এরপর স্বামী চুপচাপ। যে যার কাজকর্ম করে চলেছি। দিন দেখতে দেখতে যায়। আজ দশ বছরে পড়লো। ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ছে। স্কুলের বাস এলে ও যখন ওঠে, আমি এক দৃষ্টে চেয়ে থাকি। লায়েক খান কি ভাবে জানি না, তবে আমি তো জানি যে ও আমারই সন্তান। গৌরবর্ণ সুঠাম দেহের বালক রীতিমতো বাড়ন্ত গড়ন দেখে মনে হয় তেরো চৌদ্দ বছর বয়স। লেখাপড়াতেও বেশ ভালো। আমি ওকে পুরোপুরি সাহায্য করতে পারি না। কারণ ও ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ে, তবে যতটুক পারি করি। ও নিজেই খুব মনোযোগী ছাত্র। ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে ও এখনই কথাবার্তা চালিয়ে যেতে পারে। বুকটা কেঁপে ওঠে, যখন ভাবি এসব ফেলে প্রচণ্ড রোদে ও ফসলের ক্ষেতে কাজ করছে। মনটা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে কিন্তু আমার আর উপায় কি? একদিন হঠাৎ তাজের আব্বা বললো, আগামী সপ্তাহে শুক্রবার আমরা যাবো। তাজকে তৈরি করে দিও। আমি মুখে কাপড় চাপা দিয়ে দৌড়ে পাশের ঘরে গেলাম। কানে এলো লায়েক খানের কণ্ঠ, কেঁদে কোনও লাভ নেই, শেরের বাচ্চা, শেরই হবে, কুকুর বিড়াল হবে না। কথাটা আমার অন্তরে কোথায় যে বিধলো ওই মূর্খ তা জানে না। বেশ বুঝলাম আজ নিরাপদ আশ্রয়ে দাঁড়িয়ে ও আমার বাপ ভাইদের গালাগালি দিলো। একবার ভাবলো না, আমি ইচ্ছে করলে ওকে শিয়াল কুকুর দিয়ে খাওয়াতে পারতাম। বুঝলাম মানুষের জন্মভূমির টান বড় গভীর, তাকে ভুলে থাকলেও ভোলা যায় না। আজ আমার ও লায়েক খানের মধ্যে সেই শেকড়ের দ্বন্দ্ব বেড়েছে। কিন্তু তাজ? দুই নদীর মোহনায় দাঁড়িয়ে সে কি করবে?
তাজ স্কুল থেকে ফিরলে আমি ধীরে ধীরে তাকে সব কথা বললাম। তার আব্বা তাকে আগেই বলেছে সে বয়স্ক মানুষের মতো ভ্রূ কুঁচকালো, কোনও শব্দ করলো না। যাবার আগের দিনে চোখের জলে আমি যখন তার জিনিসপত্র গোছাতে গেছি, তাজ রক্তচক্ষু করে আমাকে নির্দেশ দিলো-আমার কোনও জিনিস ধরবে না। ওর কাছ থেকে এই আমার প্রথম ধমক। থমকে গেলাম, তারপর আস্তে ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। যাবার দিন তাজ যথারীতি তৈরি হলো স্কুলে যাবার জন্য, দেশে নয়। ওর আব্বা কি যেন বললো, ছেলে উত্তর দিলো আমার পরীক্ষার পর যখন আমাদের স্কুল বন্ধ হবে তখন যাবো। বড় আম্মাকে আমার সালাম পৌঁছে দিও। তারপর জানি না কি দিলো বাপকে, বললো, ফাতিমা বাহিনজিকে আমার কথা বলে দিও, আর আমার সালাম জানিও। লায়েক খান একটা কথাও বললো না, সত্যিই শেরকা বাচ্চা শের আমি সেটুকুই বুঝলাম। লায়েক খান চলে গেল। আমাকে শুধু বললো, তোমার বেটা লায়েক হয়েছে সাবধানে রেখো। তুমিও সাবধানে থেকো। ওর স্কুল বন্ধ হলে চিঠি লিখতে বলো, আমি এসে ওকে নিয়ে যাবো। চোখের জলে তাকে বিদায় দিলাম। আমি চাই নি সে যাক, কিন্তু তার প্রথম জীবনের প্রেম, বয়স্ক দুই ছেলে, অতি আদরের ফাতিমা–এদের ফেলে সে আর থাকতে পারছিল না, তার সত্যিই কষ্ট হচ্ছিল।
