এখন প্রশ্ন, তাহলে আমরা কী করব? আমাদের সামনে পেছনে, ডানে বায়ে বিশাল প্রশান্ত মহাসাগর। এই মহাসমুদ্রের কোথায় কি আছে সে সম্পর্কে এত সামান্য আমরা জানি যে, যদি আমরা নিজেদের দোষে ধরা না পড়ি তো আমার মনে হয় না কেউ আমাদের খুঁজে বের করে ধরতে পারবে। সুতরাং এই মুহূর্তে আমাদের যা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তা হলো একজন নেতা, যার নির্দেশ কোন রকম প্রশ্ন না তুললেই আমরা মেনে নেব। আমাকে যদি তোমরা নেতা নির্বাচন করো, আমি নিঃশর্ত বাধ্যতা চাইব তোমাদের কাছে-হ্যাঁ, নিঃশর্ত বাধ্যতা। বিনিময়ে আমি শুধু এটুকু নিশ্চয়তা দিতে পারি, তোমাদের কারও ওপর কোন অন্যায় আমি করব না; যথার্থ কারণ না থাকলে কাউকে শাস্তি দেব না। আমি এমন কোন কাজ করব না-অন্তত আমার জ্ঞান মতে-যাতে, তোমাদের কারও কোন ক্ষতি হয়।
এখন বলো তোমরা কি করবে? আমি চাই তোমরাই ঠিক করবে কে পরিচালনা করবে বাউন্টিকে। যদি মনে করো আমার চেয়ে যোগ্য লোক তোমাদের ভেতর আছে, নাম বলো, তার সমর্থনে আমি ছেড়ে দেব আমার নেতৃত্বের দাবি। আর যদি মনে করো, আমিই যোগ্য তাহলে আমার ওই কথা-কোন প্রশ্ন না তুলে মেনে নিতে হবে আমার আদেশ-সে যেকোন পরিস্থিতিতে যেকোন আদেশই হোক।
থামল ক্রিশ্চিয়ান। চুপ সবাই। কি বলবে বা বলা উচিত কেউ যেন বুঝতে পারছে না। যা, বলো, কি বলার আছে তোমাদের? অবশেষে নীরবতা ভাঙল চার্চিল।
আমার মনে হয় মিস্টার ক্রিশ্চিয়ানই সবচেয়ে যোগ্য লোক আমাদের ভেতর, স্মিথ বলল।
সঙ্গে সঙ্গে স্মিথের সমর্থনে হ্যাঁ, হ্যাঁ করে উঠল বেশির ভাগ বিদ্রোহী। বাদ রইল কেবল থম্পসন আর উইলিয়ামস। তবে ক্রিশ্চিয়ান যখন হাত তুলতে বলল তখন অন্যদের সঙ্গে সঙ্গে হাত তুলল ওরাও।
আর একটা ব্যাপারে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে, বলে চলল ক্রিশ্চিয়ান। আমাদের সঙ্গে এমন কয়েকজন লোক রয়েছে যারা জাহাজ দখলের ব্যাপারে কোন ভূমিকা নেয়নি। সুযোগ পেলে ব্লাইয়ের সঙ্গে চলে যেত…
শিকল দিয়ে বেঁধে রাখুন,বলে উঠল মিলস। নয়তো সুযোগ পেলেই আমাদের ক্ষতি করবে ওরা। _ এই জাহাজে সত্যিকারের কারণ না থাকলে কোন দিনই কাউকে আর শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হবে না, জবাব দিল ক্রিশ্চিয়ান। আমাদের সঙ্গে যোগ দেয়নি মানেই ওরা দোষ করেছে তা আমি মনে করি না। ওদের কাছে যা ভাল মনে হয়েছে তা-ই ওরা করেছে; ওদের সিদ্ধান্তকে আমি সম্মান করি। কিন্তু এখন-যখন আমাদের আর ওদের ভাগ্য এক সাথে বাধা হয়ে গেছে তখন যদি কোনরকম ছল-চাতুরী বা বিশ্বাসঘাতকতা করে কি শাস্তি ওদের দিতে হবে তা আমি জানি। ওদের ওপরই ছেড়ে দিচ্ছি ঠিক করার ভার-ওরা কি করবে।
