অনুনয় বিনয় অর্থহীন বুঝতে পেরে আর কথা বাড়ালেন না ব্লাই। মই বেয়ে নেমে গেলেন লঞ্চে। পেকওভার আর নর্টন গেল পেছন পেছন। এরপর একটা সেক্সট্যান্ট আর মানচিত্রের বই ছুঁড়ে দিল ক্রিশ্চিয়ান ব্লাইয়ের দিকে। বলল, আমার মনে হয় এগুলো দিয়েই কাজ চালিয়ে নিতে পারবেন। কম্পাস তো আছেই আপনার কাছে।
বিদ্রোহীদের হাতের বাইরে গিয়েই আবার স্বমূর্তিতে আত্মপ্রকাশ করলেন ব্লাই।
তোমাকে আমি দেখে নেব, বদমাশ–আঙুল উঁচিয়ে ক্রিশ্চিয়ানের দিকে নাড়তে নাড়তে চিৎকার করলেন তিনি। মনে রেখো, অকৃতজ্ঞ শয়তান! প্রতিশোধ আমি নেবই। দুবছরের ভেতর তোমাকে ফাঁসিকাষ্ঠে তুলব! তোমার সঙ্গের বদমাশগুলোকেও!
ভাগ্য ভাল ব্লাইয়ের, ক্রিশ্চিয়ানের মনোযোগ তখন অন্য দিকে। ও খেয়াল করতে পারল না কথাগুলো। তবে বিদ্রোহীদের কয়েক জন জবাব দিল ওর হয়ে। ব্লাইয়ের ভঙ্গি অনুকরণ করেই তারা চিৎকার করল: যা ব্যাটা ছুঁচো, যা পারিস করিস!
হাতে বন্দুক থাকা সত্ত্বেও কেন যে সেদিন কেউ গুলি করে বসেনি ভেবে আজও আমি বিস্মিত বোধ করি।
যা হোক, একটু পরেই বুঝতে পারলাম, আরও অনেককে, অর্থাৎ যে যেতে চাইবে তাকেই, যেতে দেয়া হবে স্নাইয়ের সাথে। ক্রিশ্চিয়ান হয়তো ভেবেছে, ব্লাইয়ের পক্ষের বা নিরপেক্ষ লোক জাহাজে যত কম থাকে ততই মঙ্গল। লোকগুলোকে চোখে চোখে রাখার ঝামেলা থেকে তারা রেহাই পাবে। এই সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইলাম না আমি। মিস্টার নেলসন দাঁড়িয়ে ছিলেন কাছেই, তাকে নিয়ে দ্রুত এগোলাম পেছনের মইয়ের দিকে; নিচ থেকে দুচারটা কাপড়-চোপড় নিয়ে এসে উঠে পড়ব লঞ্চে। মইয়ের মুখে আমাদের থামাল ক্রিশ্চিয়ান।
মিস্টার নেলসন, সে বলল, আপনি আর বিয়্যাম ইচ্ছে হলে থাকতে পারেন জাহাজে।
যে দুর্ভোগ তুমি ভুগেছ সেজন্যে সত্যিই আমি সহানুভূতিশীল তোমার প্রতি, জবাব দিলেন নেলসন। কিন্তু তার অর্থ এই নয়…
আপনার কাছে সহানুভূতি আমি চেয়েছি? বাধা দিয়ে বলল ক্রিশ্চিয়ান। বিয়্যাম, কি করবে তুমি
ক্যাপ্টেনের সাথে যাব।
তাহলে তাড়াতাড়ি, তোমরা দুজনেই।
দুএকটা কাপড়-চোপড় নেয়ার অনুমতি পাব তো? জিজ্ঞেস করলেন নেলসন।
হ্যাঁ। কিন্তু সাবধান, কোন রকম চালাকির চেষ্টা করলে কিন্তু বেঘোরে মারা পড়বেন।
নিচে নেমে নেলসন তার কেবিনের দিকে চলে গেলেন, আমি ঢুকলাম মিডশিপম্যানদের বার্থে। থম্পসন এখনও পাহারা দিচ্ছে অন্ত্রের সিন্দটা। টিঙ্কলার আর এলফিনস্টোনকে কাল থেকে দেখিনি একবারও। গেল কোথায় দুজন? ডান দিকের স্বার্থে নেই তোক একবার খুঁজে দেখি, ভেবে যে-ই পা বাড়িয়েছি অমনি থম্পসনের গলা শুনতে পেলাম।
না! ওদিকে যাবে না। কাপড় নিতে এসেছ, নিয়ে ভেগে পড়ো তাড়াতাড়ি!
