ভাবছি আমার সান্ত্বনা আমার বীরাঙ্গনার প্রশংসাপত্র। কিন্তু এই রূপবতী গুণবতী, বিদূষী মহিলার জীবনে কি আছে? হায়দারের প্রেম ও আনন্দের কল্পলোক ছাড়া। হায়দার সম্পর্কে সালমা বেগম বলেন, আমি আমার দুঃখের বোঝা দিয়ে তার জীবন বরবাদ করেছি। মেহের, একি কখনও আমাকে ভালোবেসেছে? ও দিয়েছে আমাকে করুণা, সহানুভূতি। তবে আমি ওকে ভালোবেসেছি। আজ বলতে কোনও দ্বিধা নেই, ওই আমার জীবনে প্রথম ও শেষ ভালোবাসার পুরুষ।
প্যাকেটে কাজ করা একটি মুগার পাঞ্জাবী আর সালমা বেগমের নিজের হাতে বোনা জরদা ও গোলাপী রং মেশানো একটি গরম পুলওভার। গত একমাস ধরে আমি তাকে এটা অত্যন্ত যত্নে বুনতে দেখেছি। আমি চোখ মুছে তাঁর দেওয়া প্যাকেটটা নিয়ে এলাম।
ঢাকা বিমানবন্দরে পা রাখলাম। এখানে এই আমার প্রথম আসা। বন্দি হিসেবে গিয়েছিলাম বেনাপোলের পথে ট্রাকে করে। অভ্যর্থনা জানাতে মহিলারা বিমানবন্দরে এসেছেন রজনীগন্ধা নিয়ে।
উঠলাম হোটেল শেরাটনে। রুমে গিয়েই বড়ভাইকে ফোন করলাম ওঁর নরসিংদীর দোকানে। পেয়েও গেলাম। উত্তেজনায় আমার গলা কাঁপছিল। বললাম এখানে দু’দিনের অনুষ্ঠান আছে। তুমি বৃহস্পতিবার সকালে এসো আমি তোমার সঙ্গেই বাড়ি যাবো। শেষ পর্যন্ত গলা কেঁপে মনে হয় কণ্ঠস্বর রুদ্ধ হয়ে গেল। মা নেই, বাবা নেই, এ কোন শূন্যপুরীতে সে যাবার পরিকল্পনা করেছে। সেমিনার হল, রিসেপশন হল, বিভিন্ন বাড়িতে ডিনার খাওয়া হলো! আপার সঙ্গে বার বার দেখা হলো, খুশিতে ভঁর বার্ধক্যের মুখখানা যেন উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। ভাবখানা অন্তত একটি মেয়েতো জয়ী হয়েছে। সে যেভাবেই হোক। তার বীরাঙ্গনা নাম কি সার্থক করতে পারেনি? অবশ্যই পেরেছে। যেখানেই যাই সবার কাছে বলেন, আমার ছাত্রীর ছোট বোন। এতে সমাদর আমার ভাগ্যে ছিল আমি কখনও ভাবি নি। কিন্তু সেই বড় কাটাটা যেন আমার মর্মমূলে বিদ্ধ হয়ে নিয়ত আমার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটাচ্ছে, তার থেকে তো আমার মুক্তি কোনও দিনই ঘটবে না। সে আমার ওই পাসপোর্ট খানা, ওয়াইফ অফ লায়েক খান, জাতীয়ত-পাকিস্তানি। না, না, আর ভাবতে পারি না। আল্লাহ্ আমি না চাইতে তুমি আমাকে সব কিছু দিয়েছে, কিন্তু যা হারিয়েছি তার কি হবে। আত্মরক্ষার জন্য ছলনা গ্রহণের এই আমার আজীবনের শাস্তি।
পরদিন সকালে আনন্দ এলো। পা ছুঁয়ে সালাম করতেই আমি ওকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরলাম। এ তো আমার তাজ! কতো স্বপ্ন ও আগামী মাসে আমেরিকার কেম্বিজে যাচ্ছে অর্থনীতিতে পিএইচডি করতে। ভালো কাজ পেলে মাকে এবং হায়দার আঙ্কেলকে নিয়ে যাবে। আন্টি, আঙ্কেলকে বলবেন আমি তাকে খুব ভালোবাসি, শ্রদ্ধা করি, কারণ তিনি আমার মাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। কার্ডিগানটা মায়ের হাতের করা শুনে বার বার হাত বোলালো। আমিও ওর জন্যে একটা গলা উঁচু পাঞ্জাবী এনেছিলাম। তাজও এগুলো খুব ভালোবাসে, খুব পছন্দ হলো আনন্দের। বললো, আন্টি আপনি যাবার দিন আমি এয়ারপোর্টে দেখা করবো। না, না করতেই আমার হাত চেপে ধরলো, কিছু খেলো না, আমাকে খুশি করবার জন্য একটা আপেল তুলে নিয়ে গেল।
