পরদিন দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর আমি আপার কাছে সব কাহিনী বললাম। উনি থেকে থেকে আমার হাত দুটো চেপে ধরছিলেন। যখন আমার বলা শেষ হলো তখন দু’জনের চোখেই জল। বললেন, মেহের সেদিন তোমার জন্য দুঃখ পেয়েছিলাম। কিন্তু আজ আমি দায়মুক্ত যে বাংলাদেশের মাটিতে আমি তোমার কবর রচনা করি নি। কারণ যুদ্ধে আঘাতপ্রাপ্ত বা লাঞ্ছিত কোনও মেয়েকে আমরা প্রকাশ্যে সসম্মানে প্রতিষ্ঠিত করতে পারি নি। জানো মেহের ১৯৭৩ সালে ফ্রান্স থেকে একজন মহিলা স্থপতি এসেছিলেন ঢাকায়। আমার সঙ্গে দীর্ঘ সময় আলাপ করেন। ওদের বিগত মহাসমরে উনি জার্মান সৈন্যদের হাতে বন্দি হন এবং ওঁর ওপর যে পাশবিক অত্যাচার চলে তার ফলে তিনি মা হবার ক্ষমতাও হারান। পরবর্তীতে অবশ্য উনি বিয়ে করেছেন। স্বামী স্থপতি কিন্তু সব হারানো মেয়েদের দুঃখ ও বেদনা উনি জানেন। তাই আমার দেশের এ ধরনের মেয়েদের কোনও রকম সাহায্য সহযোগিতা করতে পারলে উনি খুশি হবেন। এতো বছর পর জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েও মাতৃত্বের বঞ্চনায় তিনি মলিন ও বেদনার্ত। কিন্তু আমার দেশে তো প্রকাশ্যে মাথা উঁচু করে তেমন সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় সম্মানের অধিকারী হয়ে কেউ বেঁচে নেই খুব খুশি হলাম তোমাকে দেখে আর তোমার ভেতরের শক্তির পরিচয় পেয়ে। তুমি ঢাকায় এসো, আমি বিশেষ প্রতিনিধি দলে ভোমাকে অন্তর্ভুক্ত করবার জন্যে সালমাকে বলে গেলাম। আপা চলে গেলেন। আমার নিজ হাতে করা একখানী শাড়ি ওঁর হোটেলের ঠিকানায় পাঠিয়ে দিলাম। উনি ফোনে ধন্যবাদ দিলেন।
চারমাস পর আমাদের যাবার সুযোগ এলো। বড় ভাইকে লিখলাম। উনি খুব খুশি। দিন তারিখ ফ্লাইট নম্বর জানালে উনি এয়ারপোর্টে থাকবেন। না, বিস্তারিত কিছুই আমি ওঁকে জানাই নি।
কিন্তু যাবার আগে আরেক লাঞ্ছিত রমণীর সাক্ষাৎ আমি পেলাম। জানি না আমরা কি শুধু বঞ্চনা সইতেই পৃথিবীতে এসেছি? যাবার দুদিন আগে সালমা বেগম আমাকে ডেকে পাঠালেন। মুখখানা খুব ম্লান। বললেন, বোন মেহের! ভীত সন্ত্রস্ত কণ্ঠে বললাম, কি হয়েছে আপা? ম্লান হেসে বললেন, কিছু না। বসো, তোমার সঙ্গে কিছু কথা আছে। ইতস্তত করলেন, ঘরের ভেতর কিছুক্ষণ অস্থিরভাবে পায়চারি করে থেমে বললেন, মেহের তোমাকে আমি আজ কিছু কথা বলবো, সম্ভব হলে কারও কাছে প্রকাশ করো না। আমি নিঃশব্দে মাথা নেড়ে সম্মতি জানালাম। আমার পাশে এসে বসলেন, পিঠে হাত রাখলেন, অনুভব করলাম দুর্বল কোমল হাতখানার মৃদু কম্পন। বললেন, মেহের তোমাকে আমি বিমা স্বার্থে বাংলায় পাঠাচিছ না। তোমাকে আমি একটা ঠিকানা ও ফোন নম্বর দেবো এক ভদ্রলোকের। তুমি তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে ওই প্যাকেটটা তাকে দেবে। আর কিছু বললে শুনে আসবে। পারবে? আমি আবেগে কেঁদে