কি করতে চান আপনি? আমি জিজ্ঞেস করলাম।
আমি চেয়েছিলাম ব্লাইকে বন্দী করে ইংল্যান্ডে নিয়ে যাব। কিন্তু মনে হচ্ছে না তা সম্ভব, আমার সাথীরা তা হতে দেবে না। এখন ঠিক করেছি, কাটারটা একৈ দিয়ে দেব, যেখানে খুশি চলে যাক। মিস্টার ফ্রায়ার, হেওয়ার্ড, যালেট আর স্যামুয়েলকেও যেতে হবে ওর সঙ্গে।
আর কথা বলার সময় পেলাম না। মিস্টার ফ্রায়ার আর পার্সেলকে নিয়ে এসেছে চার্চিল। মাস্টার, ছুতোর মিস্ত্রী-দুজনেরই মুখে আতঙ্কের ছাপ, তবে দিশেহারা হয়ে পড়েনি কেউ। দুজনই আইনের প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাবান। সুযোগ পেলে ওরা যে জাহাজ পুনর্দখলের চেষ্টা করবে সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই ক্রিশ্চিয়ানের তাই ওদের কড়া পাহারায় রাখতে সে ভোলেনি।
মিস্টার বিয়্যাম, তুমি নিশ্চয়ই নেই এসবের ভেতর? ফ্রায়ার জিজ্ঞেস করল।
আপনার চেয়ে বেশি না, স্যার, আমি জবাব দিলাম। হ্যাঁ, বিয়্যাম এসবের কিছু জানে না, বলল ক্রিশ্চিয়ান। মিস্টার \
পার্সেল…
ফ্রায়ার বাধা দিল ওকে।
তুমি! তুমি, ক্রিশ্চিয়ান! ওহ, ঈশ্বর! কি করেছ, যদি জানতে! এখনও সময় আছে, এ পাগলামি সরাও মাথা থেকে, আমি কথা দিচ্ছি, আমরা সবাই তোমার স্বার্থ আমাদের নিজের স্বার্থ বলে মনে করব। আমাদের খালি ইংল্যান্ডে পৌঁছাতে…
না, মিস্টার ফ্রায়ার, শান্ত কণ্ঠে বলল ক্রিশ্চিয়ান, তা আর সম্ভব নয়। গত কয়েকটা সপ্তাহ নরক যন্ত্রণা ভোগ করেছি আমি। সত্যি বলছি, আমার সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
ক্যাপ্টেনের সঙ্গে তোমার ব্যক্তিগত ঝগড়ার কারণে আমাদের সবাইকে দুর্ভোগের ভেতর টেনে আনবে তুমি?
বেশি কথা না বলে চুপ করে থাকুন, মিস্টার ফ্রায়ার। পালে, তুমি যাও, নিচে থেকে তোমার যন্ত্রপাতি আর সহকারীদের নিয়ে এসে কাটারটা ঠিক ঠাক করে দাও। চার্চিল, ওকে নিচে যেতে দাও, সঙ্গে পাহারাদার দিতে ভুলো না।
পার্সেলকে নিয়ে সামনের মইয়ের দিকে এগিয়ে গেল চার্চিল।
আমাদের সাগরে ভাসিয়ে দিতে চাও?ফ্রায়ার জিজ্ঞেস করল।
ডাঙা এখান থেকে নয় লিগের বেশি হবে না, জবাব দিল ক্রিশ্চিয়ান। এমন শান্ত সাগরে এটুকু পথ সহজেই পাড়ি দিতে পারবেন আপনারা।
আমি জাহাজেই থাকব।
না, মিস্টার ফ্রায়ার, ক্যাপ্টেন ব্লাইয়ের সাথে যাবেন আপনি। উইলিয়ামস! মাস্টারকে কেবিনে নিয়ে যাও। যতক্ষণ না আমি ডেকে পাঠাই ততক্ষণ ওখানেই রাখবে ওকে।
এই সময় ফিরে এল ছুতোর মিস্ত্রী পার্সেল, পেছনে কাটারের সাজসরঞ্জাম হাতে তার দুই সহকারী নরম্যান আর ম্যাকইন্টশ। সোজা আমার কাছে এল পার্সেল।