এর পর এক একে আমাদের প্রত্যেককে আলাদা ভাবে ডেকে ক্রিশ্চিয়ান জিজ্ঞেস করল, আমরা এই জাহাজের একজন হিসেবে অন্যদের সাথে সহযোগিতা করতে রাজি আছি কি না। আমরা বললাম, নতুন, ক্যাপ্টেনের নির্দেশ আমরা মেনে চলব, আমাদের সাধ্যমত সাহায্য করব জাহাজ পরিচালনায়, এবং বিশ্বাসঘাতকতা করার কোন রকম চেষ্টা করব না-অন্তত যতক্ষণ জাহাজে আছি ততক্ষণ না।
এটুকুই যথেষ্ট, আমাদের সবার বক্তব্য শোনার পর ক্রিশ্চিয়ান বলল। তোমাদের কাছ থেকে এর বেশি কিছু চাই না আমি।
এর পর নতুনভাবে বাউন্টির অফিসারদের নির্বাচন করা হলো। ইয়ংকে করা হলো মাস্টার, স্টুয়ার্টকে মাস্টারের মেট, আমাকে কোয়ার্টার মাস্টার, মরিসনকে সারেং আর আলেকজান্ডার স্মিথকে সারেং-এর মেট। চার্চিল যা ছিল তা-ই রইল, অর্থাৎ মাস্টার অ্যাট আর্মস। বারকিট আর হিন্দ্রান্ডটকে করা হলো কোয়ার্টার মাস্টারের মেট। মিলওয়ার্ড আর বায়ার্নের ওপর দায়িত্ব দেয়া হলো রান্নাঘরের। আগের মতই তিন চৌকিতে ভাগ করা হলো আমাদের।
এই সব খুঁটিনাটি বিষয়গুলো মীমাংসা হয়ে যেতেই আমরা লেগে গেলাম যার যার কাজে। নিচের বড় কেবিনটা ফাঁকা করা হলো প্রথমে। রুটিফলের চারাগুলো সব ছুঁড়ে ফেলে দেয়া হলো সাগরে। এই কেবিনেরই এক অংশে সামান্য কিছু অদলবদল করে ক্রিশ্চিয়ানের থাকার জায়গা করা হলো। অস্ত্রের সিন্দুকটা নিয়ে যাওয়া হলো সেখানে। ক্রিশ্চিয়ান ওটাকে চৌকি হিসেবে ব্যবহার করতে লাগল। সিন্দুকটার চাবি ও নিজের কাছে রাখল। বিদ্রোহীদের একজনকে রাতদিন পাহারা দেয়ার জন্যে বসিয়ে দেয়া হলো কেবিনটার দরজায়।
বিকেল পর্যন্ত আগের গতিপথেই চলল বাউন্টি। অর্থাৎ পশ্চিম-উত্তর পশ্চিম দিকে। তারপর দিক বদলানোর নির্দেশ দিল ক্রিশ্চিয়ান। সোজা পুব দিকে চললাম আমরা।
কয়েক ঘণ্টার ভেতর সম্পূর্ণ অজানা-যেখানে আগে কখনও কোন ইংলিশ জাহাজ আসেনি এমন সাগরে এসে পড়ল বাউন্টি। ক্রিশ্চিয়ানের মনোভাব আমি যদ্র অনুমান করতে পারছি; নির্জন বা এখন পর্যন্ত সভ্য দুনিয়ার কাছে
.
দিন কাটছে নিরুত্তাপ নিরুদ্বেগে। বাউন্টিতে, ওঠার পর এমন নিরুদ্বেগ দিন আমি বা আর কোন নাবিক কাটিয়েছে বলে মনে পড়ে না। ব্লাইয়ের অনুপস্থিতি আমাদের-যারা বিদ্রোহ করেছে, যারা করেনি, সবার জীবনে পরম এক স্বস্তি এনে দিয়েছে যেন। আগের মত সারাক্ষণ মানসিক চাপের ভেতর থাকা নেই; ক্যাপ্টেন ডেকে এলেই কি ঘটবে, কি ঘটবে-এই দুশ্চিন্তা নেই, নাবিকদের ভেতর নেই কোন অসন্তোষ, চাপা বিক্ষোভ। ক্রিশ্চিয়ানও ব্লাইয়ের মতই কড়াকড়ি ভাবে শৃঙ্খলা রক্ষা করে, কিন্তু সেজন্যে তার কথায় কথায় নাবিকদের চাবকানোর প্রয়োজন পড়ে না। ক্রিশ্চিয়ান জন্ম নেতা। চাবুক না মেরেও কি করে মানুষকে বশে রাখতে হয়, সুশৃঙ্খল রাখতে হয় সে জানে। একমাত্র ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা যদি সারাক্ষণ আমাদের মনকে কুরে কুরে না খেত তাহলে বলতে পারতাম ভালই আছি ক্রিশ্চিয়ানের অধীনে।