ডান দিকের বার্থে আর যাওয়া হলো না, কাপড় গোছাতে শুরু করলাম দ্রুত। হঠাৎ একটা জিনিস দেখে ভীষণ অবাক হলাম আমি। ইয়ং এখনও ঘুমাচ্ছে তার হ্যামকে। রাত রোটা থেকে ভোর চারটে পর্যন্ত কাজ করেছে। ইয়ং। নিয়ম মত এটা ওর ঘুমানোর সময়। কিন্তু জাহাজে যে হৈ-হট্টগোল চলছে তার ভেতর কি করে ও ঘুমাচ্ছে আমি ভেবে পেলাম না। নিঃশব্দে গায়ে ঠেলা দিয়ে ওকে জাগানোর চেষ্টা করলাম। লাভ হলো না। অসম্ভব গাঢ় ইয়ংয়ের ঘুম। ওকে ছেড়ে দিয়ে আবার আমার জিনিসপত্র নিয়ে পড়লাম। যে সব জিনিস সবচেয়ে জরুরী, না নিলেই নয় সেগুলো বাছাই করছি এমন সময় চোখ গেল বার্থের কোনায় খাড়া করে রাখা কয়েকটা ইন্ডিয়ান লাঠির দিকে। ইন্ডিয়ানরা ওগুলো লড়াইয়ের সময় ব্যবহার করে। নামুকার জংলীদের কাছ থেকে আমি যোগাড় করেছিলাম লোহাকাঠের এই লাঠিগুলো। ওগুলো দেখেই একটা চিন্তা খেলে গেল আমার মাথায়: এর একটা দিয়ে যদি মারি থম্পসনের মাথায়, জ্ঞান হারাবে না?
আমি জানি, বেশি ভাবনা চিন্তা করতে গেলে অনেক কাজই অনেক সময় করা হয় না। সুতরাং বেশি ভাবাভাবির ধার না ধেরে তুলে নিলাম একটা লাঠি। দরজার কাছে গিয়ে গলা বাড়িয়ে দেখলাম, থম্পসন বসে আছে সিন্দুকের ওপর। মাস্কেটটা দুপায়ের মাঝে খাড়া করে রাখা। আমাকে উঁকিঝুঁকি মারতে দেখে ও চিৎকার করে উঠল।
সাবধান, বেরিয়ে এসো ওখান থেকে! এক্ষুণি!
দুই বার্ধের মাঝখান দিয়ে এগিয়ে আসতে দেখলাম মরিসনকে। আর কি কপাল, ঠিক তখনই ওপর থেকে কে যেন ডাকল থম্পসনের নাম ধরে। ও ওপরে তাকাতেই আমি হাতের ইশারায় মরিসনকে ডাকলাম। এবং থম্পসন মুখ নামানোর আগেই মরিসন ঢুকে পড়ল আমার বার্থে। কোন কথা না বলে আমি একটা লাঠি ধরিয়ে দিলাম ওর হাতে। তারপর দুজনে মিলে শেষ বারের মত একবার চেষ্টা করলাম ইয়ংকে জাগানোর। তাতে সময়ই নষ্ট হলো শুধু। হ্যামক থেকে ধাক্কাতে ধাক্কাতে প্রায় নামিয়ে ফেললাম, কিন্তু ঘুম ভাঙল না ওর। বাইরে থেকে থম্পসনের চিৎকার ভেসে এল: ও, স্যার, কাপড় গোছাচ্ছে পাঠিয়ে দিচ্ছি এক্ষুণি।
দরজার এক পাশে গিয়ে দাঁড়াল মরিসন। আমি অন্য পাশে। দুজনই উচিয়ে ধরেছি লাঠি। দুজনই আশা করছি, আমাকে ডাকতে ভেতরে ঢুকবে থম্পসন। কিন্তু না, খুবই হুঁশিয়ার সে। বাইরে থেকেই চিৎকার করল: বেরিয়ে এসো, বিয়্যাম, এক্ষুণি!
আসছি, বলে আমি আবার উঁকি দিলাম। যা দেখলাম তাতে ধড়াস করে উঠল বুকের ভেতর। বিশালদেহী বারকিট আর ম্যাককয় এগিয়ে আসছে হ্যাঁচের দিক থেকে। দুজনেরই হাতে মাস্কেট। থম্পসনের কাছে পৌঁছে থামল, ওরা। আশা নেই বুঝতে পেরেও আরও মিনিট দুয়েক কাটালাম বার্থের ভেতর। তিন বিদ্রোহীও রইল যেখানে ছিল সেখানে। হ্যাঁচের কাছ থেকে চিৎকার শুনতে পেলাম নেলসনের: বিয়্যাম। জলদি করো, নইলে কিন্তু রয়ে যাবে তুমি!