মিস্টার বিয়্যাম, আমি জানি তুমি ওদের দলে নও। তবু মিস্টার ক্রিশ্চিয়ান তোমার বন্ধু অন্তত ছিল; আমাদের হয়ে একটু অনুরোধ করো না ওকে, লঞ্চটা যেন দেয়। কাটারটার অবস্থা এমন খারাপ, কিছুতেই ওটা ডাঙা পর্যন্ত পৌঁছাবে না।
সত্যি খুবই দুরবস্থা কাটারটার। অসংখ্য ফুটো তলায়; জায়গায় জায়গায় কাঠ পচে, পোকায় খেয়ে ফোপড়া করে ফেলেছে। এই কাটার নিয়ে কিছুতেই তীরে পৌঁছুতে পারবেন না ব্লাই।
তুমিও চলো আমার সঙ্গে, পার্সেলকে বললাম।
না, ও জবাব দিল, আমাকে ক্রিশ্চিয়ান পছন্দ করে না। আমি অনুরোধ করেছি টের পেলে না-ও দিতে পারে লঞ্চটা।
আর সময় নষ্ট না করে তক্ষুণি আমি গেলাম ক্রিশ্চিয়ানের কাছে। লঞ্চের কথা বলতেই ও রাজি হয়ে গেল।
ঠিক আছে, লঞ্চই পাবে, ক্রিশ্চিয়ান বলল। ছুতোরকে বলো, ঠিকঠাক করে দিক ওটা। এরপর ও চিৎকার করল, এই তোমরা! কাটার থাক। লঞ্চটা পরিষ্কার করো?
চার্চিলের নেতৃত্বে সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ জানাল কয়েকজন বিদ্রোহী।
লঞ্চ! কি বলছেন আপনি, মিস্টার ক্রিশ্চিয়ান?
না, স্যার, লঞ্চ দেয়া চলবে না! ওটা পেলে ঠিকই দেশে পৌঁছে যাবে বুড়ো শেয়ালটা।
হ্যাঁ, ওটাই যদি দিলাম তো আর শাস্তি হলো কি ব্যাটার?
এমনি সব বক্তব্য, মন্তব্য আসতে লাগল। কোনটায় কান দিল না ক্রিশ্চিয়ান। শেষ পর্যন্ত ওর জেদের কাছে হার মানল লোকগুলো।
পরিস্থিতি এখন পুরোপুরি বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে। ক্রিশ্চিয়ান এবার ওর দলে নয় এমন সবাইকে ডেকে নিয়ে আসার নির্দেশ দিল।
প্রথমেই আনা হলো স্যামুয়েলকে। নাবিকদের সব অপমান টিটকারি নীরবে হজম করে সোজা সে ক্যাপ্টেন ব্লাইয়ের সামনে গিয়ে দাঁড়াল নির্দেশের অপেক্ষায়। কিন্তু ক্যাপ্টেন তাকে কি নির্দেশ দেবেন-নির্দেশ দিল ক্রিশ্চিয়াম।
যাও, কেবিনে গিয়ে তোমার স্যারের জামা কাপড় সব নিয়ে এসো, বলল সে।
ক্যাপ্টেনের ব্যক্তিগত ভৃত্য জন স্মিথকে নিয়ে চলে গেল স্যামুয়েল। সঙ্গে গেল সশস্ত্র এক বিদ্রোহী।
একটু পরেই এল হেওয়ার্ড আর হ্যালেট। দুজনেরই মুখ শুকনো, চোখে ভীতি। হ্যালেট তো কাঁদছেই ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে। কে একজন আমার কাঁধে হাত রাখল। ঘাড় ফেরাতেই দেখি মিস্টার নেলসন।
যা ভেবেছিলাম তার চেয়ে দূরে চলে এসেছি বাড়ি থেকে, কি বলো, বিয়্যাম? আমাদের নিয়ে কি করবে ওরা জানো নাকি?
আমি যা জানি বললাম তাকে। শুকনো একটু হাসি ফুটল নেলসনের মুখে। দূরে দিগন্ত রেখার কাছে অস্পষ্ট একটা রেখার মত দেখা যাচ্ছে তোফোয়া দ্বীপ। হাত তুলে সেদিকে ইশারা করে তিনি বললেন, ক্যাপ্টেন ব্লাই বোধহয় ওখানে নিয়ে যাবেন আমাদের।