নির্ধারিত দিনে বড়ভাই এলো। সেই লুঙ্গি-শার্ট পরা বড়ভাই নয়। সুন্দর সাফারী পরা, হাতে সদ্য খোলা রোদ চশমা। দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে রইলাম তারপর দু’জন দুজনকে ধরে কান্নার বেগ সামলাতে পারলাম না। আমি ঠিক করেছিলাম সোজা গাড়ি নিয়ে যাবো, কিন্তু বড়ভাই ওর জিপগাড়ি নিয়ে এসেছে। মনে হচ্ছে সবই স্বপ্ন দেখছি। সকাল ৯টায় বেরুলাম। কি জনাকীর্ণ রাস্তা, বাস, ট্রাক, রিকশা, প্রাইভেট কার, বেবী ট্যাক্সির ভো ভো শব্দে কান ঝালাপালা। কতো দ্রুত এগিয়ে এলাম। শীতলক্ষ্যার বিরাট ব্রিজ। মুহূর্তে নদী পার হয়ে এলাম। নামলাম গিয়ে বাড়ির সামনে। লালু, মিলু এবং সঙ্গে ভাবি ও তার বাচ্চা মেয়ে সবাই গেটের কাছে দাঁড়ানো। সে ঘর দুয়ার কিছুই নেই। সুন্দর দোতলা বাড়ি, ছিমছাম, গোছানো। মনে হয় বউ বেশ সংসারী। ঘরে ঢুকে সময় লাগলো স্বাভাবিক হতে। বাবা, মার কথা বলতে পারলাম না। যে জায়গাটায় মা পড়েছিলেন তা আজ বাড়ির নিচে। হঠাৎ দেখা গেল শিউলীগাছটা নেই। বললাম লালু ওই কোণের শিউলীগাছটা কইরে? ঝড়ে পড়ে গেছে আপা, অপরাধী কণ্ঠে জবাব দিলো লালু। মনে হলো ওরা কেটে ফেলেছে তাই এই কুণ্ঠা। গাছটা আমার খুব প্রিয় ছিল সে কথা মিলুও জানে। ভাইয়ের মেয়েটা খুবই। সুন্দর হয়েছে। সবাই বললো দেখতে অনেকটা আমার মতো হয়েছে। ওর জন্য এবং ভাবির জন্য শাড়ি এবং তিন ভাইয়ের জন্য পাঞ্জাবী এনেছিলাম। বের করে দিলাম। পাড়া-পড়শী কারও কথাই আমি জিজ্ঞেস করলাম না, ওরাও গায়ে পড়ে কিছু বললো না। সারাদিনই গেট এবং সামনের ঘরের দরজা বন্ধ রইল। মানে আমার আসবার কথা এরা কাউকে বলে নি। শান্ত, সুন্দর জীবনে কেই-বা শুধু শুধু যন্ত্রণার দায় আনতে চায়! লালু, মিলুকে পাকিস্তান যাবার দাওয়াত দিলাম। সন্ধ্যায় বেরুবো। ওরা আমাকে একটা রাত থাকবার জন্য অনুরোধ করেছিল কিন্তু আমি পারলাম না। আমার নিশ্বাস আটকে আসছে। শুধু ভাবছি কেন এলাম এ শ্মশানে, শূন্য ভিটায় নিজের কঙ্কাল দেখতে।
আসবার আগে বড়ভাই আমাকে একটি ছোট্ট লাল রঙের ভেলভেটের বাক্স দিলো। বাবা তাজের জন্য হার রেখে গেছেন। ওটা হাত পেতে নিয়ে মাথায় ছোঁয়ালাম। তারপর দ্রুত হেঁটে এসে জীপে উঠলাম। চারিদিকে অন্ধকার নেমে এসেছে। আমি এতোক্ষণে স্বস্তি বোধ করলাম, বুঝলাম এ মাটিতে মুখ দেখাবার মতো শক্তি আমার নেই। আমি জীবনের সব পেয়েছি কিন্তু মাটি হারিয়েছি। মনে মনে বললাম, আর কখনও আসবো না। হে আমার জন্মভূমি, আমাকে ক্ষমা করো। মরতে পারার সৎসাহসের অভাব, জীবনের প্রলোভনের বিনিময়ে আমি তোমাকে হারিয়েছি। এ আমার অপরাধ। তোমার কাছে আমি ক্ষমা চাইবো না কারণ ক্ষমা আমি পাবো না। আমি নামহীন গোত্রহীন ভেসে আসা একটি দুস্থ, লাঞ্ছিত রমণী।
