বুঝতে পারে শেফা, কিছু একটা ঘনিয়ে আসছে। হঠাৎ মনে হলো দূর থেকে তার সেই চিরকাঙ্ক্ষিত ধ্বনি, ‘জয় বাংলা’ শুনতে পাচ্ছে। বিশ্বাস হয় না শেফার। আগেও কয়েকবার এমন ধ্বনি তার কানে এসেছে। কিন্তু পরে দেখেছে ওটা মনের ভ্রান্তি। কিন্তু কি হচ্ছে, দুপদাপ শব্দে কারা যেন দৌড়োচ্ছে। তবে কি পাকিস্তানিরা পালাচ্ছে। বাংকারের মুখ দিয়ে এখন যথেষ্ট আলো আসছে। জয় বাংলা’ ধ্বনি আরও জোরদার হচ্ছে। শেফার মনে হলো সান্টু তাকে নিতে আসছে। কিন্তু বাংকারের মুখের কাছে যাবে কি করে। ওরা যে উলঙ্গ।
হঠাৎ অনেক লোকের আনাগোনা, চেঁচামেচি কানে এলো। একজন বাংকারের মুখে উঁকি দিয়ে চিৎকার করলো, কই হ্যায়। ইধার আও। মনে হলো আমরা সব এক সঙ্গে কেঁদে উঠলাম! ঐ ভাষাটা আমাদের নতুন করে আতঙ্কগ্রস্ত করলো। কয়েকজনের মিলিত কণ্ঠ, এবারে মা, আপনারা বাইরে আসুন। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। আমরা আপনাদের নিতে এসেছি। চিরকালের সাহসী আমি উঠলাম। কিন্তু এতো লোকের সামনে আমি সম্পূর্ণ বিবস্ত্র, উলঙ্গ। দৌড়ে আবার বাংকারে ঢুকতে যাচ্ছিলাম। কিন্তু যে বলিষ্ঠ কণ্ঠ প্রথম আওয়াজ দিয়েছিলো, কোই হ্যায়, সেই বিশাল পুরুষ আমাকে আড়াল করে দাঁড়িয়ে নিজের মাথার পাগড়িটা খুলে আমাকে যতোটুকু সম্ভব আবৃত করলেন। ভেতরে আরও ছয়জন আছে বলায় আশপাশ থেকে কিছু লুঙ্গী, শার্ট যোগাড় করে ওরা একে একে বেরিয়ে এলো এবং ওদের কোনো রকমে ঢাকা হলো। আমি ওই শিখ অধিনায়কাকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কেঁদে ওঠলাম। ভদ্রলোক আমার মাথায় হাত দিয়ে বললেন, ‘রো মাৎ মায়ি।’ আমাদের একটা জিপে তুলে নিয়ে যেখানে আনা হলো তা একটা হাসপাতাল। আমাদের গায়ে ঘা, চামড়ায় গুঁড়ি গুঁড়ি উকুন! মানুষের মাথায় উকুন হয় জানতাম, গায়ে হয় জানতাম না। একে একে ওয়ার্ড মেইডরা এসে আমাদের গরমপানি সাবানে স্নান করালো। আমার মাথার চুলগুলো কেটে দিতে বললাম। মেয়েটি প্রায় আমার বয়সী, খুব সহানুভূতির গলায় বললো, এতো সুন্দর চুল কাটবে কেন দিদি? দু’তিন দিন পর পর শ্যাম্পু করে আমিই জট ছাড়িয়ে দেবো। ধুলো বালি মাথায় ভর্তি তো তাই এমন হয়েছে। অবাক হলাম। এমন সহানুভূতির সুরেও মানুষ কথা বলে? ভাবলাম তাইতো আমি তো বন্যপ্রাণীদের সঙ্গে বনে ছিলাম। সভ্য মানুষের ভাষা ভুলে গেছি। প্রাথমিক চিকিৎসা নার্সই দিলো। তৃতীয় দিনে ডাক্তার দেখলেন, আমি নিজেই বললাম, ডক্টর আমি বোধ হয় অন্তঃসত্ত্বা ডাক্তার গম্ভীর মুখে বললেন, আপনি ঠিকই ধরেছেন। আমি ওর হাত দুটো ধরে কেঁদে ফেল্লাম, আমাকে বাঁচান। আমি এ পশুর বীজ দেহে রাখতে চাই না। ডাক্তার গম্ভীর কিন্তু কণ্ঠে সহানুভুতি, না না আপনার কোনও ভয়ের কারণ নেই, প্রাথমিক অবস্থা, আমরাই ব্যবস্থা করে দেবো।
