আমাকে বসতে দেওয়া হলো। চা দেওয়া হলো, আমি কোনও কিছু ক্ষেপ না করে অকপটে ফারুকের কাহিনী বর্ণনা করলাম। মা আর সোনালির কথা উল্লেখ করলাম না। যদি তাদেরও ধরে আনে। ভদ্রলোক মৃদুহাস্যে সব শুনলেন। তারপর পাশের ঘরে নিয়ে খাঁটি পাকিস্তানি মুসলমানি হুইস্কি পান করতে লাগলেন। আমাকেও অনেকবার সাধলেন। পাকিস্তানের গল্প করলেন। আমি কখনও গেছি কিনা। যাই নি শুনে আমাকে নিয়ে যাবার প্রতিশ্রুতি দিলেন। করাচির বর্ণনা করলেন। করাচির সীবীচ কতো সুন্দর তাও বললেন। তারপর নেশাটা জমে উঠলে চট করে একটানে আমাকে বিবস্ত্র করলেন। এলেন না কেউই রক্ষায়। প্রাণপণে চিৎকার করলাম। বাঘের থাবার মতো একটা মুখ চেপে ধরলো। বিবাহের প্রথম মধু যামিনী যখন শেষ হলো তখন আমার জ্ঞান নেই। চোখে মুখে রোদ লাগলো যখন চোখ খুলে দেখি একজন আয়া মতো মহিলা দাঁড়িয়ে। আমাকে গোসলখানা দেখিয়ে নিয়ে নাশতা আনছে বলে চলে গেল। উঠে গোসলখানায় ঢুকলাম। মনে হয় উচ্চ পদের কেউ ব্যবহার করেন। আঙুলে করে দাঁত মাজতে গিয়ে দেখি দাঁতে অসহ্য ব্যথী। শয়তানটাকে কামড়ে ধরার জন্যে। সরে গেলাম আয়নার কাছে। সারা মুখ আমার নখের আঁচড়ে অদ্ভুত এক রূপ নিয়েছে। আমার রূপের খ্যাতি ছিল। গায়ের রং-এর জন্য মা নাম রেখেছিলেন শেফালী। হঠাৎ করে কাপড় খুলে শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে রইলাম। দেহটাকে ধোয়া দরকার। আমার অন্তর জানে সেখানে কোনও মালিন্যের ছাপ পড়ে নি। আমি চেয়ে রইলাম কিছুক্ষণ নিজের দিকে! কালকের আমি আর আজকের আমিতে আসমান-জমিন ফারাক। শেফা মরে গেছে, আর শেফালী আজ নীল অপরাজিতা। দেহের বর্ণ স্নান। কিন্তু যতক্ষণ জ্ঞান থাকবে, অন্তর থাকবে শুভ্র পবিত্র অম্লান। দরজায় চা নাশতা দিয়ে গেল সেই মহিলা। স্বাভাবিকভাবে খেতে পারলাম না। সমস্ত শরীরে দুঃসহ ব্যথা। কাগজ কলম চাইলাম। দিলো না। কথার উত্তরও দিলো না মেয়ে লোকটা। কিছুক্ষণ পরে দোপাট্টাহীন একটা সালোয়ার কামিজ দিয়ে গেল। আমার ছেড়ে দেওয়া সেই শাড়ি আমি আর দেখি নি।
পরের রাতে এলেন আরেকজন। গল্প করলেন। আমি ইংরেজি জানি দেখে খুব খুশি হলেন। কিছু শায়ের শোনালেন। কাংস্য বিনিন্দিত কণ্ঠে দু’এক কলি গজল পেশ করলেন। তারপর যথাকৰ্তব্য করে গেলেন। রাতের খাবার মুখে রুচলো না। ডাল রুটি পড়ে রইলো। বুঝলাম প্রতিদিন নতুন নতুন অতিথির মনোরঞ্জন করতে হবে। এই কি দোজখ? না, দোজখ দেখার তখনও অনেক বাকি। বদলি হতে লাগলাম এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায়। কখনও এক দল মেয়ের সঙ্গে, নানা বয়সী নানা রুচির, আবার কখনও একা নিঃসঙ্গ নিশ্চিদ্র কক্ষে, যেখানে রাত দিন বোঝা দুষ্কর। দিন চললো, কখনও কখনও জমাদারণীকে ধরে মাসের খবর জানতাম, কখনও তারিখ। একা কখনও ভাবতাম বাবা নিশ্চয়ই বেঁচে আছেন। সান্টু কি মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিতে পেরেছিলো? ও কি কখনও মার কাছে আসতে পেরেছিল? মা আর সোনালি বেঁচে গেছে। ওরা নিশ্চয়ই গ্রামে আছে। ভাবছে আমি ফারুকের সঙ্গে পালিয়ে গেছি। আমাদের গোপনে বোধ হয় একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। কিন্তু তা কি করে হবে? তারা তো জানতো আমি ওকে কোনও দিনই পছন্দ করতাম না।
