আরে না না বসুন। রীনা বিব্রতবোধ করে। অতোদূর থেকে হোন্ডা চালিয়ে এসেছেন নিশ্চয়ই খুব খিদে পেয়েছে? চায়ের কথা বলে আসি? বলবেন তবে শুধু চায়ে তো খিদে নষ্ট হবে, সঙ্গে আর কিছু হবে না, নাসির হাসে। সত্যিই আপনি শুধু বেহায়া না পেটুকও।
রীনা ভেতরে চলে গেল। নাসির গুন গুন করে রবীন্দ্র সংগীতের সুর ভাজতে শুরু করলো। রীনা এলো, নিঃশব্দে বসে পড়লো। নাসিরও স্থির হয়ে বসলো। কই, বলুন সে-সব কথা।
নিশ্চয় বলবো। তবে আগে চাটা খেয়ে নিন, নইলে হয়তো খাওয়াই হবে না। রীনা চুপ করে রইলো। নাসির বললো, দেখুন আমি গোমড়া মুখ দেখতে ভালোবাসি না। প্লিজ একটু হাসুন। রীনা গম্ভীর মুখে বললো, আপনার ভালোবাসা বা ভালোলাগার ওপর নির্ভর করে আমাকে চলতে হবে নাকি? হতেও তো পারে, কিছু কি বলা যায়? এবার রীনা হেসে ফেললো।
বুয়া চা নিয়ে এলো। না, না ভেতরেই দাও, আসুন নাসির সাহেব চা খেয়ে তারপর এখানে এসে বসবো। হাসি-গল্পে-ঠাট্টা-তামাশায় চা-পর্ব শেষ হলো। মনে হলো জীবনের দুঃখকে নাসির ঠাই দিতে রাজি না। রীনাও তো একদিন অমনিই ছিল। তারপর কি দিয়ে কি হয়ে গেল। বাইরে এসে বসলো দু’জনে। রীনা শুরু কলো… সব শেষে বললো নাসির, আমি বীরাঙ্গনা, সেটা আমার লজ্জা না, গর্ব। অন্তত নিজের সম্পর্কে এই আমার অভিমত, বিশ্বাস করুন। ভালো কথা, আগ্রহের সঙ্গে বললো নাসির, আমিও তো মুক্তিযোদ্ধা আর সেটা আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ তাহলে তোমারই-বা অহংকার থাকবে না কেন? লজ্জা? কিসের লজ্জা? লজ্জা তাদের যারা দেশের বোনকে রক্ষা করতে পারেনি? শক্রর হাতে তুলে দিয়েছে। আমাদের এ অপরাধের জন্য আমি সবার পক্ষ থেকে তোমার কাছে ক্ষমা চাইছি। কি আরও কিছু করতে হবে? নতজানু হয়ে জোড়হাতে দাঁড়ালো নাসির। রীনার দু’চোখের জল গাল বেয়ে নামছে তখন। নাসির তখন গিয়ে ওকে সযত্নে কাছে টেনে নিলো, চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বললো, তাহলে মাকে বলি আমাদের প্রস্তাব মঞ্জুর? রীনা ঘাড় নেড়ে সায় দিলো। কিছুক্ষণ পর নাসির চলে গেল। রীনা ওখানে স্থানুর মতো দাঁড়িয়ে রইলো। এ কি সত্যি? তার জীবন এমনভাবে ভরে উঠবে, পূর্ণতা পাবে। এও কি সম্ভব! এর পেছনে আব্বা-আম্মার দোয়া আছে, আর আছে আমার ভাইয়ার সাধনা। আকাশটা যেন আজ বড় বেশি উজ্জ্বল, গাছগুলো সবুজের গর্বে বিস্ফোরিত, বাগানের প্রতিটি ফুল হাসছে, রীনা কি করবে এখন? ফোন এলো, মিতু হেসে গড়িয়ে পড়ছে। বললো, ভাবি কনগ্রাচুলেশন। ফোন ছাড়তে চায় না, ভাইয়ার সঙ্গে কথা বলতে ওরা কাল আসবে।
বিয়ের পর বাসরঘরে ঢুকে নাসির আমাকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে বললো, তোমাকে অভিনন্দন বীরাঙ্গনা! লজ্জায় মুখ তুলতে পারি নি। ভাইয়ার ইচ্ছা পূর্ণ হয়েছে তার সাধ্যের অতিরিক্ত ব্যয় করে সে বোনের বিয়ে দিয়েছে।
