বেশ কয়েকটা দিন চলে গেল এভাবে। তারপর এক ভোরে মাস্তুলের ওপর থেকে চিৎকার ভেসে এল পাঞ্জেরীর:
ডাঙা দেখা যায়?
বিকেল নাগাদ দ্বীপটার কাছাকাছি পৌঁছে গেলাম আমরা। বাইরে থেকে যতটুকু বুঝলাম, মাইল আটেক লম্বা দ্বীপ। ভেতরের অংশ তাহিতির মতই পাহাড়ী, যদিও পাহাড়গুলো তাহিতির মত অত উঁচু নয়। উপকূলের কাছাকাছি ঘোরাফেরা করছে বেশ কতকগুলো ক্যানো। বাউন্টিকে দেখে এগিয়ে এল কয়েকটা। প্রত্যেকটায় দশ বারো জন করে মানুষ। গায়ের রঙ, দেহের গঠন, চেহারা ইত্যাদি তাহিতীয়দের মতই। সবার চোখে অদ্ভুত এক বিস্ময়ের ভাব। বুঝতে অসুবিধা হলো না, এর আগে কখনও ইউরোপীয় জাহাজ দেখেনি ওরা।
ক্রিশ্চিয়ানের নির্দেশে ওদের সাথে তাহিতীয় ভাষায় আলাপ করলাম আমি। আমার কথা সহজেই বুঝতে পারল লোকগুলো। ওদের দেশের নাম জিজ্ঞেস কমতে জানাল রারোটোঙ্গা। একটা আশ্চর্য ব্যাপার এই রারোটোজার, মানুষগুলোর ভেতর দেখলাম, ওরা কেউ আমাদের জাহাজে উঠতে চাইল না। নানাভাবে আমরা ওদের ডাকলাম, উপহার দিলাম। কিন্তু লাভ হলো না। উপহারগুলো নিল, নিয়ে খুশি হলো, কিন্তু জাহাজে উঠল না একজনও। শেষমেষ ক্রিশ্চিয়ান পাল তুলে দেয়ার নির্দেশ দিল। হতাশ হলো নাবিকরা। রারোটোঙ্গা তাহিতির চেয়ে মোটেই কম সুন্দর নয়। লোকগুলোকেও বন্ধুভাবাপন্নই মনে হলো। তাছাড়া তাহিতি থেকে কম পক্ষে সাতশো মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে দ্বীপটা, আমরা ছাড়া এখন পর্যন্ত আর কোন ইউরোপীয় এটার খোঁজ পেয়েছে বলে মনে হয় না। তবু ক্রিশ্চিয়ান কেন যে দ্বীপটাকে লুকিয়ে থাকার জন্যে পছন্দ করল না আমি বুঝতে পারলাম না।
কয়েক দিন পর এক সন্ধ্যায় ভীষণ অবাক করে দিয়ে ক্রিশ্চিয়ান ওর সঙ্গে খেতে ডাকল আমাকে।
আমি যখন কেবিনে ঢুকলাম ও তখন গভীর মনোযোগ দিয়ে ক্যাপ্টেন কুকের তৈরি করা একটা মানচিত্র দেখছে। সাড়া পেয়ে মুখ তুলে তাকাল। রক্ষীকে বিদায় করে দরজা বন্ধ করল। বিদ্রোহের আগে আমাদের সম্পর্ক যেমন সহজ ছিল, তেমনি সহজ ভঙ্গিতে হাসল একটু।
আমার সাথে খেতে ডেকেছি তোমাকে, বিয়্যাম, বলল ক্রিশ্চিয়ান। অবশ্য ইচ্ছে না হলে আমার আমন্ত্রণ তুমি, না-ও গ্রহণ করতে পারো।
সত্যি কথা বলতে কি বিদ্রোহের আগে ক্রিশ্চিয়ান সম্পর্কে আমার যে ধারণা ছিল এখন তা নেই। আমাদের এতগুলো জীবন নষ্ট করে দেয়ার মূলে রয়েছে ও, কথাটা আমি ভুলতে পারি না কিছুতেই। মনে তাই একটা বিষ্ণার ভাব আমার আছে ওর সম্পর্কে। তবে এখন তা প্রকাশ করলাম না। শুধু বললাম, না; না, গ্রহণ না করার কি আছে?
কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইলাম আমরা। তারপর একসময় ক্রিশ্চিয়ান বলল, ব্লাই সম্পর্কে যখন ভাবি, কোন রকম অনুশোচনা হয় না আমার। বিন্দুমাত্র না। কিন্তু যখনই ওর সঙ্গে যারা গেছে তাদের কথা মনে হয়…
কথাটা শেষ না করে চোখ বুজে দুহাতে কপাল চেপে ধরল ও। মৃদু মৃদু নড়তে লাগল মাথাটা। খানিকক্ষণ পর আবার বলল, আমার মত হঠাৎ উত্তেজনা বা আবেগের বশে কোন কাজ কখনও করে বোসো না, বিয়্যাম। জীবনে শান্তি বলে আর কিছু থাকবে না তাহলে।
সুপরিকল্পিত একটা বিদ্রোহকে আপনি আবেগের বশে করা কাজ বলছেন! রূঢ় শোনালেও ক্রিশ্চিয়ানের মুখের ওপর আমি কথাটা না বলে পারলাম না।
কি বলছ তুমি! সবিস্ময়ে প্রায় চিৎকার করে উঠল সে। ভেবেছ আগে থাকতে আটঘাট বেঁধে আমরা বিদ্রোহ করেছি।
তাছাড়া আর কি? আমি জবাব দিলাম। ঘটনাটা যখন ঘটে তখন আপনার চৌকির ওপর জাহাজের ভার। চার্চিলের ধাক্কাধাক্কিতে ঘুম ভেঙে উঠে দেখলাম পুরো জাহাজ আপনার দখলে; হ্যাঁচের মুখে, ডেকের কোনায় কোনায় দাঁড়িয়ে আছে সশস্ত্র লোক। এর পরও কি করে ভাবব বিদ্রোহটা পূর্ব পরিকল্পিত ছিল না?
কিন্তু সত্যিই ওটা পূর্বপরিকল্পিত ছিল না, বলল ক্রিশ্চিয়ান। ঘটনা ঘটার মাত্র পাঁচ মিনিট আগেও আমি ভাবিনি বিদ্রোহ করর। তাহলে বলি তোমাকে…সে রাতে তোমার সাথে আমার কি কি কথা হয়েছিল, মনে আছে?
হ্যাঁ।
আমি বলেছিলাম, আমার যদি কিছু হয়, আমার বাড়িতে গিয়ে দেখা কোরো আমার আত্মীয় স্বজনদের সাথে। কেন বলেছিলাম ওকথা জানো? আমি পালাতে চেয়েছিলাম বাউন্টি থেকে।
আচ্ছা!
হ্যাঁ, নর্টন ছাড়া আর কেউ জানত না এ কথা। ও আমার জন্যে একটা ছোট্ট ভেলা তৈরি করেছিল। ভেবেছিলাম ওই ভেলা নিয়ে আমি তোফোয়ায় পৌঁছে যেতে পারব।
সত্যি!
হ্যাঁ, বিয়্যাম সত্যি। আমি আর সহ্য করতে পারছিলাম না ব্লাইকে। জন নটন নিজের ইচ্ছায় ব্লাইয়ের সঙ্গে গেছে। ও আমাকে পালাতে সাহায্য করতে চেয়েছিল, কিন্তু আমার সঙ্গে যোগ দিয়ে বিদ্রোহ করতে চায়নি। ও থাকলে ওর কাছেই শুনতে পেতে আমি সত্যি বলছি কি না।
তারপর?
ভাগ্য আমার সহায় ছিল না, আর কি। সে রাতে কেমন গরম ছিল তোমার মনে আছে তোমার মত জাহাজের বেশির ভাগ লোকই ছিল ডেকে। ফলে ভেলাটাকে জলে ভাসানোর কোন সুযোগই আমি পাইনি।
ভোর চারটেয় যখন পেকওভারের কাছ থেকে ডেকের দায়িত্ব নিলাম তখনও কিন্তু বিদ্রোহের কথা আমার মনে আসেনি। বিশ্বাস করো, আমি সত্যি কথা বলছি। কিছুক্ষণ পায়চারি করলাম একা একা। আমার মনে তখন হানা দিয়ে বেড়াচ্ছে ব্লাইয়ের অপমানকর কথাগুলো। সে-সময় একবার ওকে খুন করার কথাও ভেবেছিলাম। সত্যি সত্যি খুন। তাহলে বুঝে দেখ, আমার মনের অবস্থা তখন কোথায় পৌঁছে ছিল!
