আধঘন্টার ভেতর লঞ্চটা বিলীন হয়ে গেল দিগন্তে। ক্রিশ্চিয়ানের নির্দেশে পাল তুলে দেয়া হলো বাউন্টির। বাতাস এখনও কাল রাতের মতই হালকা। পালগুলো ফুললও না ভাল মত। ধীর গতিতে এগিয়ে চলল জাহাজ, পশ্চিম উত্তর পশ্চিম দিকে।
.
নয়
ভাগ হয়ে গেছে বাউন্টির নাবিকরা।
ব্লাই ছাড়াও মাস্টার জন ফ্রায়ার, সহকারী সার্জন টমাস লেডওয়ার্ড, উদ্ভিদ বিজ্ঞানী ডেভিড নেলসন, গোলন্দাজ পেকওভার, সারেং উইলিয়াম কোল, মাস্টারের মেট উইলিয়াম এলফিনস্টোন, দুতোর উইলিয়াম পার্সেল; মিডশিপম্যান টমাস হেওয়ার্ড, জন হ্যালেট, রবার্ট টিঙ্কলার; দুই কোয়ার্টার মাস্টার জর্জ নর্টন, পিটার স্কেলেটার; কোয়ার্টার মাস্টারের মেট জর্জ সিম্পসন, পালনির্মাতা লরেন্স লেবোগ, কেরানী স্যামুয়েল, কসাই ল্যাম্ব, বাবুর্চি জন স্মিথ আর টমাস হলকে নামিয়ে দেয়া হয়েছে লঞ্চে।
বাকিরা রয়েছে জাহাজে। তাদের ভেতরও দুটো ভাগ-একদল সক্রিয়ভাবে বিদ্রোহে অংশ নিয়েছে, আর একদল বিদ্রোহে অংশ না নিয়েও কপাল দোষে রয়ে গেছে জাহাজে।
বিদ্রোহে যারা সক্রিয় অংশ নিয়েছে তারা হলো: ভারপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট ফ্লেচার ক্রিশ্চিয়ান, গোলন্দাজের মেট জন মিলস, মাস্টার অ্যাট আর্মস চার্লস চার্চিল, মালী উইলিয়াম ব্রাউন; খালাসী টমাস বারকিট, ম্যাপ্ত কুইন্ট্রাল, জন সামনার, জন মিলওয়ার্ড, উইলিয়াম ম্যাককয়, হেনরি হিভ্রান্ডট, আলেকজান্ডার স্মিথ, জন উইলিয়ামস, টমাস এলিসন, আইজাক মার্টিন, রিচার্ড স্কিনার আর ম্যাথু থম্পসন।
যারা বিদ্রোহে অংশ না নিয়েও জাহাজে থেকে যেতে বাধ্য হয়েছে তাদের দলে আছে: মিডশিপম্যান এডওয়ার্ড ইয়ং, জর্জ স্টুয়ার্ট; সারেং-এর সহকারী জেমস মরিসন, আর্মারার জোসেফ কোলম্যান; ছুতোর মিস্ত্রীর দুই সহকারী চার্লস নরম্যান ও টমাস ম্যাকইন্টশ আর খালাসী উইলিয়াম মুস্যাট। এছাড়াও আছে সেই প্রায় অন্ধ নাবিক মাইকেল বায়ার্ন আর আমি।
যারা সক্রিয়ভাবে বিদ্রোহে অংশ নিয়েছে তারা যারা নেয়নি তাদের সন্দেহের চোখে দেখবে, বা নাজেহাল করবে এটাই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল বিদ্রোহীদের কেউই খুব একটা দুর্ব্যবহার করল না আমাদের সাথে। চার্চিল কেবল বলল, তোমাদের নিয়ে কি করা হবে, যতক্ষণ না ঠিক হচ্ছে ততক্ষণ ডেকেই থাকতে তোমরা।
কিছুক্ষণ পর নিচ থেকে ছাড়া পেয়ে টমাস বারকিট ওপরে এল। মার্কেট তুলেও গুলি করতে পারেনি বলে মেজাজটা ওর খিঁচড়ে ছিল। এবার আমাদের ওপর চোখ পড়তেই আগুন হয়ে উঠল, যেন ও গুলি করতে পারেনি সেটা আমাদেরই দোষ। কুৎসিত একটা গালাগাল দিয়ে আমাদের নিয়ে ঠাট্টা মশকরা শুরু করল,সে। ওর সাথে যোগ দিল থম্পসন, ম্যাককয় আর জন উইলিয়ামস। কয়েক মিনিটের ভেতর আমাদের সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেল। হাতাহাতি লেগে যায় আর কি দুদলে। হৈ-চৈ শুনে এগিয়ে এল ক্রিশ্চিয়ান। রাগে ওর চোখ দুটো জ্বলছে ভাটার মত।
থম্পসন, তুমি তোমার কাজে যাও, গম্ভীর কণ্ঠে আদেশ করল সে। আর, বারকিট, আর যদি ঝামেলা পাকাও, তোমাকে শিকলে বাধার নির্দেশ দিতে বাধ্য হব আমি!