সহজভাবে জীবন চলেছে। আমি নিঃসন্দেহে সুখী। আমাদের তিনটি সন্তান দুটি ছেলে একটি মেয়ে। মাঝে নাসির দু’বছরের জন্য ট্রেনিং নিতে আমেরিকা গিয়েছিল। আমিও সঙ্গে ছিলাম। আমাকে চাকুরিটা ছাড়তে হয়েছিল কারণ ওর ছিল বদলির চাকুরি। এক সময় কুমিল্লাতেও ছিলাম। হাসপাতালটা ঘুরে ঘুরে দেখলাম। নিজে যে ঘরে যে বেডে ছিলাম, হাত বুলিয়ে দেখলাম। সেদিন ছিলাম বন্দি আর আজ স্বাধীন।
একটি মেয়ে তার জীবনের যা কামনা করে তার আমি সব পেয়েছি। তবুও মাঝে মাঝে বুকের ভেতরটা কেমন যেন হাহাকার করে ওঠে কিসের অভাব আমার, আমি কি চাই? হ্যাঁ একটা জিনিস, একটি মুহূর্তের আকাঙ্ক্ষা মৃত্যু মুহূর্ত পর্যন্ত রয়ে যাবে। এ প্রজন্মের একটি তরুণ অথবা তরুণী এসে আমার সামনে দাঁড়িয়ে বলবে, বীরাঙ্গনা আমরা তোমাকে প্রণতি করি, হাজার সালাম তোমাকে। তুমি বীর মুক্তিযোদ্ধা, ঐ। পতাকায় তোমার অংশ আছে। জাতীয় সংগীতে তোমার কণ্ঠ আছে। এদেশের মাটিতে তোমার অগ্রাধিকার। সেই শুভ মুহূর্তের আশায় বিবেকের জাগরণ মুহূর্তে পথ চেয়ে আমি বেঁচে রইবো।
৪. শেফা
০৪.
আমার পরিচয় জানতে চান? আমি প্রকৃতপক্ষে একজন বীরাঙ্গনা। শুধু দেহে নয়-মনে, মননে, হৃদয়ে। হাসছেন তো? বীরাঙ্গনার আবার অন্তর, তার আবার মনন? জ্বী, দেহে আপনার সঙ্গে লড়াইতে জিততে পারবো কিনা জানি না তবে আপনি যদি বাঙালি মুসলমান ঘরের পুরুষ হন, আর আপনার বয়স যদি পঞ্চাশ পার হয়ে থাকে তাহলে মনোবলে আপনি আমার চেয়ে নিকৃষ্ট। কারণ একদিন আমি আপনাদের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিলাম, আপনাদের আপাদমস্তক দৃষ্টিপাত করবার এবং দেহ ভেদ করে অন্তরের পরিচয় পাবার সৌভাগ্য অথবা দুর্ভাগ্য আমার হয়েছিল। এদেশের মায়ের সন্তান যারা ছিল তারা হয় শহীদ, নয়ত গাজী। যুদ্ধকালে যারা খেয়ে পরে সুখে ছিলেন তাদের আমি ঘৃণা করি, আজ এই পঁচিশ বছর পরও থুথু ছিটিয়ে দিই আপনাদের মুখে, সর্বদেহে।
একজন বীরাঙ্গনার এতো অহঙ্কার কিসের? আমি তো বীরাঙ্গনাই ছিলাম। আপনারা বানাতে চেয়েছেন বারাঙ্গনা। তাইতো আপনারাও আমার কাছে কাপুরুষ, লোভী, ক্লীব, ঘৃণিত এবং অপদার্থ জীব। আমি আজও বীরাঙ্গনা, আজও আমি আপনাদের করুণা করবার অধিকার রাখি।
আমার পরিচয়? আমি এই বাংলার একজন গর্বিত নারী, যাকে অরক্ষিত ফেলে রেখে আপনারা প্রাণভয়ে পদ্মা পার হয়েছিলেন। ফিরে এসে গায়ে লেবাস চড়িয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধার। কিন্তু সুযোগ সন্ধানী পুরুষ, অন্তরে ছিলেন রাজাকার, মুখে বলেছেন ‘জয়বাংলা’, মনে মনে উচ্চারণ করেছেন তওবা, তওবা’! নইলে এই যে রক্তবীজের ঝাড় রাজাকার, আলবদর-এরা কি পাকিস্তান বা মধ্যপ্রাচ্য থেকে এসেছে? না, এরাই আপনারা, আপনাদের ভাই-বন্ধুরা, যারা এখন পুত্রের নিহত হবার ভয়ে ভিটামাটি বিক্রি করে দেশ ত্যাগের জন্য মরিয়া হয়েছেন। কিন্তু যাবেন কোথায়? আপনার পেছনে ধাবিত হবে আজ বারোকোটি বঙ্গসন্তান। যাক এ সমস্যা আমার নয় আপনার, আপনার স্বগোত্রীয়দের।
