আমার সব কথাই সালমা বেগমকে বলতাম কারণ তারও তো ভেতরে একটা গভীর ক্ষত আছে। যার রক্তক্ষরণ শুধু আমিই উপলব্ধি করি, তার বংশ নেই। অন্য সময় তো তিনি হাসি-খুশি পতি পরায়ন স্ত্রী, সন্তান না পাবার দুঃখ সম্পর্কে বলতেন, মেহের আমার খুব বেশি দুঃখ নেইরে, কি হতো সন্তান থাকলে? ওরা তো আমার হতো না, আমার পরিচয় দিতে লজ্জাবোধ কতো, লুকিয়ে থাকতো। ওর এক ভাইয়ের ছেলেকে কাছে রেখেছিলাম। পেটের ছেলে কেমন হয় জানি না কিন্তু সোহেল আমার বুক জুড়ে ছিল। একদিন টাকা পয়সার কি ব্যাপার নিয়ে দু’ভাইয়ে মনোমালিন্য হলো। আমার জা আর দেওর এসে ছেলেকে কেড়ে নিয়ে গেল। মেহের, যাবার সময় তার আর্ত চিৎকার আম্মি আম্মি আমার আজও কানে বাজে। এখন সে আমেরিকায় পড়াশুনা করে। চিঠি লেখে। কিন্তু যে বাধন ছিঁড়ে গেছে তাকে আর আমি জোড়া লাগাতে চাই না। হঠাৎ এমন হলো কেন বেগম সাহেবা? মুচকি হাসলেন সালমা বেগম। মেহের, দুনিয়াটা বড় রুক্ষ্ম বড় শুকনো। আমি অথবা ওর চাচা মরে গেলে আমাদের সব সম্পত্তিই সোহেল পেতো তেমন ব্যবস্থা সাহেব করবেন বলেছিলাম। কিন্তু আমার দেওর হঠাৎ একদিন এসে বললো, তোমার পিণ্ডির বাড়িটা সোহেলকে দিয়ে দাও। বাড়িটায় একটা ভালো হোটেল চলছে, ভাড়াও অনেক পাই আমরা। উনি বললেন, হঠাৎ এ কথা কেন? দেওর বললেন, খোদা না খাস্তা তোমার কিছু হলে ভাবিকে বিশ্বাস কি? বাংলা মুলুকের মেয়ে ওর ঈমানের ঠিক আছে? আমার স্বামী হঠাৎ প্রচণ্ড রকম রেগে গেলেন। মানুষটা খুবই শান্ত ও ধীর স্বভাবের। কিন্তু কঠোর ভাষায় ভাইকে বকাবকি করলেন! ওকে বোবা বানিয়ে দিয়ে ছেলের হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল। ভেতরে এসে আমার হাতটা ধরে বললেন, সালমা, ধৈর্য ধরো, দুঃখ করো না, আমার ঘরে সন্তান নেই। যদি বুক দিয়ে আমরা ভালোবাসতে পারি, তবে সারা পৃথিবীর এতিম আমাদের সন্তান। করাচীর দুতিনটা এতিম খানায় এরপর থেকে উনি নিয়মিত অর্থ সাহায্য করেন। আমি বললাম, বেগম সাহেবা ঈদের দিনে অনেক লোক আসে বাচ্চা নিয়ে ওরা কারা? আরে ওরাই তো এতিমখানার বাচ্চার। ঈদের সময় তিনদিন পালা করে এদের খাওয়াই। কাপড় জামা কিনে দিই। ওটাই আমার সারা জীবনের সব চেয়ে বড় উৎসব। এখন কিন্তু আমার খারাপ লাগে না। মেহের তোকে বলে রাখি এমনি করে লায়েক খানও একদিন ওর বাচ্চাকে টেনে নিয়ে যাবে। ওরা সব কিছুর ওপর ওদের কওমের মর্যাদা দেয়। মাথা নিচু করে বললাম, তবুও বেগম সাহেবা আমি অন্তত ওকে লেখাপড়া করাবার চেষ্টা করবো আর আশা করি তাজের আব্বারও ওতে আপত্তি হবে না। না হলেই ভালো, জবাব দিলেন সালমা বেগম।
একদিন কথা প্রসঙ্গে সালমা বেগমকে বললাম, এখানে তো কতো হাউজিং আছে। আমার মতো গরীবরা মাস মাস টাকা দিয়ে ঘর নেয়। আমাকে যদি একটা ব্যবস্থা করে দিতেন কারণ আমি জানি লায়েক খান আর খুব বেশিদিন থাকতে চাইবে না। তখন আমার কি উপায় হবে। আমার তো বেশ কিছু টাকা জমেছে। দরকার হলে আমি আরও বেশি করে কাজ করবো। সালমা বেগম চেষ্টা করবেন বললেন এবং মাসখানেক পর সত্যিই খবর আনলেন একটা হাউজিং-এর দু’কামরার ঘর, সঙ্গে ডাইনিং ও ড্রইংরুম এবং পাকঘর ও বাথরুম। প্রথমে পঞ্চাশ হাজার টাকা দিতে হবে। পরে কিস্তিতে শোধ দিলে হবে। মোট দাম পড়বে আড়াই লাখ টাকা।