আচ্ছা! তাই নাকি? বিদ্রূপ করল থম্পসন। দেখুন, মিস্টার ক্রিশ্চিয়ান, আরেকজন ক্যাপ্টেন ব্লাইকে ঘাড়ের ওপর বসানোর জন্যে, আমরা বিদ্রোহ করিনি, কথাটা আপনার জেনে রাখা দরকার!
ঠিক, আর কোন ব্লাইকে আমরা চাই না, জুড়ে দিল উইলিয়ামস।
কোন কথা বলল না ক্রিশ্চিয়ান। ওদের দিকে তাকাল শুধু। আমি দেখলাম, ওর চোখে ক্রোধ নেই তিরস্কার নেই; যা আছে তার একটাই নাম দেওয়া যেতে পারে-কর্তৃত্ব। একে একে চোখ নামিয়ে নিতে বাধ্য হলো চারজন।
আরও কয়েকজন বিদ্রোহী এসে দাঁড়িয়েছে আমাদের আশেপাশে। তাদের ভেতর থেকে আলেকজান্ডার স্মিথকে ডেকে ক্রিশ্চিয়ান বলল, সবাইকে ডেকে আসতে বলো।
এল সবাই। একে একে প্রত্যেকের দিকে তাকাল ক্রিশ্চিয়ান। কোন রকম ভাব বা অনুভুতি নেই ওর চোখে।। একটা ব্যাপার চিরদিনের জন্যে ফয়সালা হয়ে যাওয়া দরকার, শান্ত কণ্ঠে উরু করল সে, কে এই জাহাজের ক্যাপ্টেন হবে। তোমাদের সাহায্য নিয়ে আমি একে দখল করছি। কেন একজন স্বেচ্ছাচারী, যে আমাদের প্রত্যেকের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছিল তার হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যে। এখন। থেকে নিজেদের সম্পর্কে কোন ভুল ধারণা মনে ঠাঁই দেয়া আমাদের উচিত হবে না। আমরা বিদ্রোহী। বিদ্রোহ করে আমরা রাজার জাহাজ দখল করে নিয়েছি। রাজার আর কোন জাহাজ যদি আমাদের খোঁজ পায়, এবং কোন মতে ধরে। ইংল্যান্ডে নিয়ে যেতে পারে, তোমরা নিশ্চিত থাকতে পারে; মৃত্যু ছাড়া আর কোন শাস্তি আমাদের দেয়া হবে না। তোমাদের কেউ কেউ হয়তো ভাবছ, সে সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। কিন্তু সত্যি কথাটা হলো, সম্ভাবনা আছে এবং বেশ ভাল পরিমাণেই আছে। ব্লাই যদি কোন মতে ইংল্যান্ডে ফিরতে পারে, ও পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে আমাদের খোঁজে যুদ্ধ জাহাজ পাঠানো হবে। ও যদি না পৌঁছায়, তবু এক বা দুবছরের ভেতর যদি বাউন্টি না ফেরে যুদ্ধ জাহাজ পাঠানো হবে। আর কিছু না হোক বাউন্টির গায়েব হয়ে যাওয়ার কারণ খোঁজার। জন্যে হলেও পাঠানো হবে। সুতরাং আমাদের সামনে আসলে খুশি হওয়ার মত তেমন কিছু নেই। একটা কথা তোমরা মনে গেঁথে নিতে পারো, ইংল্যান্ড থেকে আমরা চিরদিনের জন্যেই বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছি। ওখানে ফেরার কথা স্বপ্নেও আমাদের মনে ঠাঁই দেয়া উচিত হবে না।
