দু’মাসের ভেতরেই লায়েক খান চলে গেল। বড় ছেলে এসে তাজকে নিয়ে গেল। আমি পাথর হয়ে গেলাম। শুধু আমাকে বললো, বড়মা বলেছে আপনি আব্বাকে মাফ করে দেবেন। না হলে তার গোর আজাব হবে। আমি মনে হয় ডুকরে কেঁদে উঠেছিলাম। তাজ জড়িয়ে ধরলো আমাকে, বড় ছেলেও ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। ছেলেকে বললাম, তোমার আম্মা আমার বড়বোন, তাকে আমার সালাম জানিও। যখনই ইচ্ছে হয়, করাচী বেড়াতে আমার কাছে এসো। ওরা চলে গেল।
লায়েক খান আমাকে চিরমুক্তি দিয়ে গেল। কিন্তু মুক্তি চাইলে কি মুক্তি পাওয়া যায়? ওই যে ওপরে একজন বসে আছেন স্টিয়ারিং হুইল ধরে, তিনি বান্দার জীবনের গতি যে দিকে নিয়ন্ত্রণ করবেন, সেদিকেই যেতে হবে।
বাপের কৃত করে তাজ ফিরে এলো। মনে হয় রাতারাতি ওর বয়স অনেক বেড়ে গেছে। আগে রাতদিন ধরে কতো গল্প করতো, কথা যেন আর শেষ হতে চাইতো না। এবার চুপ করে বসে থাকে, আমাকেও তেমন কিছু বলে না। মনে হয় ওর বাপের মৃত্যু ওর আর আমার মাঝখানের ব্যক্তিত্বের ব্যবধান সৃষ্টি করে গেছে। ও ওর শেকড় খুঁজে পেয়েছে।
আজকাল আমার একবার দেশে যেতে খুব ইচ্ছে করে। বাবা নেই, বড় ভাই বিয়ে করেছে। ছোটটাও করবে শীগগির। ও আমাকে লিখেছে, আগে থাকতে জানাবে আমি যেন ওর বিয়েতে যাই। আমার কোনো অসুবিধা হবে না। আমাদের এখন দোতলা দালান বাড়ি। নরসিংদীর দোকান এখন অনেক বড় হয়ে গেছে। নদীর ওপর পুল হয়েছে। আধা ঘণ্টায় ঢাকা যাওয়া যায়। কল্পনার চোখ মেলে শীতলক্ষ্যাকে দেখি, নরসিংদীর গাছপালা, নদী, নৌকা, বড় বড় মাছ সবই তো তেমন আছে শুধু আমি নেই। আমিতো হারিয়ে গেছি, সবাই ভুলে গেছে। কিন্তু আমি ভুলতে পারি না কেন? কেন আমার মাটি আমাকে এমন করে টানে। না, ভাইয়ের বিয়ে নয়, তার আগেই আমাকে একবার যেতেই হবে। অবশ্য তাজের সঙ্গে পরামর্শ করেই যাবো।
তাজ ফৌজীতে যোগ দিলো। ইঞ্জিনিয়ারিং কোরে। আইএসসিতে ভালোই ফল করেছিলো। সহজেই সুযোগ পেয়ে গেল। ট্রেনিং থেকে ছুটিতে যখন আসতো ওর সুন্দর সুঠাম দেহে ইউনিফর্ম পরা ওকে দেখলে সত্যিই লায়েক খানের জন্য আমার দুঃখ হতো। ভঙ্গীও পাকিস্তানিদের মতো দুর্বিনীত। আমার বার বার একাত্তরের কথা মনে হতো, প্রয়োজনে আমার ছেলেও কি অমন বন্য জানোয়ার হবে? না, না, ওর দেহে তো আমার রক্তও আছে, আর ওর বাবা তো সত্যিই পশু প্রকৃতির ছিল না, তাহলে আমাকে ঠাই দিয়েছিল কেমন করে? না, আজকে আমি যে তাজের নামে উৎসর্গ করেছি। ও যেন দেশ ও দশের জন্য নিজেকে উৎসর্গীত করতে পারে।
একদিন কথা প্রসঙ্গে আমি ওকে বাংলাদেশ যাবার ইচ্ছার কথা জানালাম। আশ্চর্য, ও খুব খুশি। বললো, তুমি যাও ঘুরে এসো আমাকে তো এখন যেতে অনুমতি দেবে না। চাকুরিতে যোগ দেবার পর আমি নিশ্চয়ই চেষ্টা করবো। তুমি ঘুরে এসো। একান্ত সহযোগিতা ও সহমর্মিতার স্পর্শ পেলাম ছেলের কথায়। ভাবতে লাগলাম কেমন করে কি করবো।
