এক মুহূর্ত পর টিলারের গলা? আসলে এসো, বিয়্যাম! আমরা ৪ গেলাম!
আর কিছু করার রইল না আমাদের। লাঠি দুটো যেখানে ছিল সেখানে রেখে ছুটে বেরিয়ে গেলাম বার্থ থেকে। এতক্ষণে থম্পসন আসছে ব্যাপার কি দেখার জন্যে। ওর সাথে ধাক্কা খেতে খেতে বেঁচে গেল মরিসন।
আরে, মরিসন! তুমি এখানে কি করছ? চিৎকার করল থম্পসন।
জবাব দেয়ার জন্যে দাঁড়ালাম না আমরা। এক ছুটে মাঝের পথটুকু পেরিয়ে পৌঁছুলাম মইয়ের গোড়ায়। তাড়াহুড়ো করে উঠতে গিয়ে দুবার পা হড়কাল। কোন মতে যখন ডেকে পৌঁছলাম, চার্চিল এসে ধরল আমাকে।
অনেক দেরি করে ফেলেছ, বিয়্যাম, সে বলল। তুমি যেতে পারছ না।
যেতে পারছি না! মানে? চিৎকার করে উঠে চার্চিলের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়ার চেষ্টা করলাম। ভীষণ অবস্থা তখন আমার। চোখের। সামনে দেখছি লঞ্চটা পেছনে চলতে শুরু করেছে, অথচ আমি এখনও দাঁড়িয়ে আছি ডেকের ওপর। বিদ্রোহীদের একজন লঞ্চ বাধা রশিটা উঁচু করে নিয়ে চলেছে পেছন দিকে। বারকিট আর কুইনটাল ধরে রেখেছে কোলম্যানকে। আমার মত, হাত পা ছুড়ছে সে-ও। মরিসন যুঝছে চার পাঁচ জনের সঙ্গে।
আমরা সত্যি সত্যিই দেরি করে ফেলেছি। লঞ্চটা এখন কানায় কানায় ভর্তি বলতে যা বোঝায় তাই। ওতে যদি আর একজনও ওঠে সব কজনেরই জীবন বিপন্ন হবে। ব্লাইয়ের চিৎকার শুনতে পেলাম; আর কাউকে নিতে পারছি না! দুশ্চিন্তা কোরো না, ইংল্যান্ডে যদি পৌঁছাতে পারি তোমাদের যাতে সুবিচার হয় আমি দেখব?
পেছনে চলছে লঞ্চ। রশি হাতে বিদ্রোহী যেতে যেতে চলে গেছে জাহাজের একেবারে শেষ মাথায়। এবার সে রশির প্রান্তটা ছুঁড়ে দিল লঞ্চের দিকে। লঞ্চের কেউ একজন টেনে তুলে নিল সেটা। আমরা যারা বিদ্রোহী নই অথচ কপাল দোষে জাহাজে রয়ে গেছি তারা হুড়মুড় করে গিয়ে দাঁড়ালাম রেলিং ঘেঁষে। আকুল নয়নে তাকিয়ে আছি লঞ্চটার দিকে। আমাদের সর্বস্ব যেন রাহাজানি করে নিয়ে যাচ্ছে ওটা। ব্লাইকে দেখলাম, পেছন দিকের একটা আড় কাঠে দাঁড়িয়ে আছেন। অন্যদের কেউ কেউ বসে, কেউ কেউ দাঁড়িয়ে। নৌকাটা এমন বোঝাই হয়েছে, খুব বেশি হলে সাত কি আট ইঞ্চি জেগে আছে জলের ওপর। জাহাজ এবং লঞ্চ দুদিক থেকেই ছুটছে চিৎকার আর গালাগালির তুবড়ি। ব্লাইয়ের গলাও শোনা যাচ্ছে মাঝে মধ্যে, নৌকায় তার সঙ্গীদের আদেশ নির্দেশ দিচ্ছেন চিৎকার করে।
বিদ্রোহীদের কয়েকজন গম্ভীর, কিছুটা চিন্তিত মুখে তাকিয়ে আছে। অন্যরা প্রাণ-খুলে পি করছে ব্লাইকে। একজনকে চেঁচাতে শুনলাম: এবার যাও, পরখ করে দেখ আধ পাউন্ড ইয়ামে দিন চলে কি না, ব্যাটা বুড়ো উল্লুক!