চারদিক থেকে প্রায় রাতেই গোলাগুলির শব্দ আসে। ভাবি কোথায় এ যুদ্ধক্ষেত্র? কারা এ লড়াই করছে। এখানেও মত্ত অবস্থায় প্রণয়ী বলে শালা মুক্তি-শা-লাকে বহিন বলে আমার ওপর অকণ্ঠ্য কিছু গালি বর্ষণ করে। মাঝে মাঝে জমাদারণী, পাহারাদার ফিস ফিস করে কথা বলে। কান খাড়া করে শুনি। খুউব যুদ্ধ হচ্ছে। এরা হেরে গেলে তো মুক্তিরা আমাদের কুকুর দিয়ে খাওয়াবে। শেফার মগ্নচৈতন্য জেগে ওঠে। তাহলে মুক্তিদের জয়লাভের সম্ভাবনার কথা এরাও ভাবছে। আল্লাহ্ তুমি আলো দেখাও, আমার সান্টু যেন বেঁচে থাকে। আব্বা যেন ফিরে আসেন। মা সোনালি… হঠাৎ কয়েক ফোঁটা পানি শেফার গাল বেয়ে নামে। কি সব ভাবছে সে। সেই দিনই হঠাৎ ওদের পাঁচ-ছয়জনকে ট্রাকে তুলে নিয়ে গেল। শেফা ভাবলো মারতে নিয়ে যাচ্ছে। শেফার জীবন সম্পর্কে আর কোনও মায়া বা মোহ নেই এ দেহের খাঁচাটা থেকে মুক্তি পেলেই সে বেঁচে যাবে। কিন্তু তার যে বড় আশা একবার শুনে যাবে দেশ স্বাধীন হয়েছে, একবার প্রাণভরে শুনবে ‘জয় বাংলা’। পর্দা বাঁধা ট্রাক তবুও শীত করছে। দু’জন সেপাই কম্বল ফেলে দিলো ওদের গায়ের ওপর। ট্রাক চলছে তো চলছেই। ট্রাকের আলোও মাঝে মাঝে ড্রাইভার নিভিয়ে ফেলেছে। মনে হয় শেফা ঘুমিয়ে পড়েছিল। একটা অন্ধকার জায়গায় থামলো অবশেষে ট্রাকটা। কে একজন ভারি গলায় হুকুম দিলো, ব্যাংকার মে লে যাও। যাও জলদি যাও। তাড়া খাওয়া কুকুরের মতো একটা সুড়ঙ্গে ঢুকলাম। এটাই তাহলে ব্যাংকার। ভেতরে ত্রিপলের ম্যাট্রেস। দু’একটা খাঁটিয়া আছে। পানির কলসী, গেলাম। কিছু স্তূপাকৃত কম্বল। শেফা ভাবলো তাহলে কি জ্যান্ত কবর দেবে এখানে? দিতেও পারে। পরে শুনেছে ওরা অনেককে জ্যান্ত কবর দিয়েছিল। পানির কলসী আর গ্লাস দেখে বুঝলো,, ওদের বাঁচিয়ে রাখা হবে নইলে পানি কার জন্য। এরপর সময়টা শেফা স্মরণ করতে পারে না। বোধ হয় চায়ও না। সে কি যন্ত্রণা। কোনও দিন খাবার আসতো, কোনো দিন না। অনেক সময় পানিও থাকতো না। হঠাৎ করে একদিন এসে সবার জামা কাপড়, যদিও সেগুলো শতচ্ছিন্ন এবং ময়লায় গায়ের সঙ্গে এঁটে গিয়েছিলো তা টেনে হেঁচড়ে খুলে নিয়ে গেল। সম্পূর্ণ নগ্ন অমরা। কেউ কারো দিকে তাকাতে পারছি না। দিনের বেলা ব্যাংকারে ঢোকার পথ দিয়ে কিছুটা আলো আসে। আমার মনে পড়ে তখন শীতের দিন ছিল। অপর্যাপ্ত কম্বল থাকায় এক কম্বলের নিচে দুতিন জন জড়োসড়ো হয়ে থাকতাম। কিন্তু রাতের সাথীরা যেন এখন বন্যপশুর মতো আচরণ করছে। অবশ্য অনেক সময় রোজ তারা আসেও না।
