মইয়ের মুখে ছুতোর মিস্ত্রীকে দেখা গেল। পেছনে কসাই ল্যাম্ব। দুজন ধরাধরি করে তুলে আনছে ছুতোর মিস্ত্রীর যন্ত্রপাতির বাক্স।
এই যে ঘটনাটা ঘটছে, পার্সেল বলল, এর সব কৃতিত্ব কার বলে মনে হয় আপনার, মিস্টার নেলসন?
আমাদের কপালের, আর কি বলব বলো?
না, স্যার, কপাল টপাল কিছু না। এসবের জন্যে দায়ী আমাদের মিস্টার ব্লই, আর কেউ না। লোকটা যা শুরু করেছিল এমন কিছু না ঘটলেই আমি বরং আশ্চর্য হতাম।
ব্লাইয়ের সম্পর্কে ঘৃণা-গভীর ঘৃণা ছাড়া আর কিছু নেই পার্সেলের মনে। ভ্যান ডিয়েমেনস ল্যান্ডে সেই ঘটনার পর একান্ত প্রয়োজন না হলে কখনও সে কথা বলেনি তার সাথে। তবু মিস্টার নেলসন যখন বললেন, সে ইচ্ছে করলে থেকে যেতে পারে জাহাজে তখন তার মুখের অবস্থা যা হলো সে দেখার মত।
জাহাজে থেকে যাব? আতঙ্কিত কণ্ঠে বলল পার্সেল। বদমাশ দস্যুদের সাথে? না, স্যার, তার চেয়ে ওই জঘন্য লোকটার সাথে যেতেই আমি বেশি পছন্দ করব।
এই সময় হঠাৎ চার্চিলের চোখ পড়ল আমাদের ওপর।
ওটা কি তোমার সাথে, পার্সেল? গর্জে উঠল সে। আমাদের সব যন্ত্রপাতি চুরি করার মতলব এটেছ?
তোমাদের যন্ত্রপাতি, নচ্ছারের দল! এগুলো আমার; আমি যেখানে যাব এগুলোও সেখানে যাবে।
জাহাজ থেকে একটা পেরেকও তুমি সরাতে পারবে না, জবাব দিল চার্চিল। এর পর সে একজনকে পাঠিয়ে ডাকিয়ে আনল ক্রিশ্চিয়ানকে। শুরু হলো বিতর্ক, শুধু যন্ত্রপাতি নয় স্বয়ং ছুতোর মিস্ত্রীকে নিয়েও। মিস্ত্রীগিরিতে ওর দক্ষতার কথা বিবেচনা করে ক্রিশ্চিয়ান ভাবছে ওকে রেখে দেবে জাহাজে। কিন্তু বাকি সবাই এর ঘোর বিরোধী। মেজাজের দিক থেকে কোন অংশে কম নয় সে ব্লাইয়ের চেয়ে। তাই ওদের ধারণা পার্সেলকে সঙ্গে রাখলে সুবিধার চেয়ে অসুবিধাই হবে বেশি।
স্যার, ব্লাইয়ের চেয়ে কম নয় ও বদমায়েশিতে, একজন বলল।
ওর সহকারী দুজনকে রেখে দিন, মিস্টার ক্রিশ্চিয়ান, আরেক জনের পরামর্শ, আমাদের যা প্রয়োজন ওরাই মেটাতে পারবে।
জোর করে হলেও ওকে নৌকায় তুলে দিতে হবে, বলল আরেক জন।
জোর করবি, গুণ্ডার দল? চিৎকার করল পার্সেল, আমি এমনিই যাব, দেখি কে আমাকে ঠেকায়!
