হোটেলে ফিরে এসে প্রচুর পানিতে গোসল করে স্থির হলাম। বড়ভাই চোখের জলে বিদায় নিলেন। ভাবি আসবার সময় একটা দামি শাড়ি দিলেন।
কাল সকালে চলে যাবো। এসেছিলাম প্রচণ্ড উত্তেজনা নিয়ে, ফিরে যাচ্ছি শান্ত সমাহিত হৃদয়ে। মনে হচ্ছে যেন জন্মভূমির সঙ্গে দেনা-পাওনা আমার চুকে গেছে। এয়ারপোর্টে আনন্দ এলো। আমার হাতে দুটো প্যাকেট দিলো ওপরে লেখা মা। বললো খালাম্মা, মাকে বলবেন এ ঢাকাই শাড়ি আমার নিজের উপার্জনের টাকায় কেনা, একথাটা বলতে ভুলবেন না। দেখা হবে করাটীতে, পা ছুঁয়ে সালাম করে দ্রুত চলে গেল। মনে হলো কিছুটা নিজেকে সামলাতে পারলাম। আমি তাকিয়ে রইলাম ওই নিঃস্ব, মাতৃহারা, সব হারানো মানুষটার দিকে।
ফিরে এলাম নিজস্ব বৃত্তে। এই আমার কর্মস্থল, আশ্রয়। তাজ হার পেয়ে মহাখুশি, গলায় পরে বসলো। বললো, নানার সঙ্গে সব সময় আমার কোলাকুলি হবে। এর জন্য আনা পাঞ্জাবী ওকে দিলাম। শুধু শুনতে চায় গল্প কিন্তু আমার সব কথা তো ফুরিয়ে গেছে। সালমা বেগম খুশিতে হাউ মাউ করে কেঁদে উঠলেন। হায়দার সাহেবের চোখও শুকনো ছিল না। আমি এখন ছোটবোনের মতো ওঁর সামনে বের হই। মনে হলো এঁদের জন্যে আমার যাওয়াটা সার্থক হয়েছে।
নাই-বা পেলাম জাতীয় পতাকা, নাই-বা পেলাম আমার সোনার বাংলা, কিন্তু আমি জাতির পিতার স্বপ্ন সফল করেছি। একজন যুদ্ধজয়ী বীরাঙ্গনা রূপে বাংলাদেশ ছুঁয়ে এসেছি। এটুকুই আমার জয়, আমার গর্ব, আমার সকল পাওয়ার বড় পাওয়া।
৩. রীনা
০৩.
আমি রীনা বলছি। আশাকরি আমার পরিচয় আপনাদের কাছে সবিস্তারে দেবার কিছু নেই। আমাকে নিয়ে আপনারা এতো হৈ চৈ করেছিলেন যে ত্রিশ হাজার পাকিস্তানি বন্দি হঠাৎ ভাবলো বাংলাদেশ থেকে কোনো হেলেনকে তারা হরণ করে নিয়ে যাচ্ছে। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ অবশ্য খুব বেশি বিস্মিত হন নি কারণ আমার মতো আরও দু’চারজন এ সৌভাগ্যের অধিকারিণী হয়েছিলেন। অবশ্য পাকিস্তানিরা কিন্তু আমাদের জোর করে ধরে নিয়ে যাচ্ছিল না, আমরা স্বেচ্ছায় ওদের সঙ্গে যাচ্ছিলাম। কারণ বাংকার থেকে আমাকে যখন ভারতীয় বাহিনীর এক সদস্য অর্ধ উলঙ্গ এবং অর্ধমৃত অবস্থায় টেনে তোলে তখন আশেপাশের দেশবাসীর চোখে মুখে যে ঘৃণা ও বঞ্চনা আমি দেখেছিলাম তাতে দ্বিতীয়বার আর চোখ তুলতে পারি নি। জঘন্য ভাষায় যেসব মন্তব্য আমার দিকে তারা ছুঁড়ে দিচ্ছিল… ভাগ্যিস বিদেশীরা আমাদের সহজ বুলি বুঝতে পারে নি।