সালমা বেগমের কাছে আমি টাকা জমাই। সেখানে চল্লিশ হাজার টাকা জমেছে। আমি ভাবতেও পারি নি আমার এতো টাকা হয়েছে। বললেন, বাড়ি তুমি দেখে এসো, টাকার দায়িত্ব আমি নেবো। তবে একটা কথা এ বাড়ি নেওয়ার ব্যাপারে তুমি লায়েক খানকে কিছু জানিও না। পুরুষ বড় লোভী আর স্বার্থপর জাত। তাছাড়া ওরা পাঠান, রাগলে না পারে এমন কাজ নেই। সব টুকুই তোমাকে গোপনে করতে হবে। এখন বাড়ি নিয়ে ভাড়া দিয়ে দিও, তার থেকেই তোমার বাকি দেনা শোধ হয়ে যাবে। কাটা আমার মনে ধরলো। আমি সালমা বেগমের কাছ থেকে ঠিকানা নিয়ে বাড়ি দেখে এলাম। আমার জন্য যথেষ্ট। আর বস্তির মতো নয়। বেশির ভাগই গরীব কেরানি, মাস্টার, সুতরাং পরিবেশ খারাপ নয়। সালমা বেগম দলিল তৈরি, লেখাপড়া, রেজিস্ট্রি ও পরের সব কাজই ওঁর সায়েবের অফিসের একজন বিশ্বাসী লোক দিয়ে করিয়ে দিলেন। আমি শুধু সঙ্গে সঙ্গে রইলাম এই পর্যন্ত। কিন্তু সত্যি কথা বলতে কি বাড়িটুকু নিয়ে আমার মনে হলো আমি শক্ত হয়ে দাঁড়াবার মতো এক টুকরো জমি পেয়েছি। লায়েক খান আজকাল বেশ ঘন ঘন দেশে যায়। বলে শরীর এখন আর নোক্রী করবার মতো নেই। সায়েবকে বলে একটা ব্যবস্থা করতে হবে। বললাম, আমার তাজের কি অবস্থা হবে? নির্লিপ্ত কণ্ঠে জবাব দিলো লায়েক খান, আমি বেগম সায়েবাকে বলে যাবো তোমাকে এখানেই রাখবেন আমি মাস মাস তোমার খোরাকি পাঠাবো। আর তাজ আমার ছেলে ওদের ভাইদের সঙ্গে বড় হবে। তাছাড়া ওর আম্মি ওকে খুবই পেয়ার করে। ওর জন্যে ভেবো না। কতো সহজে সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেল। কিন্তু আমি তাকে ছেড়ে থাকবো কি করে? তোমাকে থাকতেই হবে কারণ ওকে তো ওর বেরাদারীর সবাইকে জানতে হবে, চিনতে হবে। আমি ওকে কারও বাড়িতে নোকরী করতে দেবো না।
মৃদু কণ্ঠে বললাম, যাবে কবে? এখনও ঠিক করি নি দু’চার ছমাস আরও দেখবো তারপর যাবো। কিন্তু তাজের স্কুলের কি হবে? বলেছি না, ওর ভাইয়েরা আছে, ওর জিম্মাদরি নেবার লোকের অভাব হবে না। আমি পাথর হয়ে গেলাম। ঐ শিশুকে আমার বুক থেকে কেড়ে নিয়ে যাবে আর আমার খোরাকি পাঠিয়ে নিজেকে দায়মুক্ত করবে। আমার সাহস থাকলেও প্রকাশের ক্ষমতা নেই। এ বিদেশ বিভুঁইয়ে আমি একটা বাঙালি মেয়ে। বয়স কম, সুতরাং উদ্ধত আচরণ করার শক্তি কোথায়? সালমা বেগম অবশ্য এমনি একটা ঘটনার আভাস আমাকে বার বার দিয়েছেন। উনি দীর্ঘদিন আছেন। এদের আচার ব্যবহার রুচি তার তো কিছুই অজানা নেই। স্বামীর কর্তৃত্ব আমার দেশেও আছে, কিন্তু এমন ভয়ানকভাবে নয়। একটা পয়সার জিনিস কিনতে হলে স্বামীর অনুমতি লাগবে, ঘর থেকে এক পা বেরুতে হলে স্বামীর হুকুম আবশ্যক। দাসী আর কাকে বলে। নিজেকে সামলাতে দু’একদিন লাগলো। তারপর সালমা বেগমের কাছে গিয়ে একেবারে ভেঙে পড়লাম। উনি স্বান্ত্বনা দিয়ে বললেন, এমন যে হবে তা আমি তোমাকে আগেই বলেছি। ওর বয়স হয়েছে, এখন বউয়ের সেবা যত্ন চায়। তাছাড়া তুমি ওরটা যতোই করো ওরও একটা পারিবারিক নিয়ম কানুন আছে। তোমার কাছে ও একেবারে খোলামেলা হতে পারে না। ও ভুলতে পারে না তোমার সঙ্গে ওর ব্যবধানটা। সুতরাং শক্ত হও, নিজেকে বাঁচাবার কথা ভাবো। ধীরে ধীরে আমার মানসিক উত্তেজনা কমে এলো। সালমা বেগমের কথার সত্যতা উপলব্ধি করলাম। সত্যিই তো আমার কি হবে? ভেবে আর কি করবো, যা হবার তাই তো হবে। জীবনে তো চড়াই উত্রাই কম হলো না। কষ্ট পেয়েছি কিন্তু যেভাবেই হোক প্রতিরোধ করতেও তো সক্ষম হয়েছি।