এমন সময় সুযোগ জুটে গেল। হঠাৎ সালমা বেগম ফোন করলেন। মেহের, দুপুরের পর একবার আসতে পারো? বাংলাদেশ থেকে একটি মহিলা প্রতিনিধি দল এসেছে এখানে একটা কনফারেন্সে যোগ দিতে। আমি সাত-আট জনকে রাতে খেতে বলেছি। তুমি এলে…। আমি কথা শেষ করতে দিলাম না। আমি নিশ্চয়ই আসবে আপা। উনি বললেন, একটা কাজ করো, বাড়িতে ব্যবস্থা করে এসো যেন রাতে ফিরতে না হয়। তাই-ই হলো। আমি মনে হয় পাখির মতো উড়ে গেলাম। কারা আসছেন জিজ্ঞেস করেও লাভ নেই। আমি ঢাকায় শুধু সুফিয়া কামালের নাম শুনেছি তবে চোখে দেখি নি। আমি সুন্দর করে আমাদের প্রিয় মাছ রান্না করলাম। আমরা তো মাছ ভালোবাসি। আমি এতো দুঃখেও, এক টুকরো মাছ না হলে, ভাত খেতে পারি না।
ওঁরা এলেন ছ’জন আর এখানকার চারজন মোট দশজন। সালমা বেগম আমার পরিচয় করিয়ে দিলেন ওর ছোট বোন বলে। প্রতিবাদ করবার সুযোগ পেলাম না। বললেন, কুটির শিল্পের ওপর খুব ভালো কাজ করছি। দশ-বারোজন মেয়ের রুটি জি আমার ওখান থেকে হচ্ছে। সবাই সম্ভমের দৃষ্টিতে আমাকে দেখলেন। কিন্তু আমার দৃষ্টি আটকে গেল সেই আপার দিকে, যিনি ঢাকা ছাড়বার আগের দিন আমাকে হাতে ধরে বলেছিলেন, তুমি যেয়ো না, আমি রাখবো তোমাকে। সেই স্নেহময় কণ্ঠ আর মিনতিভরা দৃষ্টি আমি আজও ভুলতে পারি নি। এখন বয়স হয়ে গেছে। চুল অনেক শাদা হয়ে গেছে, কিন্তু সেই সৌম্য মুখশ্রী ঠিক তেমনই কোমল ও সতেজ। উনিও বার বার আমার দিকে দেখছেন। হঠাৎ দ্রুত আমার কাছে এসে কানের কাছে মুখ নিয়ে বললেন, আপনি মেহেরুন্নেসা? হেসে মাথা নিচু করে বললাম, আপা, সেদিন কিন্তু আদর করে কাছে নিয়ে তুমি সম্বোধন করেছিলেন। বললেন, তোমার সঙ্গে কথা না বলে আমি পাকিস্তান ছাড়বো না। সালমা বেগমের উনি নাকি শিক্ষক, তাই এতো সমাদর। সালমা বেগম আমার কাছে একটা সুতির কাজ করা শাড়িও চেয়েছেন সন্ধেবেলা। তাহলে সেটা কি ওই আপার জন্য?
খাওয়া দাওয়া পর্ব চুকলো। কফি খেয়ে প্রায় সাড়ে বারোটায় সবাই হোটেলে ফিরে গেলেন। সালমা বেগমের সঙ্গে আপার কি আলাপ হলো জানি না, উনিও আমাকে খোদা হাফেজ’ বলে সবার মতোই বিদায় জানিয়ে গেলেন। সালমা বেগমের স্বামী হংকং গেছেন কি একটা ব্যবসায়ের কাজে। আমি রাতে ওঁর ঘরের নিচেই শুলাম। উনি অনেক টানাটানি করলেন ওর সঙ্গে খাটে শোবার জন্য। কিন্তু উনি উদারতা দেখালেও আমার তো সীমা লঙ্ঘন করা উচিত নয়। বললেন, কাল। সকালে আপা পারলো না, দুপুরে আমাদের সঙ্গে খাবেন আর তোমার সঙ্গে কথা বলবেন, ওঁদের সমিতির মেয়েদের তোমার কাছে এসে কাজের ট্রেনিং নিতে পাঠানো যায় কিনা। সবই বুঝলাম। উনি জানতে চান, আমি আত্মপরিচয়ে বেঁচে আছি না মুখোশ পরে চলছি।
