আমি শেফা। মা ডাকতেন শেফালী। আব্বা থেকে শুরু করে বাড়ির অন্য সবাই পাড়া পড়শী সবাই ভাকতো শেফা। অবশ্য স্কুলে আমার একটা পোশাকী নাম ছিল। তবে সেটা এখন বলা যাবে না। তাহলে আবার আপনারা আমাকে ধরে নিয়ে কোন গুহায় বা বাংকারে ভরবেন বলতে পারি না। তাই যেটুকু পরিচয় পেয়েছেন তাই যথেষ্ট। আর যারা আমার উপকার করেছিলেন ঘর থেকে বের করে, তারা শেফা নামেই চিনবেন। আমি বড় হয়েছি একটা মফঃস্বল শহরে। অবশ্য তাই বলে সেটা পাড়া গাঁ নয়। জজকোট ছিল, হাসপাতাল ছিল, গোটা সাতেক উচ্চবিদ্যালয় ছিল, তার ভেতর দুটো মেয়েদের। আর দুটি ভালো মহিলা কলেজ ছিল, ছিল বড় সরকারি হাসপাতাল, খেলার মাঠ, সদ্বান্ত লোকের জন্য ক্লাব, ইউরোপীয়ান ক্লাব ইত্যাদি। বাবা ছিলেন আইনবিদ এবং রাজনৈতিক ক্রিয়াকান্ত্রে সঙ্গে ওতঃপ্রোতভাবে জড়িত।
‘৬৯-এর আন্দোলনের সময় আমি স্কুলের দশম শ্রেণীর ছাত্রী। মিটিং, মিছিল, পিকেটিং করেই স্কুলের পড়াশুনা চালিয়েছি। মা খুবই বকাবকি করতেন। মেয়েদের এতো ভালো না, এই কথা বহুবার বলেছেন। কিন্তু আমি পিতার আদরিনী কন্যা, আমাকে স্পর্শ করে কার ক্ষমতা। এরই ভেতর বাবা কারারুদ্ধ হলেন।
সরকারের প্রতি ক্ষোভ আমার এতো বেড়ে গেল যে প্রতিহিংসা মেটাবার বাসনায় অবাঙালি দোকান থেকে কিছু কিনতাম না। সুযোগ পেলে ওদের ছোট ছোট ছেলে মেয়েকে চড়টা চিমটিটা দিতেও ইতঃস্তত করতাম না। তখন কি জানতাম এ সব ক্ষুদ্র অপকর্মও বিধাতা পুরুষের হিসাবের খাতায় জমা হচ্ছে! যাক্ মাস ছয়েক পর বাবা মুক্তি পেলেন। আমিও ডানা মেলে ‘জয় বাংলা’ বলে ঝাঁপিয়ে পড়লাম দেশের কাজে। মিছিলে যাওয়া, সামনে এগিয়ে স্লোগান দেওয়া, লাঠির আঘাতে বাহাতখানা জখম করা ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামে আমার বীরত্বের চিহ্ন।
দ্রুত ঘটনা এগিয়ে চললো। আগরতলা মামলা নস্যাৎ হয়ে গেল। শেখ মুজিব হলেন বঙ্গবন্ধু। ঢাকার খবর শুনলাম। তখনকার রেডিওতে তো কিছু কিছু খবর পাওয়া যেতো। বর্তমানের মতো তার একটা মুখ ছিল না। তাছাড়া অনবরত ঢাকার খবর আসছে লোক মারফৎ, ফোনে, আর আমাদের কর্মকাণ্ড নব নব পথে চালিত হচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর হুকুমে স্কুল, কলেজ, অফিস-আদালত, সব বন্ধ। আমি আইএসসি পরীক্ষা দেবো। বইপত্র স্পর্শ করি না। কারণ দেশ তো স্বাধীন হয়ে যাবে। কিন্তু তারপর বই ছুঁতে হবে কিনা আমার জানা ছিল না। আব্বার কোর্ট নেই। দু’বেলা বাইরের ঘরে একশো কাপ চা, ছোটভাইয়ের খেলে বেড়ানো, ছোটবোন মায়ের আঁচল ধরে ঘোরে আর চব্বিশ ঘণ্টা মায়ের বকুনি, বাবা থেকে শুরু করে কাজের মেয়ে নাসিমা পর্যন্ত রেহাই পেতো না। কেমন করে চলে এলো ২৫ শে মার্চ। স্বপ্ন ছিলো দু’একদিনের ভেতর বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন, আর একি হলো! কার্টু সব জায়গায়, আমাদের শহরেরও। বাবা, মায়ের জিদে গ্রামে চলে গেলেন একান্ত অনিচ্ছাসত্ত্বেও আমাকে সঙ্গে নেবার জন্য খুব জিদ করেছিলেন কিন্তু এতো বড় মেয়েকে মা পথে বেরুতে দিলেন না। দিলে হয়তো শহীদ হতে পারতাম, বীরাঙ্গনা হতাম না। দুটো দিন নিশ্বাস বন্ধ করে কেটে গেল। তারপর মানুষ আতংকগ্রস্ত হলেও চলাফেরা করতে শুরু করলো। কিন্তু টের পাচ্ছিলাম রাতের অন্ধকারে অনেকেই গ্রামমুখী হচ্ছে। এই বন্দিদশা থেকে মুক্ত হবার জন্য মাকে ধরলাম, চলো আমরা চলে যাই। মাও রাজি, কিন্তু আমার ও সতেরো বছর বয়সের ছেলের জন্য চিন্তিত হলেন। ওরা নাকি ছাত্র দেখলেই গুলি করে মারে।