ফেললাম, আপা এটা কি কোনও কঠিন কাজ? মেহের, ওই যুবক আমার ছেলে-আনন্দ। আমার বয়স যখন ১৭/১৮, কলেজে পড়ি, আনন্দের বাবার সঙ্গে খুব ধুমধাম করে আমার বিয়ে হয়। আমার বাবা ছিলেন জেলা জজ, মধ্যবিত্ত বিবেকবান মানুষ, আর ওরা ছিল ধনী ব্যবসায়ী। বাবা এ বিয়েতে রাজি ছিলেন না কিন্তু ঐশ্বর্যে মেয়ে সুখে থাকবে এটা আমার মাকে প্রচণ্ডভাবে উৎসাহিত করে তুলেছিল। ফলে বিয়ে হয়ে গেল। স্বামী রূপবান, ধনী, মার্জিত রুচি। সুতরাং আমার সুখী হবার পথে তিলমাত্র বাধা ছিল না। বছরখানেক সুখেই কাটলো। আনন্দকে আমি গর্ভে ধারণ করলাম। আমার স্বামী এটা পছন্দ করলেন না। প্রথমে মৃদু তারপর বেশ কঠিন ভাবেই গর্ভপাত করানোর জন্য জিদ করতে লাগলেন এবং আমার প্রতি নিরব তাচ্ছিল্য ও উদাসীনতা প্রকাশ পেতে লাগলো। আমি নিরুপায় হয়ে আমার শাশুড়িকে জানালাম। তিনি কঠোর ভাষায় ছেলেকে ভর্ৎসনা করলেন। ফল হলো বিপরীত। এক বছরেই স্বামী সোহাগিনীর পাট আমার চুকলো। আনন্দকে বুকে নিয়ে একদিকে মাতৃকর্তব্য অন্যদিকে নিজের পড়াশোনায় মনোযোগী হলাম। এতোদিনে এ সত্য বুঝেছি যে জীবনে আমাকে একা চলার প্রস্তুতি নিতে হবে।
হায়দার সাহেব ছিলেন আমার স্বামীর ব্যবসায়ের বড় অংশীদার, তাই উনি প্রায়ই আমাদের বাড়িতে আসতেন এবং ক্রমে সবই জানতে পারলেন। তিনি ওকে বোঝাতে অনেক চেষ্টা করেন। আমার স্বামী তখন বহুভোগের সন্ধান পেয়েছেন। তারপর ১৯৭০ সালের এক রাতে আনন্দকে আমার শাশুড়ির বিছানায় রেখে আমি হায়দারের সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানে আসি। হায়দার আমাকে তার বড় বোনের বাড়িতে নিয়ে তোলে। সম্ভবত আগেই তাদের ভেতর কথাবার্তা হয়েছে। আমি এখান থেকেই আমার স্বামীর কাছে তালাক প্রার্থনা করলে আশাতীত দ্রুততার সঙ্গে তালাকনামা এসে যায়। তখন সংগ্রাম তুঙ্গে। হায়দারও আগে থেকেই ব্যবসা গুটিয়ে এনেছিল। সব সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেল। ছ’মাস বাদে আমাদের বিয়ে হয় কিন্তু সন্তান হলো না। ১৯৮২ সালে আমি লোক মারফত আনন্দের একটি চিঠি পাই। সম্বোধন ‘মা’। চিঠিখানা এনেছিলেন হায়দারের এক বাঙালি বন্ধু। এরপর থেকে তার মাধ্যমে আমাদের চিঠিপত্র ফটো সব আসে। ঘুরে গিয়ে সামনের টিপয় থেকে এক সুন্দর সুঠাম দেহী যুবকের ফটো তিনি আমাকে দেখালেন। এই আনন্দ। একবারে মায়ের মুখ।
না, ওর বাপ আর বিয়ে করে নি। তার প্রয়োজনও ছিল না। তিনি বেঁচে গেলেন। আমার কলঙ্কে তাঁর সমাজ ছেয়ে গেল। অবশ্য পিতৃকুলের সঙ্গে আমার যোগাযোগ আছে। বাবা নেই, এ ধাক্কা সামলাতে পারেন নি। কিন্তু ভাই-বোনেরা সবাই আমার কাছে আসা যাওয়া করেন। আসে নি শুধু আনন্দ। সে নিজের পায়ে না দাঁড়িয়ে আসবে না। ব্যবসা সে করবে না। মাস্টারি অথবা অন্য কোনও চাকুরি করবে, মাকে নিবিড়ভাবে কাছে পেতে চায়।