ওরা খুব সহানুভূতির সঙ্গে আমাকে টেনে তুলে সংশ্লিষ্ট ক্যাম্পে নিয়ে গেল। গোসল করে কাপড় বদলাবার সুযোগ দিলো। জিজ্ঞেস করলো, কিছু খাবো কিনা? মাথা নেড়ে অসম্মতি জানালাম। তারপর ওদের সহায়তায় জিপে উঠলাম। আমি ভালো করে পা ফেলতে পারছিলাম না, পা টলছিল, মাথাও ঘুরছিল। ওরা দ্রুত আমাকে আরও তিনজনের সঙ্গে গাড়িতে তুলে নিলো। ওদের কথায় বুঝলাম আমরা ঢাকা যাচ্ছি। ঠিক বুঝতে পারছিলাম না আমি জীবিত না মৃত? এমন পরিণাম কখনও তো ভাবি নি। ভেবেছিলাম একদিন বাংকারে মরে পড়ে থাকবো আর প্রয়োজনে না লাগলে ওরাই মেরে ফেলে দেবে। লোকসমাজে বেরুবো, এতো ঘৃণা ধিক্কার দেশের লোকের কাছ থেকে পাবো তাতো কল্পনাও করি নি।
ভেবেছিলাম যদি মুক্তিবাহিনী আমাদের কখনও পায়, মা-বোনের আদরে মাথায় তুলে নেবে। কারণ আমরা তো স্বেচ্ছায় এ পথে আসি নি। ওরা আমাদের বাড়িতে একা ফেলে রেখে দেশের কাজে গিয়েছিল এ কথা সত্যি। কিন্তু আমাদের রক্ষা করবার দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছিল কার ওপর? একবারও কি আমাদের পরিণামের কথা ভাবেনি? আমরা কেমন করে নিজেকে বাঁচাবো, যুদ্ধের উন্মাদনায় আমাদের কথা তো কেউ মনে রাখে নি। পেছনে পড়েছিল গর্ভবতী স্ত্রী, বিধবা মা, যুবতী ভগ্নী কারও কথাই সেদিন মনে হয় নি। অথচ তাদের আত্মরক্ষার তো কোনও ব্যবস্থাই ছিল না। বৃদ্ধ পিতা-মাতা মরে বেঁচেছেন, গর্ভবতী পত্নীর সন্তান গর্ভেই নিহত হয়েছে। যুবতী স্ত্রী, তরুণী ভগ্নী পাকদস্যুদের শয্যাশায়িনী হয়েছে। অথচ আজ যখন বিজয়ের লগ্ন এসেছে, মুক্তির মুহূর্ত উপস্থিত হয়েছে তখনও একবুক ঘৃণা নিয়ে তাদের দিকে দৃষ্টিপাত করছে সামাজিক জীবেরা। একটা পৃথই এসব মেয়েদের জন্যে খোলা ছিল-তা হলো মৃত্যু। নিজেকে যখন রক্ষা করতে পারে নি, তখন মরে নি কেন? সে পথ তো কেউ আটকে রাখেনি। কিন্তু কেন মরবো? সে প্রশ্ন তো আমার আজও। মরি নি বলে আজও. আর পাঁচজনের মতো আছি, ভালোই আছি, জাগতিক কোনও সুখেরই অভাব নেই। নেই শুধু বীরাঙ্গনার সম্মান। উপরন্তু গোপনে পাই ঘৃণা, অবজ্ঞা আর ভ্রুকুঞ্চিত অবমাননা।
সে কবে, কতোদিন আগে? আমার একটা অতীত ছিল, ছিল বাবা-মা বড়ভাই আসাদ আর ছোটভাই আশফাক। বাবা পাকিস্তান সরকারের বড় চাকুরে। কাকাও লাহোর রাওয়ালপিন্ডি কখনও ঢাকা। বড়ভাই বিএ পরীক্ষা দিয়ে আর্মিতে ঢুকলেন। বাঙালির প্রতি অবজ্ঞা তিনি ঘোচাবেন। আব্বার ইচ্ছা ছিল না কিন্তু তিনি বাধাও দিলেন না। ট্রেনিং শেষ করে কিছুদিন রইলো শিয়ালকোটে, তারপর একেবারে কুমিল্লায়। ততোদিনে আব্বা রিটায়ার করেছেন। আশফাক ইঞ্জিনিয়ারিং দ্বিতীয় বর্ষ আর আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্রী। বড় সুখে আনন্দে কেটে যাচ্ছিল আমাদের দিনগুলো। আতাউরের সঙ্গে কিছুটা মন দেওয়া নেওয়া যে হয় নি তা নয়, তবে ফাইনাল পরীক্ষার আগে কিছু প্রকাশ করবার সাহস আমার ছিল না। আতাউর ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে পিএইচডি করবার জন্যে আমেরিকা যাচ্ছে। নিজেরা ঠিক করলাম ও চলে যাক, পরীক্ষা হলে আমারও যাবার ব্যবস্থায় বাধা থাকবে না।