এবার একটু অন্য প্রসঙ্গে আসি। আমাদের পাশের বাড়িতে এক জজ সাহেব থাকতেন। ওরা যেন একটু অন্যরকম টানে কথা বলতো। ওদের মেয়ে ছিল না। তাই কারও সঙ্গেই আমার তেমন জমানো আলাপ ছিল না। ওদের বড় ছেলে ফারুক আমাদের কলেজে বিএ পড়তো। কেমন যেন গোবেচারা বোকা বোকা গোছের। বাবাকে একদিন বলেছিলাম, জানো বাবা ফারুক কখনও মেয়েদের দিকে চোখ তুলে তাকায় না। মা বললেন, অমন চমৎকার ছেলে আজকালকার দিনে হয় না। বাবা বললেন, দ্যাখো গিয়ে ছোটবেলায় মাদ্রাসায় পড়েছে। আমাদের সঙ্গে যেসব মাদ্রাসায় পড়া ছেলে কলেজে পড়তো তারাও সোজাসুজি মেয়েদের দিকে তাকাতো না, কিন্তু সুযোগ পেলে ওরাই সব চেয়ে বেশি হ্যাংলার মতো মেয়ে দেখতে। হাসাহাসির ভেতর ফারুকচর্চা শেষ হলো।
বাবা লোকমুখে অবিলম্বে আমাদের গ্রামে যাবার জন্য খবর পাঠালেন। কারণ বাবা অন্য কোথাও চলে যাচ্ছেন। মা যাত্রার প্রস্তুতি নিলেন। এমন সময় বাবা নেই জেনে ফারুক আমাদের বাড়িতে যাতায়াত আরম্ভ করলো। মা আগে থেকেই ওকে পছন্দ করতেন। ও মাকে না যাবার জন্য খুবই উৎসাহিত করতো। হঠাৎ একদিন আমার ছোট ভাই অদৃশ্য। ১৭/১৮ বছরের ছেলে। ছোট্ট কাগজে মাকে আর আমাকে লিখে গেল, যুদ্ধে যাচ্ছি, তাড়াতাড়ি দেশে চলে যাও। মা কান্নায় ভেঙে পড়লেন। বললেন, ফারুককে খবর দে। এতোদিন পরিস্থিতি আমাকেও কিছুটা দুর্বল করে ফেলেছে। তবুও মাকে বললাম, সান্টুর যুদ্ধে যাবার কথাটা ওকে বলো না। আমার দিকে মা তাকিয়ে রইলেন। বললাম, ওকে জানি না ভালো করে, এ সব খবর গোপন রাখাই ভালো, আমাদের ক্ষতি হতে পারে। পরদিন আব্বার খোঁজে পুলিশ এলো। অসভ্যের মতো মাকে ধমকধমকি করলো। ঠিক করলাম মা, আমি আর সোনালি আজ রাতেই দেশে যাবো। কিন্তু হলো না। ঠিক সন্ধ্যায় ফারুক বললো, খালাম্মা চলে যাচ্ছেন। চলুন আমি আপনাদের পৌঁছে দিয়ে আসি। কেন জানি না অমঙ্গল আশঙ্কায় আমার বুকটা কেঁপে উঠলো। কিন্তু মা যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেলেন। দু’খানা বেবীট্যাক্সি ডাকা হলো। আমি মার সঙ্গে উঠতে যাচিছলাম ফারুক আমাকে তারটায় উঠতে ইঙ্গিত করলো। মা আর সোনালি সামনেরটায় উঠলেন। কিছুদূর যাবার পর আমাদের ট্যাক্সি সোজা স্টেশনের পথে না গিয়ে বাঁ দিয়ে সেনানিবাসের পথ ধরলো। আমি বললাম, ওকি? এ পথে কেন? ফারুক ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে বললো, ও দিকে ছেলেরা ব্যারিকেড দিয়েছে। বললাম, তাহলে মা আর ওরাও ঘুরে আসতো। আমি অস্বস্তি বোধ করলাম। চিৎকার করে বললাম, এই বেবী থামো। না, সে তার গতি বাড়িয়ে দিলো। আমি লাফ দেবার চেষ্টা করলাম। কিন্তু ওই শয়তানের সঙ্গে গায়ের শক্তিতে না পেরে ওর হাতে আমার সব কটা দাঁত বসিয়ে দিলাম। যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠলো পশুটা। তারপর বেবীট্যাক্সি থামিয়ে ওই জানোয়ারটা তার গামছা দিয়ে কষে আমার মুখ বাঁধলো। তারপর সোজা সেনানিবাস। আমি বন্দি হলাম। ফারুক আমাকে উপহার দিয়ে এলো। ফারুক এখন জজ সাহেব। আর কখনো হাফ হাতা শার্ট পরে না। কেউ হাতের দাগ দেখে ফেললে বলে মুক্তিযুদ্ধে আহত হয়েছিল বেয়োনেট চার্জে। দেখুন তাহলে এ দেশে মুক্তিযোদ্ধা কারা!