দুর্ভাগ্যক্রমে পার্সেল লোকটা নির্ভীক হলেও একটু মাথা মোটা ধরনের। ব্লাইয়ের দলের সুবিধা অসুবিধার কথা সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়ে, সে হাম্বড়ার মত চিৎকার করতে লাগল বিদ্রোহীদের হাত থেকে ছাড়া পাওয়া মাত্র সে কি করবে না করবে ইত্যাদি ইত্যাদি।
আমার কথা শুনে রাখ, বদমাশরা! চেঁচাল সে। তোদের সব কটাকে কাঠগড়ায় তুলে তবে ছাড়ব! আমাদের ভাসিয়ে দিবি?-দে। তাতে আমাদের কচু হবে। আমরা জাহাজ একটা বানিয়ে…
ঠিক, মিস্টার ক্রিশ্চিয়ান, অনেকগুলো লোক এক সাথে চিৎকার করে উঠল, শালা এত ভাল মিস্ত্রী, যন্ত্রপাতি সঙ্গে থাকলে ঠিকই জাহাজ বানিয়ে ফেলবে।
বড়াই করতে করতে কি করে ফেলেছে যখন পার্সেল বুঝল তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। আমার বিশ্বাস অনেক যন্ত্রপাতিই ওকে দিত ক্রিশ্চিয়ান-প্রতিটা যন্ত্র দুটো তিনটে করে আছে জাহাজে, সুতরাং দিলে বিদ্রোহীদের খুব একটা অসুবিধা হত না-কিন্তু এখন, জাহাজ বানিয়ে নেবে এই কথা শোনার পর সে ঝুঁকি আর নিল না, ক্রিশ্চিয়ান। যন্ত্রপাতির বাক্সটা নিচে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিল তার লোকদের। ছোট একটা কুঠার, একটা হাতুড়ি আর এক থলে পেরেক কেবল সাথে রাখতে দিল পার্সেলকে।
লঞ্চটা খালি করা হয়ে গেছে। পাল, মাস্তুল, দড়ি-দড়া, দাঁড়, বৈঠা-া যা দরকার ওটা চালানোর জন্যে সব এবার উঠিয়ে দেয়া হলো। কিছু খাবার, মদ এবং পানিও দেয়া হলো। তারপর ক্রিশ্চিয়ানের নির্দেশে পানিতে নামিয়ে দেয়া হলো লঞ্চটা।
প্রথম যাকে লঞ্চে নামতে বলা হলো সে স্যামুয়েল। তারপর হেওয়ার্ড আর হ্যালেট। এখন দুজনই কাঁদছে। হাত জোড় করে ক্ষমা ভিক্ষা করছে হাউ মাউ করে। কেউ কর্ণপাত করল না ওদের কথায়। টেনে হিঁচড়ে রেলিংয়ের কাছে নিয়ে যাওয়া হলো দুজনকে। নামিয়ে দেয়া হবে লঞ্চে, এই সময় হেওয়ার্ড তাকে ধরে থাকা লোকটার হাত থেকে কোন মতে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে ফিরল ক্রিশ্চিয়ানের দিকে।
আমি আপনার কি করেছি, মিস্টার ক্রিশ্চিয়ান, কাঁদতে কাঁদতে সে বলল, যে আমার সাথে এমন ব্যবহার করছেন? আপনার দুটো পায়ে ধরি, আমাকে জাহাজে থাকতে দিন!
তোমাকে ছাড়াও আমরা কাজ চালিয়ে নিতে পারব, গম্ভীর কণ্ঠে বলল ক্রিশ্চিয়ান। যাও নেমে পড়ো লঞ্চে, দুজনই!
এরপর গেল পার্সেল। ওকে কোন রকম পীড়াপীড়ি করতে হলো না। বিদ্রোহীদের দখল করা জাহাজে থাকার চেয়ে মরতে রাজি ও। ওর পেছন, পেছন গেল সারেং কোল। এর পর ব্লাইকে রেলিংয়ের ধারে নিয়ে আসার নির্দেশ দিল ক্রিশ্চিয়ান।
আনা হলো ব্লাইকে। দুহাতের বাঁধন খুলে দেয়া হয়েছে।
এবার, মিস্টার ব্লাই, ক্রিশ্চিয়ান বলল, ওই যে আপনার নৌকা তৈরি, যান উঠে পড়ুন!
ক্রিশ্চিয়ান, শান্ত কণ্ঠে ব্লাই বললেন, শেষবারের মত তোমাকে অনুরোধ করছি, আরেকবার ভেবে দেখ? আমি কথা দিচ্ছি-ঈশ্বরের কসম খেয়ে বলছি, আত্মসমর্পণ করো, একথা আমি ভুলে যাব না। আমার স্ত্রী আর ছেলে-মেয়েদের কথা একবার ভাবো!
না, মিস্টার ব্লই, এ ঘটনা ঘটার আগে আপনারই ভাবা উচিত ছিল আপনার স্ত্রী-পরিবারের কথা। আর আপনার কসমের মূল্য কতটুকু সে আমাদের জানা আছে। যান, স্যার, নৌকায় উঠে পড়ুন।