দিন দশেকের ভেতর আমি পাপমুক্ত হলাম। শেফা বেঁচে উঠলো, জেগে উঠলো। এবার কবে যাবো আমরা? দেরি হলো না। মাসখানেকের ভেতর আমরা সুস্থ হয়ে ঢাকায় এলাম। অনেকের দেহেই অনেক ব্যাধি প্রবেশ করেছে। তাদের সব আলাদা করে চিকিৎসার ব্যবস্থা হলো। ঢাকায় আমি এলাম ধানমন্ডিতে একটা বাড়িতে, নারী পুনর্বাসন কেন্দ্রে। আমার মতো হতভাগিনীদের প্রাথমিক অবস্থায় এখানেই আনা হতো। তারপর খোঁজ খবর করে আত্মীয় স্বজন পেলে তারা কেউ আপনজনের কাছে চলে যেতো আর কেউবা সরকারের আশ্রিত হিসাবে ওখানেই থাকতো। আমার কাছ থেকে ঠিকানা নিয়ে বাবাকে চিঠি লেখা হলো। বাবা পাগলের মতো ছুটে এলেন। সঙ্গে মা আর সোনালি। পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে আমাদের বিরামহীন কান্না শুরু হলো। সান্টু ভালো আছে তবে এখনও স্থির হয়ে ঘরে থাকে না। আব্বা বললেন, কলেজ খুললে উন্মাদনা কমলে আপনিই ঠিক হয়ে যাবে, ওর জন্যে ভাবি না। চিন্তা ছিল তোর জন্যে, তোকে পাবো ভাবি নি। ওখানকার অফিসারকে বলে কিছুক্ষণের জন্য বাইরে এলাম। একটা হোটেলে পেট ভরে খেলাম।
বাবা বললেন, চলো মা আজ রাতের ট্রেনেই ফিরে যাই। আমি তো এক পায়ে খাড়া। সংসদ ভবনের কাছে লেকের পাড়ে বসে আমার কাহিনী শোনালাম। ওরা হাপুস নয়নে কাঁদছেন আর সোনালি আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁপছে। ফিরে এলাম পুনর্বাসন কেন্দ্রে। কিন্তু ডাক্তার বাবাকে ডেকে কি যেন বললেন। বাবা রাজি হলেন। আমার একটা চিকিৎসা চলছে। আরও মাসখানেক লাগবে সম্পূর্ণ সুস্থ হতে। বাবা কি বাড়িতে আমাকে নিয়ে চিকিৎসা করাবেন, না এখানে থেকেই সুস্থ হয়ে বাড়ি যাবো। আমি জিনিসটা বুঝলাম। বাবাকে বোঝালাম, বাবা এরা আমার অনেক যত্ন করেন। এই বিদেশী ডাক্তাররা দিন-রাত আমাদের কতো যত্ন করছেন। দশ মাস গেছে বাবা আর একটা মাস থাকি। সম্পূর্ণ সুস্থ হয়েই যাবো। মা চোখের জল মুছলেও শেষ পর্যন্ত হাসি মুখে ফিরলেন। বাবাকে বললাম, সান্টুর দিকে লক্ষ্য রেখো ও যেন বাউণ্ডুলে না হয়ে যায়।
ওরা চোখের বাইরে চলে গেলে শেফা পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। মনে হলো সে আর কোনো দিন ওই পরিবারে ফিরে যাবে না। গেলেও সে অস্পৃশ্য হয়ে রইবে। দস্যরা তার এতো বড় ক্ষতি করে গেল! অবশ্য ডাক্তাররা বলেছেন গুরুতর কিছু হয় নি। মাস খানেক নিয়মিত চিকিৎসা করলেই সে তার সম্পূর্ণ সুস্থ জীবন ফিরে পাবে। ভয়ের কোনও কারণ নেই।