এরপর সালমা বেগমকে জিজ্ঞেস করলাম আমি কি করবো? তিনি পরামর্শ দিলেন আমার নিজের বাড়িতে চলে যেতে। কারণ তাদের নতুন লোককে তো ওই কোয়ার্টার ছেড়ে দিতে হবে। সালমা বেগমই সব বন্দোবস্ত করে দিলেন। তাজ মহাখুশি, তার মায়ের নিজের বাড়ি এ-কথা তো সে ভাবতেই পারে নি। তাজ মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে বললো, আম্মু, আজ আর আমরা কারও বাড়ির নোকরের ঘরের বাসিন্দা নই। আমরা আমাদের নিজেদের মাকানে থাকি, কোয়া নয়। আমার চোখের পানি বাধা মানলো না। বললাম, আলু, এসবই করেছি তোমার জন্য। তোমাকে ও যদি জোর করে নিয়ে যেতো, আমি পাগল হয়ে যেতাম। হয়তো পথে পথে ঘুরতাম। মা ছেলের চোখের জল এক হয়ে মিশে গেল। সে আনন্দঘন মুহূর্তটির কথা আমি এখনও ভুলতে পারি না।
দিন যায় কিন্তু সব সময়ে যাবার গতি ও রীতি এক হয় না। কখনও দ্রুত লয়ে, কখনও মন্দাক্রান্ত তালে। মার দিন কিন্তু দ্রুতলয়ে কখনও যায় নি। আমার আশ্রয়দাতা স্বামী আমাকে একা ফেলে চলে যাবার পর থেকে কেন যেন একটা আত্ম প্রত্যয় আমাকে ভর করেছে। ভাবলাম আমি যদি সত্যিই লায়েক খানের স্বাভাবিক বিবাহিত স্ত্রী হতাম, তাহলে কি আমাকে এভাবে ফেলে যেতে পারতো? না, সে আমায় বিয়ে করে নি, আমি বোঝা হয়ে ঘাড়ে চেপেছিলাম। এতোদিন যে সে আমাকে আশ্রয় দিয়েছে, বিবাহিতা স্ত্রীর সম্মান ও মর্যাদা দিয়েছে সেই তো যথেষ্ট। সবার ওপরে তাজের পিতৃত্ব গ্রহণ করে আমাকে সত্যিই বীরাঙ্গনা করেছে, সব চেয়ে আশ্চর্য এই লম্বাচওড়া বয়স্ক পাঠানের মনে কখনও কোনও সন্দেহ উঁকি দেয় নি। অথচ ভয়ে শংকায় আমি দশমাস কতো বিনিদ্র রজনী যাপন করেছি। কিন্তু তাজ ভূমিষ্ঠ হবার পর আমার দ্বিধা দ্বন্দ্ব সব মুছে গেছে। একেবারে লায়েক খানের নাল নকশা।
তাজ লাফিয়ে লাফিয়ে স্কুলের সিঁড়ি ডিঙিয়ে গেল। আমিও সালমা বেগমের সহায়তায় প্রাইভেট পড়ে কলেজে ভর্তি হয়ে ক্লাশ না করেও বিএ পাশ করে ফেললাম। এদিকে বাড়িতে ছোটখাটো সেলাইয়ের একটা শিক্ষাকেন্দ্র খুলেছিলাম। পরে সেখানে থেকে নানা পোশাক-এমব্রয়ডারী, জরির কাজ, লেসের কাজ ইত্যাদি করাই প্রায় দশজন মেয়েকে নিয়ে। ওরা মাসে প্রায় পাঁচশ টাকা করে উপার্জন করে আর আমার পাঁচ সাত হাজার হয়।
তাজ যখন আইএসসি পরীক্ষা দেবে, সেবারের ছুটিতে ওর বাপ এলো না। চিঠি এলো বাপের তবিয়ত খারাপ। তাজ যেন যায়। তাজ বড়মার জন্য কাপড়-জামা, বোনের জন্য পোশাক সব আমাকে দিয়ে কেনালো। আমি ওর বাবাকে একটা কুর্তা আর নিজ হাতে কাজ করা টুপি দিলাম। ছেলে দু’সপ্তাহ থেকে এলো। খুব খুশি। বড়মা কি কি খাইয়েছে, ভাইয়েরা কোথায় কোথায় নিয়ে গেছে, বোন কত আদর করেছে ওর মুখের কথা যেন আর শেষ হয় না। সব শেষে বললো কুর্তা আর টুপি পেয়ে ওর আব্বা খুব খুশি হয়েছে কিন্তু শরীর খুব খারাপ। বললো, আর হয়তো একা করাচী আসতে পারবে না, তোমার সঙ্গে দেখাও হবে না। তোমার কাছে মাফ চেয়েছে। দেখলাম চোখে পানি। ঠিক বুঝলাম না। শুধু আমাকে বললো বেটা, তোমাকে ফৌজী অফিসার হতে হবে। আমি তো আনপড়া বলে সিপাহী হয়েই জিন্দেগী পার করলাম। কিন্তু তোমাকে বড় হতে হবে। তাজও চোখ মুছল।
