জানে। সোজা কমলাপুর স্টেশনে। তারপর ট্রেনে। এতোক্ষণ আব্বা কোনও কথা বলেন নি। ট্রেন ছাড়লে যেন তার মোহগ্রস্ত ভাবটা কাটলো। বললেন, আহা, খেয়ালই ছিল না, তোর নিশ্চয়ই খুব খিদে লেগেছে। দেখি পরের স্টেশনেই তোকে কিছু কিনে দেবো। আমি না বলে মাথা ঝাঁকাতেই কেঁদে ফেললাম। আব্বা আমার মাথাটা বুকের ভেতর নিয়ে মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বিড় বিড় করে কি যেন বললেন। মনে হলো ক্রমাগত বলছেন, ওটা একটা দুঃস্বপ্ন। কিছু হয় নি, সব ঠিক হয়ে যাবে। বিকেল নাগাদ আমরা বাড়ি পৌঁছোলাম। সোনালি দৌড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো। ভাইয়া এগিয়ে এসে আমার হাতটা খুব শক্ত করে ধরলো। বললো, আপা কিছু ভাবিস না। আমি এখন বড়ো হয়ে গেছি, কোনও চিন্তা করিস না। হেসে বললাম, তোর হাতটা কিন্তু খুব শক্ত হয়ে গেছে। ও শিশুর মতো জোরে হেসে উঠলো। আরে একি যে সে হাত, স্টেনগান ধরা হাত! মুক্তিযোদ্ধার হাত। হঠাৎ গম্ভীর হয়ে বললো, অবশ্য আমার গৌরব করবার মতো কিছু নেই। নিজের বোনকেই হায়েনাদের হাত থেকে বাঁচাতে পারি নি। আমি হাত দিয়ে ওর মুখ চেপে ধরলাম। দেখলাম পুরোনো কাজের লোক দু’জন নেই! সম্ভবত আমার কারণেই ওদের বিদায় করে দেওয়া হয়েছে। আমি কাপড় জামা ছাড়িতে গিয়ে দেখি এ দশ মাসে সোনালি অনেক বড় হয়ে গেছে। সুন্দর করে, যেমন আমি করতাম ঘর গুছিয়ে রেখেছে, এমনকি আমি এসেই পরবো ভেবে ওর পছন্দ করা শাড়ি, ব্লাউজও বের করে রেখেছে। ও অবশ্য এখনও শাড়ি পরে না। তবে সালোয়ার কামিজ দেখলাম না, পরে আছে স্কার্ট, ব্লাউজ। ওর ছোট মনের প্রতিরোধের বহিঃপ্রকাশ সম্ভবত এই বেশ পরিবর্তন।
খাবার গুছিয়ে মা তাকালেন। কতোদিন, কতোদিন পর আবার ওরা একসঙ্গে খেতে বসেছে। মা এটা ওটা শেফার পাতে তুলে দিচ্ছেন। শেফা হেসে বললো, আমি কি মেহমান নাকি? এমন করে আমাকে তুলে দিচ্ছ কেন? মা হঠাৎ মুখে আঁচল তুলে দিয়ে শোবার ঘরে ঢুকলেন। সবার হাত থেমে গেল। আব্বা হেসে বললেন, সব ঠিক হয়ে যাবে, দু’চার দিন একটু কষ্টতো সবারই হবে। একটা বড় অসুখ থেকে উঠলেও তো পরিবারে একটা বিপর্যয় আসে, আসে না? এবার সোনালি ফোড়ন কাটে। চিৎকার করে বলে, আম্মা আমরা টেবিল ছেড়ে চলে যাচ্ছি। তোমার সব খাবার পড়ে রইলো। সোনালি বেশ পাকা হয়ে উঠেছে। ওর ধমকে কাজ হলো। মা মুখ মুছে নিজের জায়গায় বসলেন। হাসি গল্পে খাওয়া শেষ হলো। মনে হলো যেন ঈদের সকাল। রাতে শুয়ে শুয়ে দু’জনে কত গল্প। শেফাকে না দেখে মা নাকি বিশেষ চিন্তিত হন নি। সোনালিকে বলেছিলো দেখিস, আমরা বাড়ি পৌঁছোবার পর