ঈশ্বরের দোহাই, মিস্টার ক্রিশ্চিয়ান, আমাদের কিছু অস্ত্রশস্ত্র দাও! ফ্রায়ার চিৎকার করল। একবার ভাবো আমরা কোথায় যাচ্ছি! অন্তত প্রাণ বাঁচানোর জন্যে লড়ার একটা সুযোগ আমাদের দাও!
মামা বাড়ির আবদার, না? জাহাজ থেকে কেউ একজন চিৎকার করল।
অস্ত্রের কোন দরকার তোমাদের হবে না, অন্য একজন।
বুড়ো শয়তানটা তো জংলীদের দোস্ত, ও-ই বাঁচাবে তোমাদের।
কোলম্যান দাঁড়িয়ে ছিল আমার পাশে। ওকে নিয়ে ক্রিশ্চিয়ানের কাছে গিয়ে অনুরোধ করলাম কয়েকটা মাস্কেট আর কিছু গুলি বারুদ যেন দেয়া হয় ব্লাইকে।
না! বলল ক্রিশ্চিয়ান। কোন আগ্নেয়াস্ত্র ওদের দেয়া হবে না।
তাহলে অন্তত কয়েকটা তলোয়ার দিন, মিস্টার ক্রিশ্চিয়ান, মিনতি করল কোলম্যান, নইলে ডাঙায় পা রাখা মাত্র হয়তো খুন হয়ে যাবে সব কজন। নামকার কথা একবার ভাবুন!।
এই প্রস্তাবে রাজি হলো ক্রিশ্চিয়ান। চারটে তলোয়ার একটা দড়ির মাথায় বেঁধে ছুঁড়ে দেয়া হলো লঞ্চে।
কাপুরুষের দল! রাগে গর্জন করে উঠল পার্সেল। এছাড়া আর কিছু দিবি না?
আর কি চাও, বাবা ছুতোর? উইলিয়াম ব্রাউন চেঁচাল, অস্ত্রের পুরো সিন্দুকটাই নামিয়ে দেব ভাবছ নাকি?
ম্যাককয় বলল, আরও চায়? পেটটা ওর সীসা দিয়ে ভরে দাও দেখি!
শোনা মাত্র মাস্কেট তুলে তাক করল বারকিট। ক্রিশ্চিয়ানের নির্দেশে তাড়াতাড়ি দুতিন জন এসে ওর হাত থেকে কেড়ে নিল মাস্কেটটা। ওকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হলো নিচে।
চুপ করে গেল পার্সেল। এদিকে ফ্রায়ার এবং অন্যরা শিগগির শিগগির জাহাজের কাছ থেকে লঞ্চ সরিয়ে নেয়ার জন্যে ব্লাইকে তাড়া দিতে শুরু করেছে। বিদ্রোহীদের গতিক সুবিধার নয়, যে কোন মুহূর্তে গুলি গোলা চালিয়ে বসতে পারে। ব্যাপারটা ব্লাই-ও বুঝেছেন। সবাইকে দাঁড় তুলে নেয়ার নির্দেশ দিলেন তিনি।
একটু পরেই লঞ্চের মুখ ঘুরে গেল। ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে বাউন্টির কাছ থেকে। ওটার মুখ এখন প্রায় দশ লিগ উত্তরপুবে তোফোয়া দ্বীপের দিকে। এতদিন কখনোই আমরা বারো জনের বেশি উঠিনি লঞ্চটায়-ভাবতাম এর বেশি উঠলে বিপদ ঘটতে পারে, অথচ ওটাই এখন উনিশ জনকে বয়ে নিয়ে চলেছে। তাছাড়া কিছু মালপত্র, খাদ্য এবং পানীয় তো আছেই।
ঈশ্বরকে? ধন্যবাদ, আমরা দেরি করে ফেলেছিলাম, বিয়্যাম! মরিসন বলল আমার পাশ থেকে।
মন থেকে বলছ এ কথা? আমি জিজ্ঞেস করলাম।
একটু যেন থমত খেল মরিসন। ভাবল এক মুহূর্ত। তারপর বলল, না, বিয়্যাম, এমনি কথার কথা বললাম। সুযোগ পাইনি, পেলে স্বেচ্ছায় গ্রহণ করতাম। যদিও জানি তাতে লাভ কিছু হত না-ওরা কখনোই ইংল্যান্ডে পৌঁছুতে পারবে না।