ওরা এসে হাজির হবে। চারদিকের গোলমাল দেখে ফারুক ভয় পেয়েছে। ও সম্ভবত কাজী অফিসে গেছে। শেফাকে বিয়ে করেই ফিরবে। ওর বাবা যে মেজাজী, জানতে পারলে ছেলেকে আস্ত রাখবে না। কিন্তু রাত গেল দিন এলো, দিনের পর দিন গেল। মা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হলেন। আব্বা চলে যাবার জন্য খবর পাঠালেন কিন্তু তোমাকে ফেলে আমরা যাবো কি করে? আব্বাকেই-বা মা কি জবাব দেবেন। বাড়ির লোকদের বলেছেন সামনে ওর পরীক্ষা তাই আব্বার এক বন্ধুর বাড়িতে ওকে রেখে এসেছেন। কিন্তু দুঃসংবাদ চাপা থাকে না। গ্রামে খবর পৌঁছোলো শেফাকে পাকিস্তানিরা ধরে নিয়ে গেছে। মা শেষ পর্যন্ত ছোট খালার শ্বশুর বাড়ি গেলেন। ভাইয়ারও কোন খবর নেই। শেফাকে ওরা নিশ্চয়ই মেরে ফেলেছে। শুধু আব্বা ভালো আছেন। এটুকুই আমার সান্ত্বনা ছিল। তবে মা যতোটা ভেঙে পড়বেন ভেবেছিলাম, মা কিন্তু পরিস্থিতির মুখোমুখি হলেন বেশ শক্তভাবেই। কখনও কাঁদতেন না, আর আমার নাম ভুলেও উচ্চারণ করতেন না। কথা বলাই কমিয়ে দিয়েছিলেন। সকালে অনেকক্ষণ কোরান তেলাওয়াত করতেন। নফল নামাজও বেড়ে গেল। মনে হতো আম্মা সব আশা ছেড়ে দিয়ে আল্লাহকে দু’হাত বাড়িয়ে আঁকড়ে ধরেছেন। এমনিভাবেই দীর্ঘ ন’মাস কেটে গেল। যুদ্ধ শেষ হলো। আব্বা ফিরে এলেন খুশি মনে, দেশ স্বাধীন হয়েছে। ভাইয়ার সঙ্গে ওখানেই দেখা হয়েছিল! ছেলে মুক্তিযোদ্ধা এটাও তার একটা বড় গর্ব। ফিরে এসে আম্মাকে দেখেই আব্বা আঘাত পেলেন। একি শেফার আম্মা, কি হয়েছে তোমার? অসুখ-বিসুখ করেছিল নাকি? তারপর মা চোখের জলে আব্বাকে সব বললেন। কিছুক্ষণ কঠিন শিলার মতো স্তব্ধ হয়ে রইলেন। তারপর গা ঝাড়া দিয়ে উঠে বললেন, চলো, আজই বাড়ি ফিরে যাবো। আমরা শহরের বাড়িতে ফিরে এসে দেখি বাড়ির জানালা দরজা ছাড়া আর কিছু নেই। ফার্নিচার, বইপত্র এমন কি ইলেকট্রিকের তারগুলোও পর্যন্ত খুলে নিয়ে গেছে দস্যুরা। না পাকিস্তানিরা এসব করে নি, করেছে পাড়ার লোকেরা। কেউ কেউ ভালো মানুষ হয়ে এটা ওটা, যেমন টেলিফোনটা ফেরত দিয়ে গেলেন। আব্বাকে বললেন, লুটপাট দেখে আমি এটাকে যত্ন করে রেখে দিয়েছিলাম। ভাইয়া তখনও এসে পৌঁছোয়নি। কিন্তু আব্বার শরীরে যেন হাতির বল এলো! লোকদের ডেকে ‘২/৩ দিনের ভেতর মোটামুটি বাড়ি বাসযোগ্য হলো। আব্বা আম্মাকে বললেন, এবার তোমরা নিরাপদে থাকো আমি শেফার খোঁজে ঢাকায় যাবো। কিন্তু ভাইয়া না ফেরা পর্যন্ত আম্মা আব্বাকে আটকে রাখলেন তার মুখে একটাই কথা, যা হবার তাতো হয়েছে। মেয়ে যদি বেঁচে থাকে ফিরে পাবো। কিন্তু তোমাকে হারাতে পারবো না।
